অফিসের কাজে গেছি নেপাল। যে হোটেলে থাকি তা অতিমনোরম। চারদিকে পাহাড়। নিচে সুইমিংপুল। তার পাশে ঘন সবুজ গাছে মোড়ানো বেড়া। মাঝেমধ্যে পাপড়িমেলা হলুদ ফুল। অত্যধিক সুন্দর। সকাল-বিকেল সবুজ গাছে মোড়ানো বেড়ার পাশে ঘুরঘুর করি। সেখানে পাপড়িমেলা হলুদ ফুলের বীজ খুঁজি। রূপা ফুল ভালোবাসে।
বীজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অস্থির বোধ হচ্ছে আমার। সেদিন আচমকা বেড়ার ওপাশ থেকে এক লোক এসে সামনে দাঁড়ালেন। চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়েছেন। অমনি ঘাবড়ে গেলাম। ঢোঁক গিলে আমতা-আমতা করে বললাম, ‘এই হলুদ ফুলের নাম কী? এটা কী গাছ?’
আমি নেপালের ভাষা জানি না। সে ইংরেজি বুঝবে কি না, সেই ব্যাপারে সংশয় থেকে কথা বলেছি হিন্দিতে। নেপালের মানুষ হিন্দি বোঝে। তিনি বুঝলেন না। আমার কথা না বুঝতে পারার কারণ হতে পারে আমি বাংলা ভাষায় হিন্দি বলেছি, ‘ইয়ে হলুদ ফুল কা নাম কিয়া হ্যায়? কোনসা গাছ ইয়ে?’
হিন্দি ভাষা বলা নিয়ে আমার ভীতি আছে। ইন্ডিয়ায় কিছুদিন থাকতে হয়েছিল। এক রেস্টুরেন্টে প্রতি রাতে ডিনার খেতাম। খাওয়া শেষে ওয়েটারকে বকশিশ দিতাম। সেদিন আট আনা পয়সার কয়েন ছাড়া আমার কাছে আর কিছু ছিল না। সেটাই দিয়ে এলাম। রুমে এসে মন খারাপ হলো। পরদিন গিয়ে তাকে বাংলা মেশানো হিন্দিতে বললাম, ‘আগলা দিন ম্যায়নে আপকো এক আধুলি দিয়া থা।’
সে বলল, ‘হু, এক আধানি দি থি।’
তাকে বলতে চাইছিলাম সে মাইন্ড করেছে কি না। মাইন্ড করার হিন্দি মনে পড়ছিল না। তবে তখুনি একটা হিন্দি শব্দ মনে এল। বললাম, ‘ইস লিয়ে তুমকো তবিয়ত খারাপ হোয়া।’
তখনো জানি না তবিয়ত খারাপ হওয়া মানে শরীর খারাপ হওয়া। সে বলল, ‘ইসসে মেরি তাবিয়ত খারাব কিউঁ হোগি?’
বুঝলাম, শব্দ সঠিক হয়নি। শব্দ সঠিক করে বললাম, ‘ইস লিয়ে তুমকো দেমাগ গড়বড় হুয়া?’
অমনি রেগে গেল, ‘এক মামুলি-সি আধানিকে লিয়ে মেরা দিমাগ কিউঁ গড়বড় হোগা? কেয়া, ম্যায় এতনা মিসকিন হু? ফকির হু?’
হইচই করে ওয়েটার লোক জড়ো করে ফেলল। দেমাগ গড়বড় হওয়া মানে পাগল হয়ে যাওয়া। তার পর থেকে হিন্দি না বলে চলার চেষ্টা করি। আজ বাধ্য হয়ে বলেছি। আমার কথা শুনে বেড়ার পাশে দাঁড়ানো লোকটা সরু চোখ নরম করে ফেললেন। তাঁকে দেখতে ভালো লাগছে। নরম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভরসা পেলাম। মনে হলো তিনি এখানকার মালি। তাঁকে আবার বাংলা ভাষায় হিন্দিতে বললাম, “মেরা এক বিবি হ্যায়। মেরা বিবিকা নাম রূপা হ্যায়। ও দেশমে রাইতা হ্যায়। মেরা বিবি রূপা ফুল বহুত ভালোবাসতা হ্যায়। মানে পেয়ার করতা হ্যায়। উনকো লিয়ে ম্যায় ইয়ে গাছকো হলুদ ফুলকা বীজ ঢুরতা হ্যায়।’
মালি কিছু বললেন না। থমকে আমার দিকে মোলায়েম চোখে তাকিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকলেন। অস্বস্তি বোধ করছিলাম। সেখানে আর দাঁড়ালাম না। চলে এলাম।
আমার দেশে ফেরার সময় হয়ে গেছে। পরদিন দুপুরে ফ্লাইট। বিকেলে আবার গেলাম সুইমিংপুলের পাশে ঘন সবুজ বেড়ার ধারে। সেখানে অনেক পাপড়ি মেলে হলুদ ফুল ফুটে আছে। একটা, যদি মাত্র একটা বীজও পাওয়া যায়!
সিদ্ধান্ত নিলাম বীজ পাওয়া না গেলে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাব। আর ডাল ভেঙে নেব। দেশে ফিরে রূপাকে বলব, বিশ্বাস নিয়ে মাটিতে পুঁতে দাও। বিশ্বাসে ডাল থেকে গাছ হয়ে যেতে পারে।
চমকে উঠেছি। বেড়ার ভেতর থেকে গতকাল দেখা সেই লোক উদয় হয়েছেন। এখানকার মালি। হতভম্ব চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মালির হাতে গাছের খুব ছোট্ট লিকলিকে চারা। আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। চারার গোড়ায় মাটি নেই। চিকন দু-তিনটা শিকড়।
অতিরিক্ত আবেগে ছুটে সামনে গিয়ে মালিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘ম্যায় তুমকো বহুত পেয়ার করতা হ্যায়।’
এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পুলিশ গাছের চারা আটকে দেবে। দেশে আনতে দেবে না। ভেজা টিস্যু পেপার দিয়ে গাছের চারার গোড়া মোড়ালাম। রাখলাম জিপলক ব্যাগের ভেতর। আলতো করে, যেন চাপ না লাগে এমনভাবে সেটাকে লাগেজে রেখে দিলাম।
দেশে এল সেই গাছের চারা। রূপাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ইয়ে হলুদ ফুলওয়ালা গাছকা নাম কিয়া হ্যায়?’
রূপা অদ্ভুত সুন্দর চোখে হাসল। নিজেকে বোকা বোকা মনে হলো। রূপা হাসিচোখে বলল, ‘হলুদ কাঞ্চন।’
কেন জানি নেপালের হলুদ ফুল থেকে হিন্দি ভাষা ছাড়াতেই পারছিলাম না। বললাম, ‘জরুর আচ্ছা। টব মে লাগা দো। ইয়ে গাছ মে বহুত ছুন্দর ফুল আ যাতা।’
সেই লিকলিকে গাছের চারা রূপা হাফড্রামে লাগিয়েছে। গাছ মাটিকে ভালোবেসে সেখানেই থেকে গেল। গাছ আর বড় হয় না। এক মাস গেল, দুই মাস গেল। ছয় মাস চলে গেল। তারপর একদিন গাছ বাড়তে থাকল। ডালপালা মেলে ধরল। গাছের পাতা হলো গাঢ় সবুজ আর হালকা সবুজের শেড। গাছের সৌন্দর্য হয়ে গেল অন্য রকম। কিন্তু গাছের ডাল ভরে ফুল এল না। মাস গেল, বছর গেল। পাঁচ বছর।
প্রবল জ্বর গায়ে রূপা গেছে ছাদবাগানে। রূপার শরীরে জ্বরের বয়স হয়ে গেছে এক মাস। জ্বরে চোখের পাতা বুজে আসছে। চোখের পাতা বন্ধ করতে করতে রূপা বলল, ‘দীপু, তোমার নেপালের গাছে দেখো ফুল এসেছে।’
গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার সামনে তুমুল বিস্ময়। চার বছর পর নেপাল থেকে আনা সেই গাছে ফুল আয়া হ্যায়। তবে সেটা হলুদ কাঞ্চন নয়, নীল আর সাদার মিশেলে অপরাজিতার মতো কোনো এক অদ্ভুত ফুল।
রূপা হাসছে। তার জ্বর ভালো হয়ে গেছে। সে বলল, ‘এত দিন পরে এখন কেন এই গাছে ফুল ফুটেছে বুঝতে পারছ! এ হচ্ছে বিশ্বকাপ সিজনের ফুল। আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। তা-ই গাছের হলুদ ফুল হয়ে গেছে নীল-সাদা।’
রূপা হাসছে। আমার চোখ উপচে গাল বেয়ে পানি পড়ছে। আনন্দে না কষ্টে, বুঝতে পারছি না। আমি পুরো তব্দা খেয়ে তারকাটা মাইক হয়ে গেছি। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না।