টা ট কা র স

ঘণ্টাদার গবেষণা জালিয়াতি

‘আদর্শ মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। আদর্শ মানুষ ডিসটিল্ড ওয়াটারের মতো—স্বাদহীন। সমাজ পছন্দ করে অনাদর্শ মানুষকে। যারা ডিসটিল্ড ওয়াটার নয়, কোকাকোলা ও পেপসির মতো মিষ্টি কিন্তু ঝাঁজালো।’ আগে এমন আদর্শ মানুষ আছিলাম। কথাডা হুমায়ূন আহমেদের, ফেসবুক থিকা নিছি। ফেসবুকের কথা যদিও বিশ্বাস করবার পারি না, করা উচিতও না। কিন্তু মতের সঙ্গে মিললে অনেক ফেসবুকীয় গুজবরেও আবার আমরা মাইনা লই। তবে যে কথাডা কইতে যাইতেছি, পুরাপুরি সত্যি।

ঘণ্টাদা, ভালো নাম ঘনশ্যাম বটব্যাল। ডাকনাম ঘনা, লোকে ডাকে ঘণ্টা। আমি যে অহন কিঞ্চিৎ অনাদর্শ মিশাইয়া ‘কোকাকোলা, পেপসির মতো মিষ্টি কিন্তু ঝাঁজালো’ হওয়ার ট্রাই মারতেছি, ঘণ্টাদা তার অনুপ্রেরণা।

তহন এইটে পড়ি। ঘণ্টাদা দেবে এসএসসি। পরীক্ষায় কম নম্বর পাইলেই মা আমারে ঘণ্টাদার পা ধুইয়া জল খাইতে কইত। স্যাররাও ঘণ্টাদার প্রশংসা কইরা আগুন লাগাইয়া দিত।

আমার বান্ধবী সেঁজুতিরে মনে ধরল ঘণ্টাদার। চিঠি লিখা আমারে দিয়া কইল, সেঁজুতির ব্যাগের মধ্যে রাইখা দিতে। ঘণ্টাদার প্রেমের সারথি হব, কম গর্বের কথা না। দিলাম রাইখা। ঘটনা ঘটল উল্টা। চিঠিডা প্রিন্সিপালের কাছে দিল সেঁজুতি। তহন যেহেতু আদর্শ মানুষ আছিলাম, স্যার আইসে যহন জিগাইলেন, ‘কী রে বলদ, চিঠি তুই রাখছস?’ মাইনা নিলাম। স্যার উদুম কেলানি দিলেন।

কষন খাইয়া নিস্তার পাব ভাবছিলাম। কিন্তু স্যার বাপের ন্যাংটাকালের বন্ধু। বাপেরে কইয়া দিলেন। বাড়ি ফিরলে বাপের তরফ থেকেও কেলানি মিস হইলো না। মা ফিট হইছিল দুই–তিনবার। জ্ঞ্যান ফিরলে জিগাইল, ‘এত সাহস পাইলি কই?’ কইলাম, ‘যার পা ধুইয়া জল খাইতে কও, চিঠিটা হে–ই রাখতে কইছিল।’ মা কানের নেতি ধইরা ঘণ্টাদার কাছে নিয়া গেল। জিগাইল, ‘ঘনা, তুই নাকি চিঠিটা রাখতে দিছিস?’ আকাশ থেকে পড়ল ঘণ্টাদা। যেন ভাজা মাছটা উল্টায়া খাইতে পারে না। আমারে উল্টা জ্ঞান দিল, ‘কত করে বুঝাই, এমন কিছু করিস না যেন কাকু–কাকিমার মান–সম্মান নষ্ট হয়; কিন্তু কে শোনে কার কথা!’

সেই দিন থেইকা আদর্শের মধ্যে অনাদর্শ মিশানো শুরু। কিন্তু স্কুল, কলেজ শেষ কইরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসাও ঘণ্টাদার থেকে নিস্তার নাই। ‘পা ধুয়ে জল খাওয়া’র উদাহরণ থামে নাই।

কিছুদিন আগে উচ্চতর পড়ালেখার জন্য ঘণ্টাদা বিদেশ গেল। মা কইল, ‘দেখ মনু, ঘনার মতো হওয়ার চেষ্টা কর।’

আমি অনেকবার মারে বোঝানোর চেষ্টা কইরাও ব্যর্থ হইছি, যে ঘণ্টাদা আদর্শ কেউ না। তা ছাড়া আমারে ঘণ্টার মতো হইতে হইব কেন! আমি আমার মতো হব। কিন্তু ঘণ্টাদার ভন্ডামির প্রমাণ ছিল না। এসএসসি, এইচএসসির সময় এমসিকিউর প্রশ্ন পাইছিল ঘণ্টাদা। মারে অনেকবার কইছি, কিন্তু প্রতিবারই এক কথা, ‘ওর পা ধুয়ে জল খা।’

কথায় আছে, চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন। তা ছাড়া ভন্ডামি দিয়ে চিরদিন তো টিইকা থাকা যায় না। ঘণ্টাদাও পারল না। গবেষণাপত্রে কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে তার। গণমাধ্যমে বিষয়টা নিয়ে খবরও হইছে। আমি অপেক্ষা করিনি। নিউজটা প্রিন্ট কইরা মায়ের হাতে দিছি। মা পুরাডা পইড়া মুখের দিকে চাইয়া বড় একটা হাই তুইলা কইল, ‘সোনা, ঘনার এখন কী হবে?’

আমিও বসে বসে ভাবতেছি, ঘণ্টাদা এখন কী করিবে?