আজকাল চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে বসলে মনে হয়, দেশের অর্ধেক তরুণ বেকার নয়, তারা আসলে ‘ফান্ডিংয়ের অপেক্ষায় থাকা হবু সিইও (CEO)’!
বেকারত্বেরও একটা ভদ্রস্থ সীমা আছে। কিন্তু জনির লাইফে ট্র্যাজেডি ঘটল তখন, যেদিন পাড়ার ক্রাশ টুনি তাকে রাস্তায় দেখে বলল, ‘জনি ভাই, আপনি নাকি এখন টোটো কোম্পানির ম্যানেজার?’
‘ভাইয়া’ ডাক তা–ও সহনীয় পর্যায়ে ছিল, কিন্তু ‘টোটো কোম্পানি’ শব্দটা জনির বুকে তিরের মতো বিঁধল। সে মনে মনে কসম কাটল, এমন কিছু করবে, যাতে টুনি নিজেই এসে তাকে প্রপোজ করতে বাধ্য হয়। ব্যস, রাতেই তার মাথায় খেলে গেল এক মহাজাগতিক আইডিয়া—‘দৌড়াও ডেলিভারি.com’। আইডিয়া খাসা: পাড়ার অলস মানুষদের হয়ে সে নিজে গিয়ে বাজার-সদাই করে দেবে। সবই হবে অ্যাপের মাধ্যমে।
অ্যাপ তো দূরের কথা, কোডিংয়ের ‘ক’-ও শুরু হয়নি। কিন্তু জনির ফেসবুক বায়ো তৈরি।
Founder & CEO | Disrupting Traditional Errands | Building the Future.
পরদিন সকালে ড্রয়িংরুমে বসে জনি যখন ল্যাপটপ খুলে গম্ভীর মুখে ‘বিজনেস স্ট্র্যাটেজি’ ভাবছে, তখন তার মা এসে বললেন, ‘এই সিইও সাহেব, অনেক তো ইকোসিস্টেম ধ্বংস করেছ; এবার একটু বাজারে গিয়ে এক কেজি আলু আর আধা কেজি পেঁয়াজ নিয়ে আসো তো!’ জনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে করপোরেট টোনে বলল, ‘মা, তুমি বিজনেস বোঝো না। আই অ্যাম দ্য সিইও। সিইওরা ডিরেক্ট ফিল্ড ওয়ার্কে যায় না। আমাকে মার্কেট রিসার্চ করতে দাও।’
স্টার্টআপের ‘আপ’ হওয়ার চেয়ে তার লাইফের ১২টা বাজার চান্স বেশি। তাই বিসিএসের বই কিনে প্রোফাইল আপডেট করল—‘Ex-Founder & CEO | Serial Failure | Now preparing for Govt. Jobs (BCS is real business)’।
মা তখন রান্নাঘর থেকে বেলন হাতে বের হয়ে বললেন, ‘তোর লজিস্টিকস টিমের পিঠে যদি এখন এই বেলনের বাড়ি পড়ে, তাহলে এক সেকেন্ডে মার্কেট রিসার্চ হয়ে যাবে! জাস্ট একদৌড়ে বাজারে যা!’ জনি বুঝল, মায়ের হাতের বেলনের পাওয়ারের কাছে CEO-ও ফেইল। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে একদৌড়ে বাজারের দিকে রওনা দিল।
স্টার্টআপ একা করা যায় না। লাগে কো-ফাউন্ডার, টেকনিক্যাল টিম, মার্কেটিং টিম। জনি ডাকল তার বন্ধু টমিকে। টমি কম্পিউটারে গেম ইনস্টল করতে পারে। টমির চোখে সে প্রযুক্তিবিদ।
জনি বলল, ‘তুই আমার CTO হবি। কোম্পানির ১০ শতাংশ শেয়ার দেব।’
টমি জিজ্ঞেস করল, ‘কাজ কী?’
‘অ্যাপ বানাবি।’
‘আর টাকা?’
‘এখন টাকা নেই। তবে কোম্পানি বড় হলে তুইও বড় হবি।’
টমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমার বাবা এত দিন বলত, তুই জীবনে কিছুই হবি না। এখন তুই বলছিস, আমি বড় হব! আবেগে কেন্দে দিব মনে হচ্ছে।’
দুজন মিলে শুরু করল হোম অফিস। অফিস বলতে টমির ঘর, কনফারেন্স রুম বলতে বিছানা, আর মিটিং টেবিল বলতে পড়ার টেবিলের ওপর রাখা দুটো চায়ের কাপ। তাদের প্রতিদিনের রুটিনও আন্তর্জাতিক মানের। সকালে বিজনেস মডেল, দুপুরে মার্কেট রিসার্চ, বিকেলে নেটওয়ার্কিং, রাতে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং। তবে রুটিন মানার বাস্তবতা হলো সকালে ঘুম, দুপুরে ভাত, বিকেলে চায়ের দোকানে আড্ডা, রাতে ইউটিউবে ‘How to Build a Billion-Dollar Startup’।
তবে ফেসবুকে পোস্ট নিয়মিত।
Another sleepless night building something meaningful. The journey has just begun!
পোস্টে লাইক সাতটা পড়লেও তার বাবার ঐতিহাসিক মানের কমেন্ট থাকবেই, ‘সারা রাত মোবাইল গুঁতালে ঘুম হবে কী করে?’ জনি কমেন্টটি ডিলিট করতে গিয়ে থেমে যায়। উদ্যোক্তার জীবনে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
স্টার্টআপের পরবর্তী ধাপ ফান্ডিং। জনি ঠিক করল, প্রথম পিচ দেবে বাবার কাছে। শুক্রবার দুপুরে বাবা যখন ভাত খেয়ে আরাম করে খবরের কাগজ পড়ছেন। জনি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘বাবা, আমি একটা স্টার্টআপ শুরু করেছি। আমাদের ফিন্যান্সিয়াল প্রোজেকশন অনুযায়ী, তুমি যদি আজ আমাদের ২০ হাজার টাকা দাও, তবে আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে আমাদের ROI হবে ২০০%। আমরা পুরো এলাকা ডোমিনেট করব!’ বাবা উঠে আলমারি থেকে পুরোনো হিসাবের খাতা বের করলেন। ‘তোর জন্মের পর থেকে এই লস প্রজেক্টের পেছনে কত খরচ করেছি, তার হিসাব করলে তোমার কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাবে। এখন তুই আবার আমাকে বিনিয়োগকারী বানাতে এসেছিস! আমি তোকে বাড়ি থেকে টার্মিনেট করার আগে আমার সামনে থেকে দূর হ।’
ছয় মাস পর বাবলুর কোম্পানির অবস্থা এমন যে আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে গেলে আয়কে আলাদা পৃষ্ঠা দিতে হয় না। স্টার্টআপের ‘আপ’ হওয়ার চেয়ে তার লাইফের ১২টা বাজার চান্স বেশি। তাই বিসিএসের বই কিনে প্রোফাইল আপডেট করল—‘Ex-Founder & CEO | Serial Failure | Now preparing for Govt. Jobs (BCS is real business)’।
শেষ পরিণতি এই যে জনি এখন আবার ফুলটাইম লুঙ্গি পরে পাড়ার মোড়ে ক্যারম খেলে, আর টুনি? টুনি অন্য এক সরকারি চাকরিজীবী ছেলের নীল-প্লেটের বাইকের পেছনে বসে জনির স্টার্টআপের গল্প শুনে খিলখিল করে হাসে!