টা ট কা র স

লালন নাকি লোন?

‘শোন, মানুষ আসলে নিজেকে চেনে না। সারা জীবন বাইরের পৃথিবীটাকে চিনতেই কেটে যায়। অথচ নিজের ভেতরে যে একটা বিশাল জগৎ আছে, সেই জগতের খবর কেউ রাখে না।’

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলাম। কপাল কুঁচকিয়ে রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ব্যাটা হয়তো চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এবার সত্যি সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা তিন মাসের বাড়িভাড়া না দেওয়ায় বাড়িওয়ালার চাপে পাগল হয়ে গেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ নিজের ভেতরে জগৎ আবিষ্কার করলি কেন?

—কয়েক দিন হলো লালন শুনছি।

আমি চুপ করে রইলাম।

রাফি আর আমি সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি। ওর জীবনের প্রথম প্রেম থেকে শুরু করে এসএসসিতে অঙ্কে ফেল করার পর স্যারের কাছে অমুক মারা যাওয়ার অজুহাত দেওয়া, সব ইতিহাস আমার জানা। সেই ছেলে নাকি লালন শুনছে!

যে একসময় রবীন্দ্রসংগীতকে ‘ঘুমের গান’ বলে উড়িয়ে দিত, সে এখন নিজের আত্মার খোঁজ করছে!

‘শোন, মানুষ আসলে নিজেকে চেনে না। সারা জীবন বাইরের পৃথিবীটাকে চিনতেই কেটে যায়। অথচ নিজের ভেতরে যে একটা বিশাল জগৎ আছে, সেই জগতের খবর কেউ রাখে না।’

আমি বললাম, লালন শুনছিস মানে? কোন গান?

—অনেক গান। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’, ‘মিলন হবে কত দিনে’...

—বাহ! তা অচিন পাখির দেখা পাইলি?

রাফি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।

—এত সহজ নাকি? নিজেকে চিনতে সময় লাগে তো।

আমি মনে মনে বললাম, নির্ঘাত বাড়িওয়ালা কাল বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, তাই নতুন ধান্দাবাজি শুরু করেছে।

মুখে বললাম, তা এই আত্মোপলব্ধি কীভাবে শুরু হলো?

রাফি জানাল, সেদিন রাতে ইউটিউবে একটা লালনগীতি শুনতে গিয়ে আরেকটা, তারপর আরেকটা।

তারপর লালনের দর্শন নিয়ে ভিডিওটিডিও-ও নাকি দেখেছে। সেখানে বলেছে, ধর্ম জাতপাত, টাকাপয়সার মোহ এসব নিয়ে অত না ভাবলেও চলবে। নিজেকে চিনতে পারলেই সত্যিকারের মুক্তি পাওয়া যায়।

আমি বললাম, তা তুই নিজেকে কী হিসেবে আবিষ্কার করছিস?

—আমি বুঝতে পারছি, টাকাপয়সা, বাড়িগাড়ি, চাকরিবাকরি...এগুলোই জীবনের সব না।

আমি এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম, সেটা তোর বাড়িওয়ালাকে গিয়ে বোঝা! লোকটা তিন মাস ধরে তোর কাছে টাকা চাচ্ছে। ওনার কাছে গিয়ে বলে দেখা, চাচা, বাড়িভাড়া আসলে জাগতিক মোহ। আপনি মায়ার বাঁধন ছিন্ন করেন।

রাফি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুই সবকিছুকে ঠাট্টা হিসেবে নিস কেন? লালন কি শুধু গান লিখেছেন? উনি তো একটা জীবনদর্শন দিয়ে গেছেন!’

—তা তো বুঝলাম। কিন্তু লালন কি কোথাও বলেছেন, মাসের বেতন আড্ডায় উড়িয়ে দিয়ে বাড়িভাড়া না দিলেও চলে?

—তুই বুঝবি না।

সেটা তোর বাড়িওয়ালাকে গিয়ে বোঝা! লোকটা তিন মাস ধরে তোর কাছে টাকা চাচ্ছে। ওনার কাছে গিয়ে বলে দেখা, চাচা, বাড়িভাড়া আসলে জাগতিক মোহ। আপনি মায়ার বাঁধন ছিন্ন করেন।

এই ‘তুই বুঝবি না’ কথাটা রাফির মুখে আমি আগেও শুনেছি। পরীক্ষার আগের রাতে না পড়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার পরও শুনেছি, প্রেমিকার জন্মদিন ভুলে যাওয়ার পরও শুনেছি। ওর কোনো যুক্তি শেষ হয়ে গেলেই এ কথা বের হয়।

—আচ্ছা, তুই লালনের দর্শন বুঝছিস, খুব ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা বল তো, লালন কি তোকে চাকরির বেতনটা জমা করতে নিষেধ করেছেন?

রাফি এবার একটু থামল। তারপর বলল, আসলে সঞ্চয়, সম্পদ, এসবের প্রতি মানুষের অতিরিক্ত আসক্তিই তো সমস্যা।

—একদম ঠিক। কিন্তু তোর আসক্তি হওয়ার জন্য সম্পদটা তো থাকা লাগবে। আজ বেতন পেলে পরশু ফোন করে টাকা ধার চাস। তোর কাছে কত টাকা আমি পাই, হিসাব করেছিস কখনো?

আচ্ছা, তুই লালনের দর্শন বুঝছিস, খুব ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা বল তো, লালন কি তোকে চাকরির বেতনটা জমা করতে নিষেধ করেছেন?

রাফি চায়ের কাপটা নামিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি ওর আত্মার গায়ে জুতা মেরে বসেছি।

আমি একটু নরম হয়ে বললাম, দেখ, আমি লালন বুঝি না। তবে এটুকু বুঝি, নিজের ভালোমন্দ বোঝার সাথে সাথে অন্যেরটাও বোঝা দরকার। তোর বাড়িওয়ালা হয়তো তিন মাস ধরে ভাড়া না পেয়ে বিরক্ত। তুই নিজের মুক্তি খুঁজছিস, ভালো কথা। কিন্তু অন্যের মাথাব্যথার কারণ হয়ে নিজের শান্তি খুঁজলে ব্যাপারটা কেমন স্বার্থপরতা হয়ে যায় না?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পাশের দোকানে তখন লালনের গান বাজছে। সন্ধ্যার বাতাসে গানের সুর আর চায়ের গন্ধ মিশে আছে।

কিছুক্ষণ পর রাফি বলল, ‘জানিস, লালনের একটা কথা আমার খুব মনে ধরেছে। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

—ভালো তো। তুই আগে বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা কর। মানুষ ভজার প্রথম ধাপ হিসেবে লোকটার হাতে অন্তত এক মাসের ভাড়া ধরিয়ে দে।

রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তোর সঙ্গে কথা বলে শান্তি নাই।

—কেন? আমি তো তোর আত্মার উন্নতির কথাই বলছি!

রাফি আবার আনমনা হয়ে গেল।

আমিও ভাবলাম যে আসলে রাফির কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজের পরিচয় খুঁজি। লালনও হয়তো সেই প্রশ্নই করে গেছেন, মানুষ আসলে কে?

আমিও ভাবলাম যে আসলে রাফির কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজের পরিচয় খুঁজি। লালনও হয়তো সেই প্রশ্নই করে গেছেন, মানুষ আসলে কে?

কিন্তু রাফির ক্ষেত্রে প্রশ্নটা একটু আলাদা।

মানুষ আসলে কে, সেটা জানার আগে ওর জানা দরকার, মাসের বিশ হাজার টাকা আসলে যায় কোথায়।

পরদিন সকালে রাফির ফোন।

—দোস্ত, একটা কথা বলব?

—বল।

—তুই কি আমাকে ছয় হাজার টাকা ধার দিতে পারবি?

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, কী জন্য? আত্মার উন্নতি?

—না রে। বাড়িওয়ালাকে দেব, ফোন দিয়ে ব্যাপক চিল্লাপাল্লা করল।

আমি একটু অবাক হলাম। ভাবলাম, অবশেষে লালনের দর্শন কাজে লেগেছে। ধার নিয়ে হলেও টাকাটা তো দিচ্ছে।

বললাম, পাঠাচ্ছি একটু পরে।

রাফি তাড়াতাড়ি বলল, ‘আর শোন, বিকেলে আড্ডায় আসিস। একটা নতুন লালনগীতি শোনাব।’

তুই কি আমাকে ছয় হাজার টাকা ধার দিতে পারবি?

ফোন রেখে আমি ভাবলাম, রাফির মধ্যে সত্যিই পরিবর্তন এসেছে। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, আজ মাসের দশ তারিখ। রাফির বেতন আসে মাসের সাত তারিখে।

তিন দিনে ২০ হাজার টাকা কোথায় গেল?

আমি আর কিছু ভাবলাম না। নিজের আত্মার শান্তির জন্য ফোনটা সাইলেন্ট করে গাইতে শুরু করলাম,

‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি/কেমনে আসে যায়

তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি/দিতাম পাখির পায়’

‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি/কেমনে আসে যায় তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি/দিতাম পাখির পায়’