হারুনের সমস্যা আছে। শারীরিক সমস্যা না, তবে শরীরের একটি বিশেষ ক্রিয়ার সাথে বেশ মিল আছে। মানুষের যেমন মূত্রথলি ভরে গেলে জায়গা-সময় বিবেচনা করার সুযোগ থাকে না, হারুনেরও মাথার ভেতর কিছু কথা জমে গেলে সেগুলো বের করে দিতে হয়। কোথায়? ফেসবুক কমেন্ট সেকশনে।
ফলে আমাদের বন্ধুমহলে হারুনের নাম হয়েছে ‘কমেন্টে প্রস্রাবকারী’।
নামখানা দিয়েছে শাওন। হারুন অবশ্য জানে না। জানলে কমেন্ট করত, ‘সমালোচকের কাজ সমালোচনা করা। সফল মানুষের কাজ এগিয়ে যাওয়া।’
হারুন ফেসবুকে কী দেখে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। হতে পারে ছবি, খবর, মৃত্যুসংবাদ, কারও বাচ্চার জন্মদিন—এনিথিং, ডাজেন্ট ম্যাটার টু হিম। হারুনের কাছে সব পোস্ট খালি দেয়াল। সেই দেয়ালে তাকে কিছু লিখতেই হবে।
একদিন অ্যাপলের নতুন আইফোনের ছবি দিয়ে একটি পেজ পোস্ট করল, ‘নতুন আইফোনে থাকছে উন্নত ক্যামেরা ও নতুন প্রসেসর।’ হারুন কমেন্ট করল, ‘সোচ্চার হোন। জেগে উঠুন। গর্জে উঠুক তারুণ্যের হাতিয়ার।’ প্রথমে সবাই ভাবল, হারুন হয়তো অ্যাপলের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রযুক্তিবিপ্লব শুরু করতে যাচ্ছে। একজন রিপ্লাই দিল, ‘ভাই, আইফোনের সাথে তারুণ্যের হাতিয়ারের সম্পর্ক কী?’ হারুন সঙ্গে সঙ্গে লিখল, ‘যে বোঝার সে ঠিকই বুঝবে।’
আরেক দিন আমাদের পরিচিত মেহেদী রাত তিনটায় দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিল। প্রায় বারো শ শব্দ। তার ডিপ্রেশন, চাকরি হারানো, প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, ঘুম না হওয়া—সব মিলিয়ে বেশ ভারী লেখা। শেষ লাইনে লিখেছে, ‘কাউকে কিছু বলার নেই। শুধু লিখে একটু হালকা হলাম।’ হারুন পোস্ট দেওয়ার ছত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় কমেন্ট করল, ‘ব্যাক টু ব্যাক লাভ দাও।’
আরেক দিন একজন লিখেছে, ‘আমার মা আজ ভোরে ইন্তেকাল করেছেন। সবাই দোয়া করবেন।’ হারুনের কমেন্ট, ‘অভিনন্দন ভাই। সামনে আরও এগিয়ে যান।’ দুই মিনিটের মধ্যে কমেন্ট ডিলিট করে আবার লিখল, ‘ইন্নালিল্লাহ।’
অর্থাৎ হারুন সম্পূর্ণ বিবেকহীন নয়। তার বিবেক আছে।
তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তার কাছে প্রায় দেড় শ রেডিমেড কমেন্ট আছে। মাথার ভেতর এগুলো আলাদা আলাদা ড্রয়ারে রাখা। যেমন—
এগিয়ে যান ভাই
সময়োপযোগী লেখা
সত্য কথা তিতা
সহমত
জেগে উঠুন
বাংলাদেশে প্রথম কেউ সত্য কথা বলল
শেয়ার দিলাম
ব্যাক টু ব্যাক লাভ
দালাল চেনা বড় দায়
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না
এটাই বাস্তবতা
মানুষ মানুষের জন্য
ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সরদার ইত্যাদি
পোস্টের বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে কমেন্ট ড্রয়ার খোলে না। খোলে হারুনের আঙুল কোন বাক্য আগে মনে করতে পারে, তার ওপর।
একবার একটা রেস্টুরেন্ট তাদের নতুন বিফ স্টেকের ছবি দিল। হারুন লিখল, ‘এই জাতি একদিন আপনার অবদান মনে রাখবে।’
আরেকজন নতুন মোটরসাইকেল কিনে ছবি দিয়েছে। হারুন লিখল, ‘মৃত্যুই জীবনের চরম সত্য।’ সেই লোক কিছুক্ষণ পর ছবিটি অনলি মি করে ফেলেছে।
আমার একদিন সন্দেহ হলো হারুন কি আদৌ ফেসবুকের কোনো পোস্ট পড়ে? পরীক্ষার জন্য আমি একটা স্ট্যাটাস দিলাম, ‘হারুন বড় ধরনের গাধা।’ সতেরো সেকেন্ড পর হারুনের কমেন্ট এল, ‘সুন্দর লিখেছেন ভাই। চালিয়ে যান।’
আমি তাকে ফোন দিলাম।
‘হারুন, আমার পোস্টটা পড়ছিস?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী লিখছি?’
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর হারুন বলল, ‘দোস্ত, মূল বক্তব্যটা তো ধরছি।’
‘মূল বক্তব্য কী?’
‘সমাজ।’
হারুন শুধু পরিচিত মানুষের পোস্টে থামে না। বিভিন্ন নিউজ পেজে তার বিচরণ আছে। একবার খবর এল, ‘ঢাকায় আজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি।’ হারুন লিখল, ‘দেশ কোথায় যাচ্ছে?’
আরেকটা খবর, ‘চিড়িয়াখানায় নতুন জিরাফ এসেছে।’
হারুনের কমেন্ট, ‘প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
কিসের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে, হারুন নিজেও জানে না। তবে ‘প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’ বাক্যের মধ্যে নাগরিক ইম্পোর্টেন্স আছে। লিখলে মনে হয় কমেন্টকারী দেশের ব্যাপারে চিন্তিত।
একদিন এক মেয়ের রান্নার পেজে ছবি এল—শুঁটকিভর্তা।
হারুন লিখল, ‘আপু এগুলো পাবলিকলি না বলাই ভালো।’
মেয়ে রিপ্লাই দিল, ‘কোনগুলো?’
‘আশা করি বুঝতে পেরেছেন।’
‘না, বুঝিনি।’
হারুন আর রিপ্লাই দেয়নি। হারুনের দর্শন হলো, কাউকে বিভ্রান্ত করে সরে পড়াও একধরনের বিজয়।
ধীরে ধীরে কাহিনি এমন দাঁড়াল, কোনো পরিচিত লোক পোস্ট দিলে আমরা পোস্টের আগে হারুনের কমেন্ট খুঁজতাম। বিয়ের ছবিতে সে লিখত, ‘কঠিন সময়, শক্ত থাকতে হবে।’ ডিভোর্সের ঘোষণায় লিখত, ‘শুভকামনা রইল নতুন জীবনের জন্য।’ নতুন চাকরিতে লিখত, ‘চাকরি করে কেউ বড়লোক হয় না ভাই।’ চাকরি ছাড়ার পোস্টে লিখত, ‘চাকরিটা ধরে রাখা উচিত ছিল।’
একই মানুষের জীবনের দুই বিপরীত সিদ্ধান্তে হারুন বিরোধিতা করতে সক্ষম।
এই প্রতিভা সবার থাকে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটল রমজানে। একটি ইসলামিক পেজ পোস্ট করল, ‘আজ সূর্যাস্তের সময় ঢাকায় ৬টা ২৩ মিনিট।”
হারুন লিখল, ‘সময় থাকতে সাবধান হোন।’
কেউ রিপ্লাই দিল, ‘কিসের ব্যাপারে?’
‘সবকিছুর।’
এরপর হতে হারুনকে আমি দার্শনিক হিসেবে দেখা শুরু করি।
তবে হারুনের নিজের পরিবার তার দার্শনিকতা সম্পর্কে কিছু জানে না। তার বাবা আবদুল কাদের সাহেব ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তার স্মার্টফোন আছে। তা দিয়ে ইউটিউবে ওয়াজ শোনেন। সাথে মাঝেমধ্যে মাছ ধরার ভিডিও দেখেন।
কিছুদিন পর হারুনই তার বাবাকে ফেসবুক খুলে দিল। বলল, ‘বাবা, যুগের সাথে তাল মিলায়া চলেন।’ কাদের সাহেব বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘এই বয়সে কার লগে তাল মিলামু?’ অ্যাকাউন্ট খোলা হলো। প্রোফাইল ছবিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো একটি ছবি। অ্যাকাউন্টের নাম ‘Abdul Kader Official Pro Max’। ‘Official Pro Max’ কোথা থেকে এল, কেউ বুঝলাম না।
কাদের সাহেব প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছু পোস্ট করলেন না। আত্মীয়দের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন। মাঝেমধ্যে কারও পোস্টে ভুল করে ‘Haha’ দিলেন। একজনের জানাজার খবরে ‘Haha’ পড়ে যাওয়ার পর তিন দিন ফেসবুক খোলেননি। মেসেঞ্জার ব্যবহার শেখার পর ভুল করে ভিডিও কল দিয়ে সিলিং দেখাতেন।
তারপর শুক্রবার দুপুরে তিনি প্রথম পোস্ট দিলেন।
পুরোনো অ্যালবাম থেকে পাওয়া একটি ছবি। তরুণ কাদের সাহেব মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বেলবটম টাইপ প্যান্ট, বিশাল কলারের শার্ট। ছবি দেখে বোঝা গেল, তৎকালীন কাদের সাহেবের জীবনে স্টাইল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘পুরানো দিনের স্মৃতি।’
হারুন তখন বাসে বসে ফেসবুক স্ক্রল করছে। পোস্টে কার ছবি, কী ক্যাপশন, কিছুই দেখল না। তার বুড়ো আঙুল বহু বছরের প্রশিক্ষণে নিজ দায়িত্বে কাজ করল।
হারুন কমেন্ট করল, ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সরদার।’ দশ মিনিট পর বাবার ফোন। হারুন ফোন ধরল। ‘হ্যালো বাবা?’ ওপাশ থেকে কাদের সাহেব খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘হাঁদারাম, তুই বাসায় আয়।’