
তখন মাত্র বিয়ে করেছি। সুখের সংসার। কিন্তু হানিমুন পিরিয়ড ছয় মাসও টিকল না। বীথি আর আমার মাঝখানে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়ল। না, যেটা ভাবছেন তা না; আর্জেন্টিনা!
২০০৯ সাল। আর্জেন্টিনার অবস্থা খুবই খারাপ। পরের বছর বিশ্বকাপে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। একের পর এক কোচ পাল্টে আর্জেন্টিনা দায়িত্ব দিয়েছে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে।
বলিভিয়ার পাহাড়চূড়ার মাঠে অন্য দলগুলো খেলতে গেলে দমে কুলায় না। অক্সিজেন-সংকট। ফিফা বলিভিয়ার মাঠ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এর প্রতিবাদে একজন দাঁড়িয়েছিল—ম্যারাডোনা। তখনো তিনি কোচ হননি। ওই বুড়ো বয়সে ১২ হাজার ফুট উচ্চতার লা পাজ স্টেডিয়ামে খেলেওছিলেন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে। ফিফা সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।
ম্যারাডোনা তাঁর বিপ্লবের ফল পেলেন এক বছর পর। আর্জেন্টিনার কোচ হয়ে লা পাজে খেলতে গিয়ে হজম করলেন ৬ গোল! আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে-পড়ে দশা।
তখন ক্রীড়া সাংবাদিকতা করি। প্রতিদিন যেসব খবর আসে, তাতে শঙ্কা আরও বাড়ে। আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা এই টেনশন আর নিতে পারছিল না। আগের পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই হেরেছে!
এর মধ্যে শুধু একজন আশ্চর্য রকম শান্ত। কে? ম্যারাডোনা! আর্জেন্টিনার প্রবীণতম ক্রীড়া সাংবাদিকটিও ম্যারাডোনাকে সারা জীবন এমন নির্ভার আর শান্ত দেখেনি। তাঁর চরিত্রের সঙ্গেই যায় না।
পেরু ম্যাচের আগে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করল, ‘ডিয়েগো, দলের অবস্থা তো খারাপ। ড্র করলেও তো আশা একরকম শেষ।’ ম্যারাডোনা উত্তর দিলেন, ‘টেনশনের কিছু নেই।’ প্রশ্ন এল, ‘বিশেষ কোনো টেকনিক ভেবেছেন? এত কনফিডেন্স!’ ম্যারাডোনার জবাব, ‘দাড়িওয়ালা বুড়ার সাথে আমার কথা হইছে। উনি বলছেন আমরা কোয়ালিফাই করব।’
দাড়িওয়ালা বুড়াটা আবার কে? ফিফার কেউ? পরে বোঝা গেল, ম্যারাডোনা বলছেন যিশুর কথা!
ম্যারাডোনার কথাবার্তা, কাজ-কারবার ভয় চরম মাত্রায় নিয়ে গেল। কোচ হওয়ার পর আর্জেন্টিনা দলকে ‘ওল্ড হোম’ বানিয়ে ফেলেছেন। মার্টিন পালের্মো খেলাটেলা ছেড়ে আর্জেন্টিনার কোন গ্রামে গরুর খামার করতে চলে গিয়েছিল। ম্যারাডোনা ডেকে পাঠালেন তাঁকেও। কোচদের ডাগআউটে চার দাগের ভেতরে থাকতে হয়। আমার ধারণা, সম্ভব হলে ম্যারাডোনা নিজেও খেলতে নেমে যেতেন।
এই পরিস্থিতি। পেরু ম্যাচ দেখতেই হবে। জীবন-মরণ প্রশ্ন। কিন্তু সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী স্বামীকে রাত জেগে ম্যাচ দেখতে দেবে না। হিমালয় পর্বত টলে যায়। কিন্তু বউদের ‘না’ মানে ‘না’!
ফুটবল মাঠ নাকি খাট? চিন্তা করে দেখলাম, বউ গেলে বউ পাওয়া যাবে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ না খেললে আর্জেন্টিনাকে পাব কই?
‘ধুরো ছাতা, সংসারই করব না’—মতি মিয়া স্টাইলে গেলাম টিভির সামনে খেলা দেখতে। বীথি রাগের মাথায় বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দিল।
ম্যাচ চলছে। জিততে জিততে ৮৯ মিনিটে গোল হজম করল আর্জেন্টিনা। স্কোর ১-১। প্রবল বৃষ্টি, টিভি পর্দায় কিছুই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। যোগ করা সময়ের খেলা চলছে। রেফারি যেকোনো মুহূর্তে বাঁশি বাজিয়ে দেবে। সেই সময় কর্নার না ফ্রি-কিক, কী যেন হলো। পেরুর ডি-বক্সে ২৩ জন, রেফারিসহ। ওই ভিড়ভাট্টা, প্রবল বৃষ্টি এর মধ্যে কী হলো কিছুই বুঝলাম না।
হঠাৎ দেখলাম আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা দৌড়াচ্ছে। ‘দাড়িওয়ালা বুড়া’র আশীর্বাদে দলের সবচেয়ে বুড়ো পালের্মোই গোল করেছে। বৃষ্টির মধ্যে ম্যারাডোনা দৌড় দিয়ে দিল মাঠে ডাইভ। ঘাসের ঘর্ষণে তার ট্রাউজার গেল খুলে! ক্যামেরা তাকে ধরে রেখেছে। সারা বিশ্ব দেখছ। নাঙ্গাপুঙ্গা ম্যারাডোনার তাতে কচুটা আসে যায়।
আশপাশের বাসা থেকে চিৎকার ছুটে আসছে। আমিও ‘ম্যারাডোনা’ হয়ে গেলাম। যখন হুঁশ ফিরল, বুঝলাম লুঙ্গি হাতে নিয়ে বনবন ঘোরাচ্ছি মাথার ওপর।
আর্জেন্টিনা সেবার বিশ্বকাপে যেতে পেরেছে। বেডরুমের প্রবেশাধিকার পেতে আমাকে কত দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, সে কথা কেউ জানে না! হয়তোবা ইতিহাসে আমার নাম লেখা রবে না।
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের পাগলামি মাপার জন্য আমি একটা স্কেল বানিয়েছি। এই স্কেলের নাম দেবব্রত-স্কেল বা ডিএস। ভূমিকম্প যেমন রিখটার স্কেলে মাপে, কে কতটা আর্জেন্টিনা সমর্থক এটা মাপা উচিত ডিএস-এ। আমি নিজে যেমন ৯.৫ ডিএস। রিখটার স্কেলে এর চেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়নি। কিন্তু এর চেয়ে বড় পাগল সমর্থক কি নেই?
ডিএস স্কেলটা বোঝার আগে দেবব্রত মুখোপাধ্যায় চরিত্রটা বুঝতে হবে। দেবব্রত আর আমি একই সঙ্গে সাংবাদিকতা শুরু করি। প্রথমে চার বছর প্রথম আলোয় প্রদায়ক ছিলাম। ফিচার পাতাগুলোয় লিখতাম, নির্দিষ্ট বেতন ছিল না।
কিন্তু দেবব্রতর স্বপ্ন ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার। এই স্বপ্ন নিয়েই কেবল ঢাকায় আসার বাসভাড়া আর একটা লাল গেঞ্জি পরে বাগেরহাট থেকে এসেছিল। একটাই গেঞ্জি, প্রতিদিন এটা পরেই তাকে প্রথম আলোয় আসতে দেখতাম। বিল গেটস একবার বাংলাদেশে এল। আইটি পাতার প্রদায়ক হিসেবে দেবব্রত সেই অনুষ্ঠানে গেল। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং গরিব দুই মানুষের মুখোমুখি হওয়ার এ ঘটনা অবশ্য আলাদা করে লেখা হলো না কোথাও।
২০০৬ বিশ্বকাপের আগে আমরা ক্রীড়া বিভাগে চাকরি পেলাম। দেবব্রতর স্বপ্ন পূরণ হলো। তখন দেবতাজ্ঞানে শুভ্রদার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। শুভ্রদার গাড়ি এবং বাসার তেল কোনোটাই কিনতে হয় না। সব তেল সে একাই শুভ্রদাকে দেয়। শুভ্রদা-ই দেবব্রত সম্পর্কে একটা কথা সব সময় বলতেন, ‘ও নাদুসনুদুস দেহটা চর্বি দিয়ে ভরা। আর চর্বি মানেই তো স্নেহ।’ স্নেহ মানে যে তেল—এটা আর দাদা বলতেন না।
একবার শুভ্রদার কিডনিতে হালকা ব্যথা। দেবব্রত ঘোষণা দিল, একটা কিডনি সে দাদাকে দিয়ে দেবে। ‘ভগবান দুটো কিডনি দিয়েছে কী জন্যি কতি পারো? অসুবিধায় পড়লি পরে একটা কিডনি যেন দিয়ে দেওয়া যায়।’
শুভ্রদার জন্য কিডনি, জীবন এবং আরও অনেক কিছু দিতে প্রস্তুত দেবব্রত তার গুরুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করল। কারণ, টানা ২৬ পাসে গোল দেওয়া ম্যাচের পর উৎপল শুভ্র ম্যাচ রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছেন—সুন্দর ফুটবল আর্জেন্টিনাও খেলে।
সিএ ভবনের দোতলার সিঁড়িতে দেবব্রত আমাকে পরস্পর সম্পর্কহীন দুটি প্রশ্ন করল, ‘স্প্যানিশ ভাষাটা শিখতে কত টাকা লাগবে আমারে কতি পারো? আচ্ছা, কতি পারো, আর্জেন্টিনার মানুষ বাদাম খায়?’
দেবব্রত স্প্যানিশ ভাষা শিখে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বুয়েনস এইরেসে গিয়ে বাদাম বেচবে। তবু এই মড়ার চাকরি করবে না। যেখানে আর্জেন্টিনা দলকে অপমান করা হয়।
এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। প্রায় কুড়ি হাজার কিলোমিটার দূরের দুটো দেশ। দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরত্ব দুই দেশের ভাষায়। তবু আর্জেন্টিনা নামের দেশটিকে এ দেশের মানুষ আপন করে নিয়েছে। সত্যি বলতে, আর্জেন্টিনায় আর্জেন্টিনার সাপোর্টার যত, তার চেয়ে বেশি সাপোর্টার বাংলাদেশে!
আর্জেন্টিনার ঘোরতর দুঃসময়ে সে দেশের মানুষই দলটার ওপর বিরক্ত। মেসিকে নিয়ে কী সব কথাবার্তা। ও তো বার্সেলোনার প্লেয়ার, আর্জেন্টিনার না। আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত পর্যন্ত জানে না।
সেই সময়েও পৃথিবীর একটা দেশ থেকে নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছে আর্জেন্টিনা। অথচ লজিক বলে, ১৯৯৩ সালের পর থেকে কোনো ট্রফি জিততে না-পারা একটা দলের এত সমর্থক হওয়ার কথাই না। অমিতাভ রেজা তো বলেই দিলেন, ‘আর্জেন্টিনার সাপোর্টাররা ফুটবলই বোঝে না।’
তা তো সত্যি। বুঝলে পাঁচবারের ট্রফি জেতা একটা দলকে বাদ দিয়ে ‘কালা পারা না’ দলের সাপোর্ট করা তো পাগলামি।
এটাই আসল পয়েন্ট। এ কারণেই আপনি ‘ম্যারাডোনা’। এ কারণেই আপনি ‘দেবব্রত’। এ কারণেই আপনি ‘এল লোকো’।
আর্জেন্টিনায় ডাকনামের সংস্কৃতি আছে। মেসি হয়ে যায় লা পুলগা, এমি মার্টিনেজ দিবু। আর্জেন্টিনায় সবচেয়ে কমন ডাকনাম হলো ‘এল লোকো’। মানে ‘মাথার তার ছিঁড়া’। আর্জেন্টিনায় প্রতি ১০ জনের ১১ জনেরই ‘তার ছিঁড়া’। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকেরাও তা-ই।
আর্জেন্টিনা নিয়ে এই পাগলামি কি শেষ হবে? নাকি আমরা বংশপরম্পরায় রেখে যাব?
২০১৮ বিশ্বকাপের কথা বলি। আব্বা আর আমি পাশাপাশি বসে খেলা দেখছি। সঙ্গে আমার দুই কন্যা। বীথি আর্জেন্টিনার খেলা দেখে না। ৯ বছর আগের ঘটনা সে ভুলতে পারেনি। সাপ এবং নারী তাদের শত্রুদের আজীবন মনে রাখে বলে প্রবাদ আছে।
সেবারও আর্জেন্টিনার অবস্থা যা-তা। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র। নাইজেরিয়ার সঙ্গেও পেরে উঠছে না। আব্বার তখন স্মৃতিক্ষয় রোগ শুরু হয়েছে। হুট করে বলে বসলেন, ‘আচ্ছা, ম্যারাডোনা পেলেয়ারটা কই? খেলে না এখন?’
পিতা থেকে পুত্র, পুত্র থেকে আমার দুই কন্যা…এবং তারপর…বহতা নদীর মতো আর্জেন্টিনার প্রতি এই আবেগ থেকে যাবে আমাদের মধ্যে।
বয়স আমারও বাড়ছে। স্মৃতিক্ষয়ও শুরু হয়েছে। তবু সৃষ্টিকর্তা যদি আয়ু দেন, যদি বুড়ো বয়সে আবার টিভিতে আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে বসি, বিদ্যুৎ-চমকের মতো মনে পড়ে যাবে এক জাদুকরের নাম। সময়কে স্থির করে দেওয়া এক আলোর কণা। হয়তো সে কারণেই বুড়ো বয়সে টিভি দেখতে দেখতে পাশে বসা নাতিকে জিজ্ঞেস করব, ‘মেসি পেলেয়ারটা কই? খেলে না এখন?’