যা পি ত র স

পাসপোর্টের ছবি কেন এত খারাপ আসে?

গতকাল পাসপোর্ট করতে গেলাম আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে। অনলাইনে ফরম পূরণ করার পর গতকাল বেলা ১১টার স্লটে ছিল আমার ছবি তোলার টাইম। আমি ১০টার মধ্যে সেজেগুজে, ভালো জামাকাপড় পরে, ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে, বউয়ের কোরিয়ান ময়েশ্চারাইজার আর সানস্ক্রিন মেখে, চুলে জেল দিয়ে গেলাম ছবি তুলতে৷ মনে মনে ভাবছি, কে বলে পাসপোর্টের ছবি সুন্দর হয় না৷ আজ আমি প্রমাণ করে দেব, পাসপোর্টেও ভালো ছবি আসা সম্ভব।

এগারোটায় পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে শুনি কিসের ছবি কিসের কী, আগে এনআইডি ভেরিফিকেশন করতে হবে। কোথায় করব সেটা? বউ এক আনসারকে জিজ্ঞেস করল, ‘এনআইডি ভেরিফিকেশন কোথায় করব?’

আনসার আনসার দিল, ‘তিনতলায়, ৩০২ নম্বর রুমে।’

সেখানে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন এঁকেবেঁকে অ্যানাকোন্ডার মতো হয়ে আছে। পাক্কা দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর এনআইডি দিতে পারলাম কাউন্টারে। উনি প্রথমে এনআইডি দেখলেন। তারপর অনেকক্ষণ আমাকে দেখলেন।

জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি মহিলা?’

ঠিক আছে, ক্রিম একটু বেশিই মাখছি। তাই বলে কি এতই ফরসা লাগছে যে আমাকে মহিলা মনে হচ্ছে। নাকি আমার চোখ মেয়েদের মতো, এ জন্য। কিন্তু দাড়িও তো আছে হালকা। মহিলাদেরও দাড়ি থাকে, বাট এত ঘন কি হয়?

এসব ভাবছি মনে মনে, তখন কাউন্টারের লোকটা ধমক দিয়ে বলল, ‘এটা মহিলাদের লাইন, আপনি এখানে কী করেন? যান, বের হন।’

ধমক শুনেই মনে পড়ল, শিট! আমাকে না, আমার বউকে বলেছিল এখানে আসতে!

নিচে ১০৫ নম্বর রুমে গিয়ে দেখি, পুরুষের লাইন আরও বিশাল। কিছু বুঝতে পারছি না এ রকম ভান করে লাইনের সামনে দাঁড়াতে গিয়ে বড়সড় ঝাড়ি খেয়ে পেছনে চলে এলাম।

লাইন আগায় তো আগায় না। দেড় ঘণ্টা পর শুনি, অফিসার লাঞ্চে গেছে। এদিকে খিদা আমারও লেগেছে, কিন্তু লাঞ্চে যাওয়ার উপায় নাই। আবার লাইনের পেছনে দাঁড়াতে হলে এই জন্মে পাসপোর্ট নেওয়া হবে না।

অফিসার লাঞ্চ করে এলেন তিনটায়, ক্ষুধা–তৃষ্ণায় ক্লান্ত আমি এনআইডি ভেরিফিকেশন করালাম বিকেল চারটায়। এবার একটা টোকেন নিতে হবে। যাক, টোকেন নিয়েই ছবি তুলব। টোকেন পেয়ে গেলাম দ্রুত। টোকেনে লেখা ২৩০।

কিন্তু কিসের ছবি, এই টোকেন নিয়ে কাগজপত্র অ্যাপ্রুভ করাতে হবে। সেখানেও সিরিয়াল। টোকেনের নম্বর হলো সিরিয়াল নম্বর। এখন চলছে ১৪৫। ২৩০ কবে আসবে কে জানে। এদিকে খিদায় মুখ শুকিয়ে গেছে। ঘেমে চুলের জেল আর মুখের ক্রিম—দুইটাই উধাও। ঘণ্টাখানেক পর কাগজপত্র অ্যাপ্রুভ করতে গিয়ে শুনি, আমার কাগজ কম আছে। ঢাকায় থাকার প্রমাণপত্র হিসেবে বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র লাগবে। শুধু কারেন্ট বিলেই হবে না। আবার রিকশা নিয়ে বাসায় গিয়ে চুক্তিপত্র নিয়ে দৌড়ে ফিরলাম। পাসপোর্ট অফিসের সামনে বড় বড় করে লাল কালিতে লেখা, ‘দালাল এবং দালালদের সাহায্য গ্রহণ দুটোই দণ্ডনীয় অপরাধ।’

সেই লেখার নিচেই এক লোক বসে বিড়ি খাচ্ছে। সে আমাকে ডেকে নিচুস্বরে বলল, ‘তিন হাজার টাকা দিলে এখনই ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দিব।’

আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না দেখে সে একটা ব্যানার দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখেন আমার ছবি আছে ওখানে।’

সেই ব্যানারে কয়েকজন দালালের ছবি দিয়ে লেখা, ‘এরা চিহ্নিত দালাল, এদের থেকে সাবধান থাকুন।’

এত ভালো আইডি প্রুফ এর আগে আমি দেখি নাই।

যা–ই হোক, আমি একজন সৎ নাগরিক। কোনোভাবেই দালাল ধরতে পারি না। তা ছাড়া তিন হাজার টাকা আমার কাছে নাইও। দুই হাজার হলে কথা ছিল। সে তিন হাজারের নিচে করবেই না।

সুতরাং তার কথা না শুনে আবার লাইনে দাঁড়ালাম। এবার কাগজপত্র অ্যাপ্রুভ হয়ে গেল। ৫০৫ নম্বর রুমে ছবি তুলতে হবে। তখন সন্ধ্যা ছয়টা। সেখানেও কঠিন লাইন। কাশবন

বা সূর্যমুখীবাগানেও মেয়েরা ছবি তোলার জন্য এত লম্বা লাইন দেয় না।

আমার পালা আসতে আসতে আমি ক্ষুধা–তৃষ্ণা গরমে ক্লান্ত, অবসন্ন, হতাশ। চোখ–মুখ শুকিয়ে গেছে। চুল এলোমেলো। শার্টে হাজারটা ভাঁজ। মুখে ঘামের ছাপ।

ফাইনালি সন্ধ্যা সাতটায় যখন আমি ছবি তোলার সুযোগ পেলাম, তখনকার আমি আর আমি নাই। আমার ছবি দেখে মনে হচ্ছে, পত্রিকার ভেতরের পাতার কোনো নিউজের সাথে দেওয়া ছবি। নিউজের শিরোনাম হলো, ‘বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার যুবক।’

এই ছবি দেখে কার বলার সাধ্য আছে যে আমি নিয়মিত সব ধরনের নেশায় জড়িত নই? আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না, অন্যদের কথা আর কী বলব!