
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ, উত্তর আমেরিকায় শীতের আগমনী বাতাস বইছে মাত্র। উত্তরের কিছু কিছু জায়গায় হয়তো পরের সপ্তাহ থেকে বরফ পড়তে শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়ে শরতের রঙের (ফল কালার) ছড়াছড়ি থাকে। এ রকম একদিন শীতের আমেজ নিয়ে শেহাব, ঋজু আর আমি মেরিল্যান্ড থেকে গাড়ি নিয়ে ছুটলাম জর্জিয়ার উদ্দেশে। ১২ ঘণ্টার এই ড্রাইভে সবুজ আর লাল পাতায় মোড়ানো নর্থ ক্যারোলাইনা আর সাউথ ক্যারোলাইনার পথ, সাভানা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ, আর উপরি হিসেবে ফুয়াদ স্যার আর বন্যা ম্যাডামের বাসায় অতিথি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
ঝলমলে রোদ থাকলেও কনকনে ঠান্ডা বাতাস আমাদের গাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেয়নি। তবু মাঝেমধ্যে গাড়ির জানালা খুলে বাইরে শুকনো পাতার গন্ধ নিচ্ছিলাম। শুকনো পাতার এই গন্ধ মুহূর্তেই আমাকে সেই শৈশবে নিয়ে যায়। অবশেষে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম আলো-ঝলমলে আটলান্টা শহরে। ঐতিহাসিক এই শহরে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অ্যাকুয়ারিয়াম (যেটা একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অ্যাকুয়ারিয়াম ছিল), আছে কোকা–কোলা জাদুঘর, মার্টিন লুথার কিংয়ের আদি বাড়ি এবং সিএনএনসহ আরও অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর। এত কিছুর মধ্যেও পুরোটা সময় অপেক্ষা করছিলাম কখন এমোরি ইউনিভার্সিটি যেতে পারব, যেখানে ফারাজ আইয়াজ হোসেন পড়ত।
ফারাজের কথা মনে আছে? সেই যে, ২০১৬ সালে ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ২০ বছরের এক ছেলে বন্ধুদের মৃত্যুর মুখে রেখে পালাবে না বলে বন্ধুদের সঙ্গে খুনিদের হাতে জীবন দিয়েছিল। তার নামে আমি আমার দুই বছরের ছেলের নাম রেখেছি ঋজু ফারাজ। খুব ইচ্ছা ছিল যদি কখনো এমোরি ইউনিভার্সিটিতে যাই, আর সেখানে ফারাজের কোনো মেমোরিয়াল থাকে, তাহলে ঋজুকে সেখানে নিয়ে যাব। আর যদি তেমন কিছু না থাকে, তবে অন্তত ফারাজ যে পথ দিয়ে হেঁটে গেছে, সেই পথটা ঋজুকে দেখাব।
এমোরি ইউনিভার্সিটিতে ফারাজের মেমোরিয়াল নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা ছিল না। শুধু জানতাম, ফারাজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস স্কুলের ছাত্র ছিল। তাই সেখানে গিয়েই খোঁজ নেব বলে ঠিক করলাম। যে–ই ভাবা, সে–ই কাজ। আটলান্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা দূরে আলাবামাতে আমার মামা থাকেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে এমোরির বিজনেস স্কুলে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। শনিবার সন্ধ্যা, তাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুব বেশি মানুষের আনাগোনা নেই। আমরা বিল্ডিংয়ের প্রতিটা তলা, প্রতিটা নোটিশ বোর্ড তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। নাহ্, কোথাও ফারাজের নামে কিছু নেই! পুরো বিল্ডিংয়ে কর্তব্যরত এমন কেউ নেই যাঁকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করা যায়। তাহলে কি ফারাজের কোনো মেমোরিয়াল না দেখেই ফিরে যেতে হবে? খুব মন খারাপ লাগছিল।
বেরিয়ে আসার মুহূর্তে হঠাৎ চোখে পড়ল দুজন ছাত্র তাদের গ্রুপ প্রজেক্টের কাজ গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভাবলাম, ওদের জিজ্ঞেস করব ফারাজের কথা? ওরা কি ফারাজকে চিনবে? চিনলেও আড়াই বছর আগের ঘটনা কি ওদের কারও মনে থাকবে? এ রকম সাত-পাঁচ ভেবে ওদের কাছে গিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম যে সে ফারাজকে চেনে কি না। জিজ্ঞেস করতেই তার পাশের ছেলেটি দৌড়ে এল। বলল, ‘তোমরা কি সেই ফারাজের কথা জিজ্ঞেস করছ, যে ২০১৬ সালে একটা টেরোরিস্ট হামলায় মারা গেছে?’ এ রকম অপ্রত্যাশিত কথা শুনে কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কোনোরকমে বললাম, ‘হ্যাঁ! আমি সেই ফারাজের কথাই বলছি। তুমি ফারাজকে কেমন করে চেনো? ফারাজ কি তোমার সহপাঠী ছিল?’ ছেলেটি বলল, ‘না। আমি ফারাজের দুই বছর পর ভর্তি হয়েছি। আমাদের ওরিয়েন্টেশনের সময় ফারাজের কথা বলেছিল, তার বীরত্বের কথা, মানুষের জন্য তার আত্মত্যাগের কথা, সে কত রকম স্টুডেন্ট ক্লাবের সঙ্গে কাজ করত, সেসব কথা আমাদের বলেছে।’ কী আশ্চর্য! এই ছেলে তার ওরিয়েন্টেশনের সব কথা মনে রেখেছে! আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে সে বলল, ‘ফারাজের কোনো মেমোরিয়াল এই বিল্ডিংয়ে নেই, আছে অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসে। সেখানে যেতে তোমাদের আরও ৪৫ মিনিট ড্রাইভ করতে হবে। এই রাতের বেলা এত দূর গিয়ে হয়তো কিছু দেখতে পাবে না। কাল সকালে গেলে তোমাদের সুবিধা হবে।’
এমোরির সেই ছেলেটি আমাদের অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসের কোন ভবন, কোথায় গাড়ি পার্ক করব, কোন দিক দিয়ে হেঁটে যাব—সবকিছু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল। ওদের ধন্যবাদ দিয়ে সেদিনের মতো হোটেলে ফিরে এলাম। যদিও পরদিন সকালে আমাদের ম্যারিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল, তবু সিদ্ধান্ত বদলে আমরা রওনা হলাম এমোরির অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসে। যেতে যেতে ভাবছিলাম, মেমোরিয়াল কি আদৌ খুঁজে পাব? যদি পাই, আমাদের ঢুকতে দেবে তো? যদি কোনো কারণে ঢুকতে না পারি? যদি বন্ধ থাকে? ইত্যাদি।
অবশেষে অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসে খুঁজে পেলাম স্যানডার হল। সেখানে রিসেপশনে বসা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতেই আমাদের দেখিয়ে দিল ‘দ্য হোসেন–কবির রুম’। ঘরটা দেখে মনে হলো এখানে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর সভা হয়। আমরা হেঁটে হেঁটে পুরো ঘরটা দেখলাম। সেখানে সাজানো ছিল একটা পিয়ানো, দেয়ালে ঝোলানো অনেকগুলো ছবি, সেগুলোর মধ্যে বড় একটা ফ্রেমে বাঁধাই করা ফারাজ আর অবিন্তার (অবিন্তা কবির) ছবিসহ একটা স্মৃতিফলক। অবিন্তা কবিরও এমোরি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ছিল। ফারাজের সঙ্গে একই হামলায় নিহত হয়। আমার ছেলে ঋজু দেয়ালে ঝোলানো ফারাজের ছবি দেখে স্বভাবসুলভ জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ দ্যাট?’ আমি বললাম, ‘ওর নামও ফারাজ!’ ঋজুর হয়তো ফারাজের সঙ্গে দেখা হওয়ার এই দিনটার কথা মনে থাকবে না। তবু বড় হওয়ার পর সে হয়তো একদিন জানবে, যে বীরের নামে তার নামকরণ, যে বীরের হৃদয় স্বর্ণ দিয়ে মোড়ানো, যে বয়সে ছোট হলেও কাজে অনেক অনেক বড়, তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় কোথায় কীভাবে হয়েছিল।
স্যান্ডার হল থেকে বেরিয়ে দেখি বাইরে রোদ ঝলমল করছে। আমাদের গাড়ি একই পথে ছুটে চলেছে মেরিল্যান্ডের উদ্দেশে। কিন্তু কেন যেন হেমন্তের আকাশ, পথের দুই ধারের সোনালি রঙের পাতা কিংবা সাভানা নদী—কোনো কিছুই যেন আর চোখে পড়ছে না। সবকিছু ছাপিয়ে কেবল ফারাজের মুখটাই বারবার চোখের সামনে ভাসছে। বেঁচে থাকলে একদিন হয়তো ঋজুকে নিয়ে আবার ফিরব একই পথে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটির স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রী