চাকদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি

নাইক্ষ্যংছড়ির আদিবাসী পল্লিতে ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ পরিবেশন করছেন চাক নারীরা। ছবিটি ১২ অক্টোবর দুপুরে তোলা l প্রথম আলো
নাইক্ষ্যংছড়ির আদিবাসী পল্লিতে ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ পরিবেশন করছেন চাক নারীরা। ছবিটি ১২ অক্টোবর দুপুরে তোলা l প্রথম আলো

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর থেকে দক্ষিণ দিকে আঁকাবাঁকা পথে ছয় কিলোমিটার গেলে দেশের সবচেয়ে ক্ষুদ্র আদিবাসী চাক সম্প্রদায়ের পল্লি ‘মধ্যম চাকপাড়া’। অরণ্যঘেরা দুর্গম এই গ্রামের টঙ ঘরগুলোতে চাক সম্প্রদায়ের লোকজন অভাব-অনটনে জীবিকা নির্বাহ করলেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তাঁরা সমৃদ্ধ।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে চাকপল্লি ঘুরে তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেল। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ১৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকেরা সবচেয়ে সংখ্যালঘু। শিক্ষাদীক্ষায়ও পিছিয়ে পড়া। নাইক্ষ্যংছড়ি ছাড়া দেশের অন্য কোথাও চাকদের বসতি নেই। চাক নারীরা কালো মোটা ও লাল সুতা দিয়ে তৈরি থামি পরেন। বয়স্ক চাক নারীরা কানে দুই ইঞ্চি ব্যাসের রুপার অলংকার পরেন।
জুমচাষ চাকদের প্রধান পেশা হলেও বহিরাগতদের দখলের কারণে অনেকেই জমি হারিয়েছেন। এ কারণে বহু চাক পেশা ছেড়ে এখন দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে বেকার। নারীরা পরিত্যক্ত জমি কিংবা বসতবাড়ির অঙিনায় শাকসবজি ও ফলমূলের চাষ করে রোজগারের চেষ্টা করেন।

ঘিলাখেলায় ব্যস্ত চাক তরুণীরা l প্রথম আলো

চাক পল্লির গৃহবধূ ছা জাং প্রু চাক (৪৫) বলেন, ‘আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু আমাদের মন বড়। আমাদের গ্রামে কোনো অতিথি এলে আমরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা খাইয়ে আপ্যায়ন করি।’
বেলা আড়াইটার দিকে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কয়েকজন চাক তরুণী হাজির হলেন। পরনে কালো-সবুজ থামি। গলায় রুপার অলংকার। মাথায় খেঁাপা আর পিঠে জুমচাষের ঐতিহ্যবাহী ঝুড়ি। তারপর সবাই শুরু করলেন ‘সাব্বা নায়েমা-প্রেসামা’ শিরোনামে নৃত্যগীতি। গ্রামে অতিথি এলে এভাবেই বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজ। গানের অর্থ জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চাচি মং চাক ( ৪২) বলেন, ‘রাজাকে প্রণাম...।’ গ্রামে আসা অতিথিকে এভাবে রাজা সম্বোধন করে সম্মান জানানো হয়। গান শেষে চলল ঐতিহ্যবাহী ‘ঘিলাখেলা’।
মধ্যম চাকপাড়া সদর নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্তি। এই পল্লিতে ৬৪ পরিবারে ২৫৬ জনের বসবাস। নাইক্ষ্যংছড়ি সদর, দোছড়ি, বাইশারীতেও চাকদের তিনটি পল্লি রয়েছে। সব মিলিয়ে চাকদের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের মতো।
এই পল্লির বাসিন্দা মং রি চাক ( ৪৪) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ম্যানেজার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জুমচাষের জমি হারিয়ে বেকার কয়েক শ চাক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি হাঁস–মুরগি লালনপালনে উৎসাহিত করছেন।
স্থানীয় হেডম্যান বাচা চিং চাক (৩৯) বলেন, আগে জুমচাষের ওপর ৯০ শতাংশ চাক পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এখন ১০ শতাংশ চাক জুমচাষ করেন। ভূমি বন্দোবস্তি বন্ধ থাকলেও প্রভাবশালীরা জমির ইজারা নিয়ে রাবার বাগানসহ নানা কাজে লাগাচ্ছেন। ফলে চাকরা জমি হারিয়ে দিন দিন অভাব–অনটনের শিকার হচ্ছেন। সংখ্যায় কম বলে প্রতিবাদ করা যাচ্ছে না।
পাড়াপ্রধান ( কারবারি) অং থোয়াই চিং চাক (৪০) বলেন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল বলে বহু পরিবারের ছেলেমেয়েরা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারছে না। ফলে দিনমজুরি ছাড়া চাকদের চাকরিও তেমন জুটছে না।
তবু নিজেদের অতীত ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি থেকে পাওয়া শক্তি চাকদের টিকিয়ে রেখেছে। বৃদ্ধা পিসাই ছা চাক (৭০) বলেন, ‘চাকরা শান্তিপ্রিয়। পাড়ায় নানা অভাব থাকলেও সংঘাত-হানাহানি মোটেও নেই। চাকদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গণমাধ্যমে প্রচার করা গেলে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হতো।’