তাঁরা আমাদের খুবই পরিচিত। যেভাবে আমরা তাঁদের চিনি, এর বাইরেও রয়েছে তাঁদের ভিন্ন জগৎ। আসুন, সেই জগতে ঘুরে এই চেনা মানুষগুলোকেই এবার দেখি একটু অন্য আলোয়

রঙের ছোঁয়া, তুলির আঁচড়
পেশায় আমি স্থপতি। তবে পেশার সঙ্গে আমার ছবি আঁকাটা একেবারেই সাংঘর্ষিক নয়! কারণ ইট-পাথরের বাড়ি তৈরিতে বালু-সিমেন্ট যেমন লাগে, তেমনি লাগে একটা শৈল্পিক মন! তাই হয়তো মনের মাধুরী মিশিয়ে কাজ করতে পারি। স্থাপত্যবিদ্যা শিখতে গিয়ে শিল্পের অনেক মাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটেছে। এই যোগাযোগের ফলেই আজকের আমি। স্থাপত্যে যে ধরনের কাজই করি, তাতে একটু রঙের ছোঁয়া, একটু তুলির আঁচড় দিতে চেষ্টা করি। আসলে ছবি আঁকাটা হলো আদতে দেখারই একটা ধরন।
শুরুর গল্প
আমার ছবি আঁকার শুরুর সময়টা হয়তো অনেক আগেই। ‘হয়তো’ বললাম এই কারণে যে, দিন-তারিখ মনে রেখে ছবি আঁকতে শুরু করিনি। কাগজে দাগ কাটতে কাটতে, আঁকিবুঁকি করতে করতে, তুলিতে রং ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে কেমন করে যেন আঁকতে শুরু করেছিলাম। সেই শুরু! তারপর বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য ছবি এঁকেছি। কিছু দর্শকের সামনে হাজির করেছি। আর বাকি সব রয়েছে নিজের জন্যই।
বছর দুয়েক আগে, ২০১২ সালে ঢাকা আর্ট সেন্টারে ‘শান্তি অশান্তির ঢাকা পাইথন’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনী করেছিলাম। সেখানে ত্রিমাত্রিক নির্মাণে শত শত ছবি ব্যবহার করার ফরম্যাট বেছে নিয়েছিলাম আমার চিন্তাধারাকে দর্শকদের কাছে প্রকাশ করার জন্য। ঢাকা আমার শহর। আমাদের শহর। এই শহরকে আমি চেনা চোখের বাইরে দেখতে চেষ্টা করি। এ রকম একটা চিন্তা থেকেই প্রদর্শনীটি করেছিলাম।
স্কেচবুকের কথা
এ বছর একটি স্কেচবুক প্রকাশ করেছি। এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে। স্কেচবুকের সবগুলো ছবিই জাপানে বসে আঁকা। ১৯৯৬ সালে জাপানে পড়তে গিয়েছিলাম। সে সময় জাপানের সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করি। তখন থেকেই জাপানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি খাতায় স্কেচ করতে ও লিখতে শুরু করি। খাতাটা যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। এই তো সেদিন, হঠাৎই স্কেচবুকটা চোখে পড়ল। মনে হলো, আরে বাহ! এটা দিয়ে তো একটা বই বের করা যেতে পারে! আর সেই চিন্তা থেকেই স্কেচবুকটি প্রকাশ করলাম। আমি বিশ্বাস করি, এর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দর্শক-পাঠক আমার যাপিত জীবন, জীবনদর্শন, দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠবেন। আরেকটা কথা না বললেই নয়। আমি আমার সব কাজের জন্য কলম ব্যবহার করেছি। কোনো পেনসিল ব্যবহার করিনি।
ছবির বিষয়
আমার ছবি আঁকার বিষয়গুলো হচ্ছে শহরের এমন কিছু জিনিস, যেগুলো হয়তো এখন আর এই শহরে নেই। বা থাকলেও যেভাবে থাকার কথা, সেভাবে নেই। আশা করি, যখন কেউ সেসব খুঁজতে যাবে, আমার কাজগুলো হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর সাক্ষ্য বহন করবে।
সত্যি বলতে, আমি ছবি আঁকি শুধু নিজের জন্য। নিজের মনের আনন্দের জন্য। ছবি আঁকার সময় যেন সত্যিকারের নিজেকে খুঁজে পাই। দিনের শেষে মনে হয়, আচ্ছা যদি একদিন সব কাজ ছেড়ে দিই! পরমুহূর্তেই মনে হয়, সব কাজ ছাড়লেও কোনো শর্তেই আমি ছবি আঁকা ছাড়তে পারব না। ছবি জড়িয়ে আছে আমার অস্তিত্বে। ছবির সঙ্গে আমার বন্ধন অন্তরের।
অনুলিখন: সুচিত্রা সরকার