জাদুর জুতা

ফুটবল খেলার জন্য এক জোড়া জুতার খুব শখ ছিল নিতুলের। অনেক বলার পরও মা–বাবা কখনো কিনে দিতে রাজি হননি। কারণ, নিতুল প্রায় প্রতিদিনই কাদাপানিতে ফুটবল খেলে আসে। জুতা কিনে দিলে দুদিনেই নষ্ট করে ফেলবে, তার চেয়ে খালি পায়ে খেলাই ভালো। এ নিয়ে নিতুলের ভারী দুঃখ। কিন্তু দুঃখ ঘুচে গেল ওর দশম জন্মদিনে। নিতুল সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে, ছোট মামা ওর জন্য এক জোড়া ফুটবল খেলার জুতা এনেছেন। নিতুলের তো আর আনন্দ ধরে না!

পরদিন নিতুল জুতা জোড়া পরে ফুটবল খেলতে গেল। এমনিতে খুব ভালো ফুটবল খেলে ও। তার ওপর জুতা পরে ও এক হালি গোল দিয়ে বসল। কিন্তু মাঠে ছিল কাদা, ফলে জুতা জোড়া কাদায় একেবারে মাখামাখি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পর মা দিলেন প্রচণ্ড বকা। বকা খেতে খেতে নিতুল বাথরুমের কলের নিচে জুতা জোড়া ধুয়ে ফেলল। ধোয়ার পর ওর আক্কেলগুড়ুম। কালো জুতা জোড়া পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে! মাকে দেখালেই বিপদ হবে। তাই সে হতভম্ব হয়ে গেল ওর বড় ভাই নিশিথের কাছে। গিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, বল তো আমার জুতা জোড়া সাদা হয়ে গেল কীভাবে?’

নিশিথ বিজ্ঞানের ছাত্র। তাই সে একটু বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী ভাব নিয়ে বলল, ‘তোর জুতায় কাদা লাগার ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়েছে। ফলে কালো রং উঠে সাদা হয়ে গেছে।’

নিতুল মন খারাপ করে ওর ঘরে চলে গেল। নিশিথের উত্তর ওর মনমতো হয়নি। ওর কেন যেন মনে হচ্ছিল, এর পেছনে কোনো ভুতুড়ে রহস্য আছে। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর নিতুল জুতা জোড়া হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কাল তোদের রোদে শুকাতে দেব। তারপর দেখি, কী করা যায়। প্রয়োজনে কালো রং করব।’

পরদিন সকালে নিতুল জুতা জোড়া শুকানোর জন্য ছাদে যাবে, কিন্তু জুতা দুটি হাতে নিয়ে দেখে, ওগুলো শুকিয়ে গেছে। জুতা শুকাতে হবে না, তাই ওগুলো আগের জায়গায় রেখে নিতুল গেল স্কুলে।

বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে কোনো রকমে খেয়ে উঠেই নিতুল দৌড়াল মাঠের দিকে। খেলায় ওর দল প্রতিদিনই জেতে। বিশেষ করে, ওর পারফরম্যান্স হয় খুব ভালো। প্রতিদিনই ও গোল করে। কিন্তু সেদিন আজব এক ঘটনা ঘটল। নিতুল হালকা করে পা ছোঁয়াতেই ফুটবলটা তিনতলা দালানের সমান উঁচুতে উঠে গেল! একবার নয়, দুবার নয়, বারবার একই ঘটনা ঘটতে লাগল। নিতুল নিজে তো বটেই, মাঠের সবাই হতবাক। নিতুলের পায়ে যেন দশজনের শক্তি ভর করেছে। বন্ধুরা সবাই নিতুলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, ‘ব্যাপারটা কী, বল তো?’ নিতুল আর কী বলবে, কারণটা যে ওরও জানা নেই।

দীপু এসে বলল, ‘কী রে, তোর পায়ে ভূতে ভর করেছে নাকি?’ নিতুল উত্তর না দিয়ে খেলতে লাগল। সেদিনও ওর দল জিতল, নিতুল গোল করল এক ডজন। ও কী করবে, বলে পা ছোঁয়ালেই সেটা গোল হয়ে যায়!

বাসায় ফিরে নিতুল গেল ওর দাদার কাছে। সব খুলে বলল। নিতুলের দাদার বয়স ৮০। তবে অলৌকিক কিছুতে তার একটুও বিশ্বাস নেই। সব শুনে দাদা বললেন, ‘দাদাভাই, তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, ফুটবলে আসলে জোরেই লাথি মেরেছিলি। আর রঙের কথা তো নিশিথ ঠিকই বলেছে। এখানে ভুতুড়ে কিছু দেখছি না।’

দাদার কথাতেও নিতুলের মনের খচখচানি দূর হলো না। ওর কেবলই মনে হচ্ছে, এখানে আরও কিছু আছে। তাই সে তার দাদার বড় ভাইয়ের পড়ার ঘরে ঢুকল। বড় দাদা একটু অন্য রকম মানুষ ছিলেন। পাগলাটে ধরনের। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলতেন, হাসতেন, কাঁদতেন। বছর তিনেক আগে তিনি কী একটা জিনিস খোঁজার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন; এখনো ফেরেননি। তাই নিতুল তাকে ভূতদাদু বলেই চেনে। তিনি যাওয়ার আগে নিতুলকে বলেছিলেন কখনো কোনো সমস্যায় পড়লে যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আর বড় দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করা মানে তার ডায়েরি পড়া। নিতুল তাই তার ডায়েরি পড়তে শুরু করল। সেদিন রাতে নিতুল না খেয়ে বড় দাদার ডায়েরি পড়তে পড়তে এক জায়গায় দেখে, কয়েকটি ছড়া লেখা। প্রথমটি এ রকম: ‘জাদুর জুতা ও যে/ চলিলাম তার খোঁজে।’ ডায়েরিতে তারপর দিনই এক জোড়া জুতার ছবি আঁকা। জুতা দুটি অবিকল নিতুলের জুতার মতোই! পৃষ্ঠা ওল্টাতেই নিতুল দেখল, আরেকটি ছড়া: ‘জাদু সে জানে ভালো/ চামড়ার রং কালো/ এমন জুতা হইবে না আর/ দুপুরে ঘুম ভাঙে তার/ বিকেলে খেলার মাঠে ওঠে আকাশে/ কী আজব জাদুতে মাখা সে!’

নিতুল পাগলের মতো পরের পৃষ্ঠায় চলে গেল। সেখানে আরেকটি ছড়া লেখা: ‘লাগিলে জুতায় কাদা/ জলেতে হইবে সাদা/ জুতা জোড়া পায়ে যার/ জয়ের মালা হইবে তার।’

ভূতদাদুর ডায়েরি শেষ করতেই নিতুলের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। তারপর থেকে প্রতিদিন নিতুল মাঠে নামলেই গোলের বন্যা
বয়ে যায়। সবাই বলে, ‘জানিস, নিতুলের জুতা জোড়া জাদু জানে!’

দশম শ্রেণি, বি কে জি সি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, হবিগঞ্জ