
পুলিশে একটা অলিখিত প্রথা আছে, চেয়ে ডিউটি নিতে হয় না। চেয়ে ডিউটি নিলে নাকি বিপদের আশঙ্কা থাকে। তারপরও কেন জানি মন মানছিল না। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছিলাম, আমাদের জেলা পুলিশ থেকে কোনো কর্মকর্তাকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দায়িত্ব দিতে চাইলে আমাকে যেন বিবেচনা করেন। ইতিহাসের অংশ হওয়ার লোভ আর পদ্মা সেতুর প্রতি ব্যক্তিগত আবেগ থেকেই এই চাওয়া।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। দায়িত্বটা পেয়ে গেলাম। আমি পদ্মার ওপারের মানুষ। এই নদী পারাপারের সময় আমরা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতাম। আমরা মানতাম, যার ভাগ্য ভালো, সে সঙ্গে সঙ্গে ফেরি পায়। আর যার ভাগ্য খারাপ, সে দুই ঘণ্টা, চার ঘণ্টা, ছয় ঘণ্টা, কখনো কখনো এক-দুই দিনও কাটিয়ে দিত ফেরিঘাটে। জীবনে এত সময় পদ্মার জন্য ব্যয় করেছি যে তার হিসাব বের করা কঠিন! ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রথম ঢাকায় আসি। তখন আবার নিজ জেলা নড়াইল থেকে ঢাকায় আসতে হলে যশোর-ঝিনাইদহ-মাগুরা ঘুরে দৌলতদিয়া-আরিচা ঘাট পার হয়ে আসতে হতো। বাড়ি থেকে কেউ ঢাকা আসতে চাইলে কয়েক দিনের প্রস্তুতি নিতে দেখতাম।
একবার নৈশকোচে নড়াইল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে রাত একটার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছালাম। শীত তখন যাই যাই করছে। ফেরিঘাটের কাছে এসে আটকে গেলাম। ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ। পরদিন বেলা ১১টায় ফেরিতে উঠতে পারলাম। পুরো ১০ ঘণ্টার অপেক্ষা। পুরুষদের তুলনায় ঘাটের জটে নারীদের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না। সর্বশেষ গত ঈদেও শিমুলিয়া ঘাটে আমার স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে প্রখর রোদে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরি পেলাম। পার হতে লাগল আরও দুই ঘণ্টা। সেদিনও নদীর বুকে ভেসে ভেসে যখন আসছিলাম, তখন কেবলই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের কথাই মনে হচ্ছিল।
যেন চেয়েছিলাম এই দিনটার দিকে। এই চেয়ে থাকা নতুন নয়। বিশেষ করে যখন থেকে পদ্মা সেতুর পাইলিং শুরু হলো, তখন থেকেই স্বপ্নের শুরু। একেকটা করে স্তম্ভ স্থাপিত হয় আর দক্ষিণাঞ্চল থেকে আমার মতো আরও যারা রোজ পদ্মা পাড়ি দেয়, তারা আশায় বুক বাঁধে। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। আজ মাত্র ৬ মিনিটে পদ্মা পাড়ি দিলাম!
জাজিরা প্রান্ত থেকে টোল প্লাজা পার হয়ে কত রকম দোয়া যে পড়েছি, আর কতবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেছি, তার হিসাব নেই। এই দোয়া পড়া ভয়–আতঙ্কের কারণে নয়, এই দোয়া সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য। সেতুর মাঝপর্যন্ত আসার পর চোখটা ভিজে উঠছিল। সেতু থেকে মাওয়া প্রান্তে নেমে মা-বাবাকে ফোন করেছি, স্ত্রীকে ফোন করেছি। শিশুর মতো আচরণ করেছি সারাটা দিন। স্বপ্ন সত্যি হলে যে আনন্দ হয়, তার তুলনা তো ওই শৈশবের সারল্যের মতোই!