পাঠকের উকিল

বিবাহবিচ্ছেদ করলে মেয়ের ক্ষতি করবে

নাহিদ মাহতাব।
নাহিদ মাহতাব।
জীবনে চলতে-ফিরতে যেসব আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, পাঠকের উকিল বিভাগে তারই সমাধান পাওয়া যাবে। এ বিভাগে আইনি সমস্যার সমাধান দেবেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব। স্পষ্ট করে নিজের সমস্যা লিখে পাঠান। প্রয়োজনীয় কাগজের অনুলিপি দিন।খামের ওপর লিখুন: পাঠকের উকিল, নকশা, দৈনিক প্রথম আলো, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা। এ ছাড়া naksha@prothom-alo.info এই ঠিকানায়ই-মেইল করেও সমস্যার কথা জানাতে পারেন।


* আমি সরকারি চাকরিজীবী। আমার স্ত্রী স্নাতক শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছে। ২০১৪ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে করি। আমরা দুজনই চাকমা সম্প্রদায়ের (ধর্ম: বৌদ্ধ)। বিয়ে আমাদের প্রথাগত রীতিতে সম্পন্ন হয়েছিল। কোনো রেজিস্ট্রি বা কাবিননামা করা হয়নি। এখন আমাদের আড়াই বছরের একটি মেয়েসন্তান আছে। বিয়ের আগে দেওয়া নানা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও দাম্পত্য জীবনে মতের অমিলের কারণে আমি বিবাহবিচ্ছেদ করতে চাই। কিন্তু স্ত্রী বিচ্ছেদ চায় না। সে সুস্পষ্টভাবে হুমকি দিয়েছে, আমি বিবাহবিচ্ছেদ করলে মেয়ের ক্ষতি করবে। আমি মেয়েকে পেতে চাই। প্রশ্ন হলো, আইনিভাবে কি বিচ্ছেদ ঘটাতে পারব? পারলে কীভাবে? 

চাকরি হারানো বা চাকরিতে কি কোনো সমস্যা হবে? মেয়ে কার কাছে থাকবে? মেয়েকে পেতে আমার কী করতে হবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, খাগড়াছড়ি।

  •  আমাদের দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নির্দিষ্ট পারিবারিক আইন নেই। সাধারণত হিন্দু আইন বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। হিন্দু আইনে যেহেতু তালাকের বিধান নেই, সেহেতু উক্ত প্রথা বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আপনি সেপারেশন বা বিচ্ছেদের চুক্তির মাধ্যমে আলাদা হতে পারবেন। তবে স্ত্রী ও কন্যার ভরণপোষণ প্রদানে আপনি বাধ্য। জেলা লিগ্যাল এইড সংস্থা আপনাকে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিচ্ছেদের চুক্তি প্রদানে সহায়তা করতে পারে। সাধারণত পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর আওতায় অভিভাবকত্ব ও শিশুর হেফাজতের মামলা করা সম্ভব। কিন্তু উক্ত আইন খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং আপনি অভিভাবক এবং নাবালক সন্তান আইন, ১৮৯০ আওতায় কন্যার কাস্টডির মামলা করতে পারেন। বিবাহবিচ্ছেদ ঘটালে চাকরিতে কোনো সমস্যা হবে না।

* আমার বাবার দুই ভাই। বড় ভাইয়ের কোনো সন্তান নেই। আমরা এক ভাই, চার বোন। ভাই সবার বড়, বোনের মধ্যে আমি বড়। ২০০৮ সালে আমার বড় চাচার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে দু-তিন বছর অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন। তখন আমি ও আমার স্বামী তাঁর দেখাশোনা করতাম। আমাদের সেবা পেয়ে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। আমাদের সেবাযত্নে সন্তুষ্ট হয়ে মুত্যুর আগে তাঁর বাড়ির ভিটার দলিল আমার হাতে তুলে দেন। কিন্তু রেজিস্ট্রি করে দিয়ে যেতে পারেননি। তাই এখন ওই দলিল আমার নামে রেজিস্ট্রি করতে কী কী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে?
মরিয়ম বেগম
কক্সবাজার।

  •  ২০০৪ সাল থেকে সব ধরনের বিক্রয়, দান, হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুতরাং, দলিলটি ২০০৪ সালের পরে হয়ে থাকলে তার রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক ছিল। আপনার চাচা যেহেতু মৃত্যুবরণ করেছেন, সেহেতু কমিটি রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব নয়।

* আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী। বিয়ে করেছি ২০১৫ সালে। বিয়ের প্রথম এক মাস ভালোভাবে কাটলেও আমার স্ত্রী পরে তার গয়নাপত্র নিয়ে তার বাপের বাড়িতে চলে যায়। এর দশ মাস পরে তার আত্মীয়স্বজনের চাপে আমার বাড়িতে আসে। ১৫ দিন পর আবার চলে যায়। এখন প্রায় এক বছর পার হয়েছে। সে আসবে না বলে জানিয়েছে। তার মা-বাবা আমাকে জানান, আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে আর সংসার করবে না এবং তাকে এককালীন কিছু টাকাসহ তার যাবতীয় আসবাবপত্র, বিবাহের উপহারসামগ্রী ফেরত দিয়ে তাকে তালাকা দিতে বলেন।
আমি চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের (সিনিয়র সহকারী জজ) কার্যালয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি হিসেবে আমি অভিযোগ দায়ের করি। এই শুনানিতে আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই উপস্থিত থাকি। সেখানে আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে আর সংসার করবে না বলে জানায়। আমি বিয়ের সময় পাওয়া যাবতীয় আসবাবপত্র ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করি। আমার স্ত্রী আমার বরাবর বিচ্ছেদ নোটিশ বা সেপারেশন নোটিশ ইস্যু করবে বলে অঙ্গীকার করে। কিন্তু চুক্তিপত্র সম্পাদনের এক মাস পার হলেও আমার স্ত্রী আমাকে এখনো বিচ্ছেদ নোটিশ পাঠায়নি। চুক্তিপত্রে সাক্ষী হিসেবে আমার স্ত্রীর মা সই করে দেন। উল্লেখ্য, আমার বিবাহ সামাজিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আমাদের কোনো সন্তান নেই। এখন আমার স্ত্রী যদি আমাকে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ না দেয়, তবে আমি কি বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ দিতে পারব? সে ক্ষেত্রে সে কি ভরণপোষণ বা এককালীন অর্থ দাবি করে মামলা করতে পারবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, চট্টগ্রাম।

  •  বিরোধ নিষ্পত্তি চুক্তি অনুযায়ী আপনার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর সেপারেশন বা বিচ্ছেদ হয়েছে। হিন্দু ধর্মে যেহেতু তালাকের বিধান নেই, সেহেতু পৃথককরণের চুক্তির মাধ্যমে বিবাহের অবসান সম্ভব। দীর্ঘদিন আলাদা বসবাস করার পর আপনি পুনরায় বিবাহ করতে পারেন। তবে আপনার স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। চিঠির তথ্য অনুযায়ী আপনার বিচ্ছেদ কার্যকর হয়েছে, সুতরাং আপনার নতুন করে বিচ্ছেদের চুক্তি প্রদান করার প্রয়োজনে নেই। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আপনার স্ত্রীর প্রাপ্য সমুদয় জিনিসপত্র আপনাকে ফেরত দিতে হবে।

* একটা মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় তিন বছরের। তিন-চার মাস আগে জানতে পারি, তার কাবিন হয়ে গেছে স্কুলে থাকতেই (বি.দ্র. তখন নাকি তার বয়স বাড়িয়ে কাবিন করেছিলেন মেয়ের মা-বাবা ও ছেলেপক্ষ)। এখন মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের বেশি। কিন্তু তার যখন কাবিন হয়েছিল, সে এ বিষয়ে কিছুই বুঝত না। আমাদের সম্পর্ক এত গভীর যে আমি এমন অবস্থায়ও মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। ওই মেয়েও আমাকে বিয়ে করতে চায়। যার সঙ্গে কাবিন হয়েছে, সে বিদেশে চলে গেছে কাবিননামা সঙ্গে নিয়েই। মেয়ে তার বাবা-মা কাউকে রাজি করাতে পারছে না, তাঁরা শুধু সমাজের কথা ভেবেই রাজি হচ্ছেন না। ওই ছেলেও বলেছে, সে ওকে ছাড়বে না। এখন ওই মেয়ে মা-বাবা আর ওই কাবিননামার বিরুদ্ধে গিয়ে কী করতে পারবে? যেন আমরা বিয়ে করতে পারি। আমার বয়স ২৬। আমার সঙ্গেও মেয়ের মায়ের কথা হয়েছে। আমি বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কাজ হয়নি। ওই ছেলের সঙ্গে তো কাবিন হয়েছে, তা-ও স্কুলে থাকতে মিথ্যা বয়স দিয়ে। আর তাই ওই ছেলে নাকি ওকে ছাড়বে না। এখন মেয়েটা কী করতে পারে ওই কাবিন বাতিল করার জন্য?
ফারুক হোসেন
ঢাকা।

  •  বর্তমানে নির্ধারিত কাবিননামায় স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার অধিকার প্রণীত হয়েছে। স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক প্রদানের এই অধিকারকে তালাক এ তাওফিজ (ডেলিগেটেড পাওয়ার) বলা হয়। মেয়েটির যেহেতু কাবিননামার মাধ্যমে বিবাহ হয়েছে, তাই সে তালাক প্রদান করার অধিকার রাখে। কাবিননামা না পাওয়া গেলে মেয়েটি নির্দিষ্ট কাজী অফিসে গিয়ে তালাকের নোটিশ পাঠাতে পারে। নোটিশ আইন অনুযায়ী মেয়েটি স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ও মিউনিসিপ্যালিটি করপোরেশনে পাঠাতে হবে। যে কাজী অফিসে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল, সেই অফিস থেকে কাবিননামার নকল তোলা সম্ভব।

* আমার বাবারা তিন ভাই। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন দাগের (সাবেদ দাগ) এক খণ্ড জমি তিনজনের নামে যৌথভাবে ছিল। ২০১৩ সালে জমি ভাগ করে বণ্টননামা করার সময় তিনটি দাগকে একটি দাগ (হাল দাগ) করে সমান তিন ভাগে ভাগ করা হয় এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে বণ্টননামা করা হয়। বণ্টননামা করার পর খারিজ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত করা হয় না। কিন্তু ২০১৪ সালে আমার বড় চাচা তাঁর অংশ বিক্রি করবেন বলে আমাদের না জানিয়েই আগের তিন দাগের একটি দাগ (সাবেক দাগ) উল্লেখ করে খারিজ করেন। তারপর সেই ভুলভাবে খারিজ করা দাগের জমি থেকেই বিক্রি করে দেন। যিনি জমিটা কিনেছিলেন, তিনি বণ্টননামায় উল্লেখিত হিসাবেই জমি দখলে নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর নামে করা দলিলে বড় চাচার খারিজ করা সেই ভুল দাগ নম্বরই উল্লেখিত আছে। বড় চাচার ভাষ্যমতে, তিনি না বুঝে ভুলভাবে খারিজ করেছেন, কিন্তু বারবার বলার পরও তিনি সেটা ঠিক করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেননি। এখন সঠিকভাবে খারিজ করার জন্য আমাদের কীভাবে আগানো উচিত? আর বড় চাচা পুনরায় সঠিকভাবে খারিজ করতে না চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
হাসান মুহাম্মদ সাঈদ
ঢাকা।

  •  রেকর্ড বা দাগ নম্বর সংশোধনের জন্য আপনাকে সংশ্লিষ্ট ডিসি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি বা এসিল্যান্ড) বরাবর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। এসিল্যান্ড ওই আবেদনের প্রেক্ষাপটে ওই জমিতে তদন্তের আদেশ দেবেন। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আপনাদের জমির দাগ নম্বর বা রেকর্ড সংশোধন হবে। বড় চাচা খারিজ করতে না চাইলে তিনি আবেদনপত্রের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।