মামাদের কাছে খোলা চিঠি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাঁরা চা–চটপটি–ফুচকাসহ নানা খাবারের পসরা নিয়ে বসেন, সেই ‘মামা’দের উদ্দেশ্যে লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহরীন নেওয়াজ

সবার পরিচিত টিএসসির স্বপন মামা
ছবি: প্রথম আলো

প্রিয় মামারা,

ক্যালেন্ডার বদল হয়ে গেলেও আমাদের ক্যাম্পাসে ফেরা হয়নি এখনো। কীভাবে যেন প্রতিদিনের পরিচিত মুখগুলো হয়ে গেল মেসেঞ্জারের কয়েকটা 'চ্যাট বাবল'। সবকিছু চলে গেল অনলাইনে। আপনাদের বানানো চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে পড়াশোনার যে চাপ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতাম, সেগুলোই যেন এখন ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছে। অনলাইনে সবই চলছে—আড্ডা, পরীক্ষা, ঝগড়া। তাও কেন যেন ক্যাম্পাসের স্বাদ পাই না। পাবই-বা কীভাবে? ক্যাম্পাসজীবনের স্বাদ তো লুকিয়ে আছে আপনাদের মালটোভা চা, হাকিম চত্বরের খিচুড়ি আর ছোট্ট লাল রঙের বাক্সে ভরা পাঁচ টাকার আইসক্রিমে।

শুনেছি, টিএসসি নাকি আজকাল ফাঁকা থাকে। চায়ের দোকানের সংখ্যা কমে গেছে অনেক। কবে যেন ফেসবুকে স্বপন মামার মলিন মুখের ছবি দেখলাম। কার্জন, টিএসসি, মল চত্বর প্রতিবছর কত নতুন মানুষের মেলা, কিন্তু একই থেকে যান শুধু আপনারা। ক্যাম্পাসের ওপর আমাদের যতটা দাবি, তারচেয়ে আপনাদের হয়তো কম নয়। যেসব মানুষ আমাদের ক্যাম্পাসজীবন পূর্ণ করেছিলেন, তাঁদের ভুলে এই মহামারিকাল আমরা পার করে দিলাম ভেবে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয়।

টিএসসির বিখ্যাত মরিচের চা

সারা দিনের ল্যাব-ক্লাস শেষ করে বিকেলবেলা পাঁচ টাকার ঠান্ডা লেবুর শরবতে যে শান্তি, শীততাপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁর মিন্ট লেমোনেডে তা পাই না। দুপুরে হাকিম চত্বরের খিচুড়ি দিনের পর দিন বিরক্ত লাগলেও আজ মনে হয় একটিবার খেতে পারলে খুব তৃপ্তি পেতাম। কার্জনবাসীর জন্য জহিরের ক্যানটিন ছাড়া উপায় অবশ্য বেশ কমই আছে। তবু ২০ টাকার এক কাপ কফি খেয়েই বছরের পর বছর সকাল আটটার ক্লাসগুলো সহ্য করা যায়। 'এপির চিপার' সুমন ভাইয়ের চা আর বাটারবন না খেলে দিনটা খালি খালি লাগে। আর সব ফ্যাকাল্টির কেন্দ্রে টিএসসি আর তার চায়ের স্টলগুলো। সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় চায়ের দোকানটি স্বপন মামা, আপনার। দিনের যে সময়েই যাই না কেন, পরিচিত মানুষের দেখা, আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা সেখানে নিশ্চিত।

আজ দূর থেকে স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে মনে হয়, এত ভালোবাসা কি শুধু খাবারগুলোর জন্য, নাকি আপনাদের হাসিমুখগুলোর জন্য? বাড়ি থেকে দূরে থেকেও আপনাদের আন্তরিকতায় ক্ষণিকের জন্য মনে হতো, এখানেও আমার আপন লোক আছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনটা অদ্ভুত একটা সময়। বয়সটা ঠিক বড় না আবার ছোটও না। এই বয়সে ছোটখাটো আবদারগুলো কেউ দাম দিতে চায় না, ইচ্ছাগুলো চাপা পড়ে যায় নতুন দায়িত্বের ভারে। আপনারা ছিলেন আমাদের সেই ছোটখাটো আবদারের জায়গা। ফুচকায় ঝাল বেশি, চায়ে চিনি কম, ভেলপুরিতে পেঁয়াজ বেশি—এমন হাজারো ক্ষুদ্র আবদার পূরণ করে গিয়েছেন হাসিমুখে, 'না' শুনিনি কখনো।

অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যে ক্যাম্পাসের এই অবিচ্ছেদ্য অংশগুলো প্রায়ই ভুলে থাকি। মনে পড়লে খুব জানতে ইচ্ছা করে, আপনারা কি আগের মতোই আছেন? ফুচকার টকটা কি এখনো বাড়িয়ে দেন? আমি যে লাল চায়ে চিনি কম খাই, স্বপন মামা, আপনার কি মনে আছে? স্বপন মামা, সুমন ভাই, নাম না-জানা আরও কতশত প্রিয় মুখ আবার কবে দেখব জানি না। আপনারা ভালো থাকুন, এটুকুই চাওয়া।

ইতি

আমরা সবাই