সরস রস

রূপকথার চুমু

অাঁকা: রোমেল বড়ুয়া
অাঁকা: রোমেল বড়ুয়া

অনেক অনেক অনেক অনেক বছর আগের কথা। এক দেশে ছিল এক রাজধানী। আর রাজধানীর মধ্যভাগে ছিল টিএসসি। এই জায়গাটায় সব সময়ই কোনো না কোনো কারণে জটলা লেগেই থাকত। চা থাকত, টা থাকত, দই–ফুচকা থেকে শুরু করে চিংড়ির ঠ্যাং পর্যন্ত থাকত। কতজন আসত, আড্ডা দিত। জটলা হতো।

কিন্তু যেদিনের কথা বলছি, সেদিন কিন্তু জটলা ছিল না। আর জটলা না থাকার কারণেই কিনা কে জানে, সেদিন চুপিচুপি চলে এসেছিল এক রাজকন্যা। কী ধবধবে তার জামা, কী সুন্দর তার হাসি! মাথায় বাঁধা এক শ ফুলের টায়রা। চোখে মাখা লোনা সাগরের ঢেউ। কিন্তু এসবের মাঝে খুবই উদ্ভটভাবে রাজকন্যার হাতে যেন কী! বস্তুটা হঠাৎই ডেকে উঠল—ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ! ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ!

ওহ্‌হো! রাজকন্যার হাতে তাহলে ব্যাঙ!

আমরা রূপকথায় তো পড়েইছি, রাজকন্যার কাছে একটা ব্যাঙ থাকবে। ঘৃণা ভুলে ব্যাঙটাকে যদি রাজকন্যা চুমু দেয়, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙটা বদলে যাবে রাজপুত্রে। তারপর তাদের বিয়ে হবে, ঘরকন্না হবে, তারা হানিমুনে যাবে, আর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকবে।

তা হলে রাজকন্যা এখন ওই ব্যাঙটাকে চুমু খাবে, তাই না? রাজকন্যা টিএসসিতে বসে যেই না ব্যাঙটাকে চুমু খেতে যাবে, অমনি চারদিক থেকে হইহই, গেল গেল আওয়াজ! কী হলো, কী হলো? রাজকন্যা দেখল, চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসছে! তাদের হাতে পোস্টার, তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড! মুখে স্লোগান—চুমু না চুমু না! চুমু খাওয়া যাবে না!

রাজকন্যা পড়ল মহাবিপদে। বলল, ‘শোনেন, আপনারা কি রূপকথা পড়েন না, নাকি? জানেন না, চুমু না খেলে ব্যাঙটা রাজপুত্র হতে পারবে না!’

একজন বলল, ‘কী বলেন এসব উদ্ভট কথাবার্তা! চুমু খেলে কেউ কখনো রাজপুত্র হয় নাকি! আমি কত চুমু খেলাম নায়িকার পোস্টারে, তারা কি কেউ হইছে রাজকন্যা?’

লোকজন আরও বেশি করে এগিয়ে এল রাজকন্যার দিকে। রাজকন্যা ভাবল এ তো ভারি বিপদ!

রাজকন্যা বলল, ‘শোনেন, আপনারা এভাবে গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না, প্লিজ!’

‘কী বলেন, একটা সেলফি তুলতাম না আপনার লগে? ফেসবুকে লিখতাম না রাজকন্যার লগে আমি? দেখি, রাজকুমারী আপা, এদিকে তাকায়ে হাসেন তো!’

‘আরে, আপনি আমার জামা ধরে টানাটানি করছেন কেন? এটা কী ধরনের অভদ্রতা?’

‘কাপুড়টা দেখতেছিলাম, আপা! হ্যাহ্, এমুন কাপুড় পাশের বাড়ির জরিনারে পরাইলে তারেও সুন্দর দেখাইব।’

‘সরেন আপনারা, সরেন এখান থেকে! আমাকে রাজকুমারকে চুমু খেতে দেন। ছাড়েন, ছাড়েন আমাকে!’

তখনই এক বয়সী লোক এগিয়ে এসে বললেন, ‘শোনো গো মা, এসব চুমাচুমি গোফন জিনিস! তুমার চাচিরে একবার খাইছিলাম। সেই ১৯৫২ সালে। এইগুলা এইখানে খাওয়া যাইত না।’

আরেকজন ফেসবুকে এর প্রতিকার চেয়ে বলল, ‘এই সব পাশ্চাত্যের বিষয়! এইগুলা নিয়া মাতামাতি মানে আমাদের সংস্কৃতির লোপ!’

স্ট্যাটাস দিয়েই লোকটা ফ্যাচ করে নাক ঝেড়ে শার্টের হাতায় মুছে নিল।

এর মধ্যেই চারদিকে হইচই পড়ে গেছে। ‘এ’ দল বলল, এটা ন্যক্কারজনক। ‘বি’ দল বলল, এটা ষড়যন্ত্র। ‘সি’ দল এসে বলল, চুমু খেলে হুমুকে খাও, ব্যাঙকে কেন?

এই মহাহট্টগোলের মধ্যে রাজকন্যা অবশ্য কারও কথাই শুনল না। তার মধ্যে তাড়া আছে। তাকে মিরপুর যেতে হবে। সেখানেই তার প্রাসাদ। আর মিরপুর যেতে চাইলে কোনো কিছু নিয়ে এত বেশি মেতে থাকলে চলে না। রাজকন্যা টুক করে ব্যাঙটাকে চুমু খেয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে এল। ব্যাঙ বদলে হলো রাজকুমার। বড় বড় কথা বলা সবাই এদিক-ওদিক ছুটে পালাল যে যার মতো।

রাজপুত্র হেসে বলল, ‘সবারই দেখছি রূপকথা পড়া উচিত! রূপকথা জানে না বলে এদের কত কিছু অজানা!’