
‘মালয়েশিয়ায় ধরপাকড় চলছে। তাই দালালরা আমাদের অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য থাইল্যান্ডের জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা বলে টেকনাফ নিয়ে আসে। কিন্তু যাত্রা শুরুর আগেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের হাতে ধরা পড়ি। এখন দালালের হাতে দেওয়া ৪০ হাজার টাকাও শেষ, যাওয়াও হলো না।’
৪ সেপ্টেম্বর টেকনাফ থানা হাজতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সিলেটের কানাইঘাট গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মো. নাজিম (২৮)। ওই দিন ভোররাতে টেকনাফ উপজেলার নিলা ইউনিয়নের মোছনী গ্রামের নাফ নদী দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ইঞ্জিন নৌকায় ওঠার সময় বিজিবি সদস্যরা নাজিমসহ ১৮ যাত্রীকে আটক করেন।
এই দলের যাত্রী টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং গ্রামের মো. ইমরান (১৯), বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার চাকঢালা গ্রামের মো. আলিম (২২) জানান, দালাল ফয়েজ জনপ্রতি ৪০ হাজার টাকা করে নিয়ে তাঁদের ট্রলারে করে গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ থাইল্যান্ডের একটি মালবাহী জাহাজে নিয়ে যাচ্ছিল। পরে থাইল্যান্ড পৌঁছে ট্রলারে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগে বিজিবি সদস্যরা তাঁদের ধরে ফেললেও দালাল ফয়েজ পালিয়ে গেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট দমদমিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা মাদারীপুরের ১৩ ও বগুড়ার সাত যাত্রীকে আটক করে। এই ঘটনায় চার দালাল মাদারীপুরের মো. কালাম ব্যাপারী, বগুড়ার বাহাদুরপুর গ্রামের বাদশা মিয়া (৩০), টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের শফি ওরফে বাইন্যা (৪৫) ও জিয়াবুল হক মিয়ার (৩৫) বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করা হয়। পরদিন ২১ আগস্ট টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার আরও ৫৭ জনকে। ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে সমুদ্রপথে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য তাঁদের এখানে জড়ো করা হয়েছিল। এতদিন সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড গেলেও এবার অস্ট্রেলিয়া নেওয়া কথ বলে লোকজন আনছে দালালরা। সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে দালালচক্র।
বিজিবি টেকনাফ ৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মেজর শফিকুর রহমান বলেন, সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ যাত্রার সময় প্রায় প্রতিদিন লোকজন ধরা পড়ছে। কিছু দালাল অসহায় লোকজনকে বিদেশে নিয়ে ভালো চাকরির প্রলোভনে সমুদ্রে ঠেলে দিচ্ছে। নানা চেষ্টা করেও মানব পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে গ্রামে গ্রামে জনসচেতনমূলক কার্যক্রম চালানো দরকার।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরহাদ বলেন, এখন অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালালরা। গত তিন মাসে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড উপকূলে অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই হাজার যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। আটক করে ১০ জনের বেশি দালাল।
টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান বলেন, গত বছরে ৭ নভেম্বর সাগরে ১১০ যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। এর আগে ২৭ অক্টোবর সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অদূরে ১৮৬ যাত্রীবোঝাই আরেকটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। চলতি সালের জানুয়ারি ও মার্চ মাসে তিন দফায় আরও পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে তিনটি ট্রলারডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। তার পরও মানুষ ট্রলারে করে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। এখন দালাল চক্র অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
দালালদের একটি সূত্র জানায়, যাত্রীদের প্রথমে ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে (বহির্নোঙরে) চট্টগ্রাম বন্দরে আসা অপেক্ষমাণ থাইল্যান্ডের মালবাহী জাহাজে নিয়ে যান। তারপর জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা ভাড়ায় তাঁদের জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন লোকজন।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত চার বছরে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সদর থানায় বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের পক্ষ থেকে ২৮৮ দালালের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা রজু করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে প্রায় ৫০ দালালকে। কিন্তু তার পরও আদম পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না।