বিশেষ আয়োজন

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী
ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী

‘কোনো রোগ, ধনীরই হোক আর গরিবেরই হোক, সেটা সারাতে সমান দক্ষ ডাক্তার ও সমান কার্যকর ওষুধ প্রয়োজন। তাই চিকিৎসা হওয়া উচিত রোগের গুরুত্ব অনুযায়ী। কিন্তু আমাদের চিকিৎসা হয় রোগীর উপার্জনের ক্ষমতা অনুযায়ী। একই রোগের জন্য গরিব পায় এক রকম চিকিৎসা আর ধনীর জন্য হয় আরেক রকম ব্যবস্থা।...এটা অন্যায় এবং সামাজিক ন্যায়নীতিবিরুদ্ধ।’ কথাগুলো আমার বাবা শহীদ ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর।
আমার বাবা ছাত্রাবস্থা থেকে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন ভাষাসৈনিক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সে আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন। সে সময় ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বাবা। পরে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকেই তাঁর ছিল সক্রিয় ভূমিকা। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যাওয়ার পর লন্ডনের বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। ষাটের দশকের স্বাধিকারের আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সেই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে তাঁর সুস্পষ্ট প্রস্তাব ছিল। ‘গণমুখী চিকিৎসাব্যবস্থা’র প্রবক্তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। বাবা শুধু তাঁর পেশায় সর্বোচ্চ মেধার অধিকারী ছিলেন তা-ই নয়, ছিলেন একটি গণমুখী, গণদরদি চিকিৎসাব্যবস্থার স্বপ্নদ্রষ্টা। যেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় দোসর, রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা দেয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তে তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৫ ডিসেম্বর বিকেলবেলা কয়েকজন আলবদর তাঁকে বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে সারা রাত অকথ্য নির্যাতনের পর, পরদিন ভোরবেলা অর্থাৎ ১৬ তারিখ ভোরে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে আরও অনেক প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাঁকে হত্যা করা হয়।

বাবা ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর কোলে লেখক


কেন এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড হলো? কেন এ দেশের শীর্ষস্থানীয় মেধাবীদের নাম জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে বসে হত্যার জন্য তালিকাভুক্ত করল গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ গংয়ের মতো পাকিস্তানের এ দেশীয় দালালরা। ডিসেম্বরে এসে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা বুঝতে পারল যে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান তারা আর আটকে রাখতে পারবে না, তখন তারা এ জাতির বিরুদ্ধে এক নিগূঢ় চক্রান্ত করে। প্রতিটি পেশার শীর্ষস্থানীয় মেধাগুলোকে তারা বেছে বেছে হত্যা করে। কিন্তু শুধু প্রখর মেধার কারণেই এ ব্যক্তিগুলো এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তা নয়, তাঁরা ছিলেন এ দেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, স্বাধিকারের আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার জ্বলন্ত মশাল। সর্বোপরি তাঁরা ছিলেন ‘ভিশনারি’ বা স্বপ্নদ্রষ্টা, যাঁদের স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন ছিল এবং সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। অর্থাৎ এ মানুষগুলো বেঁচে থাকলে স্বাধীন বাংলাদেশ খুব সহজেই প্রতিটি পেশায় এবং সামগ্রিকভাবে ছুঁতে পারত পৃথিবীর যেকোনো শীর্ষস্থানীয় দেশকে, খুব সহজেই। এই সত্যটি খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। আর তাই এই হত্যাকাণ্ড।
যারা এ অন্যায় করল সে আলবদর, আলশামস ও রাজাকারদের আমাদের চিহ্নিত করে শাস্তি বিধান করা প্রয়োজন শুধু এ জাতীয় বীরদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার জন্য নয়, বরং আমাদের দেশের বিরুদ্ধে এবং আমাদের জাতির বিরুদ্ধে করা এক চরম অন্যায়ের বিচার করার জন্য। আজ সময় এসেছে সেই যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার। আজ এ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদের সন্তান হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে আহ্বান জানাই, দল ও মতের পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হোন।
নুজহাত চৌধুরী: শহীদ ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে