
স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এবারের বাজেট। বিশেষত ক্যানসারসহ আরও কিছু অসংক্রামক রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য নেওয়া উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। স্বাস্থ্য খাত–সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত। অথচ বাংলাদেশের জিডিপির ১ শতাংশও এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়নি কোনো দিন। এবারই জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্বাস্থ্য খাত।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘যে সংস্কারের স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখেছিল, এবারের বাজেটে তার কিছু ইতিবাচক প্রতিফলন রয়েছে। বিশেষ করে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। তবে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কারের জন্য আরও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন যে সুপারিশগুলো দিয়েছে, যেমন শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও গেটকিপিং ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিমা এবং গবেষণা ও স্থানীয় চিকিৎসাপ্রযুক্তি উন্নয়ন—এসব ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।’
জানতে চাইলাম এবারের বাজেটের কোন বিষয়গুলো তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মনে হয়েছে। তিনি জানালেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি গুরুত্ব, কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক হ্রাস এবং স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতি উৎসাহ—এসবই স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের সঠিক দিকনির্দেশনা। এর ফলে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, ডায়ালাইসিস সামগ্রী, হৃৎপিণ্ডের স্টেন্ট, চোখের লেন্সসহ বেশ কিছু চিকিৎসাসামগ্রীর দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের কাজে আসবে।
বাজেটে ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগের বিদ্যমান চিকিৎসা ভাতা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে তা এক লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে ৬৫ হাজার রোগীর কাছে। এমন সব উদ্যোগকে অত্যন্ত আশাপ্রদ হিসেবে দেখছেন শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার।
পারভীন শাহিদা আখতার বলছিলেন, ‘ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। সরকারের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাজে আসবে। তবে এ দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা আজও অপ্রতুল। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা পেতে রোগীর অনেক বেশি সময় লেগে যায়। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খরচ মেটানোর সামর্থ্য অধিকাংশ রোগীর থাকে না। ভবিষ্যতে ক্যানসারের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য করে তোলা এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা করা হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী হবে।’
ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধ ও স্ক্রিনিং নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্ক্রিনিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলার ব্যাপারেও গুরুত্ব দিলেন তিনি। বিষয়টা ব্যাখ্যাও করলেন—প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীর ভোগান্তি কম হয়। খরচও হয় অনেক কম। বহু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়। কিন্তু ক্যানসার যখন জটিল আকার ধারণ করে, তখন রোগীর ভোগান্তি বাড়ে। খরচ বাড়ে। রোগ সম্পূর্ণ সেরে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে। তাই স্ক্রিনিং খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তা ছাড়া ভবিষ্যতে ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী ব্যক্তির করছাড়ের সুবিধা থাকলে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্যোগে বহু মানুষকে সাহায্য করতে উৎসাহী হবেন। এবারের বাজেটে যে ভাতা বরাদ্দ হয়েছে, তা পেতে যেন অভাবগ্রস্ত মানুষের ভোগান্তি না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিলেন তিনি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার কথা বলছিলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন। বাজেট বাড়ানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কীভাবে সেই অর্থ ব্যয় হবে, সেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জনবল, রেফারেল ব্যবস্থা, বিকেন্দ্রীকরণ, সুশাসন এবং আর্থিক সুরক্ষার মতো চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হলেই সাধারণ মানুষ এই বাজেট থেকে উপকার পাবে।
সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন আরও বলেন, ‘বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার সুনিশ্চিত করা। তাহলে এই বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, ন্যায়সংগত ও জনমুখী করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে।’ বাজেটের সব ধরনের সুবিধা যেন বাস্তবেই রোগীদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য কার্যকর বাজার তদারকি ও সুশাসন নিশ্চিত করার প্রতিও জোর দিলেন তিনি।
বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অনকোলজি, বায়োটেক অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার ডিভিশনের পরিচালক (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ‘দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় একজন রোগীর জন্য বরাদ্দ অর্থ ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এই বিরাট পরিবর্তনের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। এটা ঠিক যে
টাকার অঙ্কে এক লাখ অনেক বড় কোনো পরিমাণ নয়। কারণ, ক্যানসার অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি রোগ। তবে এই বাড়তি বরাদ্দের সামাজিক প্রভাব অনেক বড়। আমাদের দেশে বহু অসহায় রোগী চেনা-অচেনা মানুষের আর্থিক সহায়তায় চিকিৎসা
নেন। এটিকে আমি বলি মানবিক ইনস্যুরেন্স। উন্নত বিশ্বের মতো ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা না থাকলেও এ দেশের এই মানবিক ইনস্যুরেন্স দারুণ একটা বিষয়।’
সরকারিভাবে বরাদ্দ বৃদ্ধি হওয়ায় সামাজিক সচেতনতা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। অর্থাভাবে যাঁরা চিকিৎসা শুরু করার সাহস পেতেন না, তাঁদের মনের জোর বাড়বে। বহু রোগীই প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিতে আসবেন। রোগীদের চিকিৎসা নিতে আসার হার বাড়লে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট বহু প্রতিষ্ঠান এই খাতে গুরুত্ব দেবে। ওষুধশিল্প–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নানামুখী কাজের উদ্যোগ নেবে এবং নিজেদের কর্মপরিসর বাড়াবে।
এস এম মাহমুদুল হক পল্লব আরও জানালেন, এবারের বাজেটে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টিই ক্যানসারের চিকিৎসায় কাজে আসবে। তা ছাড়া ওষুধশিল্পের নতুন ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানির শুল্ক তুলে নেওয়া এবং ওষুধের মান সমুন্নত রাখার জন্য ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি কেবিনেট ও স্যান্ডউইচ প্যানেল রুমের আমদানি শুল্ক হ্রাসের মতো সিদ্ধান্তের ফলে ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবেন। এভাবে ওষুধের দাম কমার সম্ভাবনা থাকবে। তাতে দেশের রোগীরা যেমন উপকার পাবেন, তেমনি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায়ও এগিয়ে যাবে এ দেশের ওষুধশিল্প। হৃদ্রোগের জটিল অস্ত্রোপচার করার মতো দক্ষ চিকিৎসক বাংলাদেশেই রয়েছে। বাজেটে এ–সংক্রান্ত ব্যয় কমায় বহু রোগীই চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। এমনকি পার্শ্ববর্তী কিছু দেশ থেকেও এ দেশে চিকিৎসা নিতে আসতে পারেন রোগীরা।