গ্রামের অনেক মানুষের কাছে কু-পাখির ডাক ভীষণ অমঙ্গলের সংকেত, চেনেন কি এই কু-পাখি

কু-পাখি, কালপ্যাঁচা, খয়রা শিকড়ে প্যাঁচা নামেও পরিচিত
কালপ্যাঁচা

ছোট–বড় নানা জাতের গাছ আর ঝোপজঙ্গলে ঘেরা ছিল আমাদের বাড়ি। মাঝেমধ্যেই সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে ঘন পাতার আড়াল থেকে ভেসে আসত অদ্ভুত রহস্যময় এক ডাক। মা তখন উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠতেন, ‘কু-পইখ ডাকতাছে, তাড়াতাড়ি চুলার ভিতরে শিক পোড়া দে।’

গ্রামের লোকজন বিশ্বাস করত, কু-পাখির ডাক আসলে ভীষণ অমঙ্গলের সংকেত, নিশ্চয়ই কেউ মারা যাবে অথবা অশুভ কিছু ঘটবে। আর তাকে তাড়ানোর কৌশল ছিল, জ্বলন্ত চুলার ভেতর লোহার ছেনি বা লোহার শিক ঢুকিয়ে গরম করা। লোহার শিক গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কু-পাখির শরীরও গরম হয়ে উঠবে। লোহাটি যখন টকটকে লাল হয়ে উঠবে, তখন কু-পাখির শরীরে আগুন ধরে যাবে, তখনই সে বাড়ির সীমানা ছেড়ে উড়ে পালাবে; এ–ই ছিল সবার বিশ্বাস।

পরে একসময় বাবার কাছ থেকে জানতে পারলাম, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে কু-কু-কু শব্দে যে পাখিটি ডাকাডাকি করে, সে হচ্ছে একধরনের প্যাঁচা। কৈশোরের শুরুতে শব্দের উৎস লক্ষ করে বেশ কয়েকবার টর্চ মেরে কু–পাখি দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ, ঝাঁকড়া পাতার গভীরে সে বসে থাকত, ইচ্ছা করলেও সহজে তার দেখা পাওয়া যেত না।

অবশেষে নিকষ কালো এক রাতে তার দেখা মিলল। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ঝাঁকড়া আমগাছের মাথা থেকে ভেসে আসছিল কু-পাখির ডাক। তারার আলোয় আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম, তির তির করে কাঁপছে গাছের পাতা। এই গাছ লক্ষ্য করে আগেও টর্চ ধরেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, আজকেও সে ঝোপালো পাতার আড়ালেই ছিল। হঠাৎ তার ডাক থেমে গেল। আমিও থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমার খুব কাছেই আবার শোনা গেল সেই শিহরণ জাগানো ডাক, কু–কু–কু। একমুহূর্ত দেরি না করে টর্চের সুইচে চাপ দিলাম। আমার কাছ থেকে একটু দূরে বিদ্যুতের তারে সে বসে আছে। অসাধারণ সুন্দর একটা পাখি। দেখতে ঠিক প্যাঁচার মতো না, যেন ছোটখাটো এক বাজপাখি। তখনো সে ডাকছিল, ডাকের তালে তালে ফুলে উঠছিল তার গলা, সেখানে সাদা আর ধূসর রং দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। তবে চোখেমুখে আলো পড়ায় কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমার জানা ছিল না তীব্র আলো নিশাচর প্যাঁচার জন্য খুবই ক্ষতিকর, বেশিক্ষণ চোখে আলো ধরে রাখলে এমনকি জন্মের মতো অন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোটরে কিংবা ভুতুম প্যাঁচার চোখে লাইট ধরলে ওরা মানুষের সঙ্গে রীতিমতো ঘাড় ঘুরিয়ে খেলা শুরু করে। কিন্তু এই প্যাঁচা দ্রুতই ডানা মেলে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যতটুকু দেখলাম, তাতে মনে হলো সে মাঝারি আকৃতির বাদামি রঙের একটি পাখি, বুকের দিকটা সাদাটে বাদামি দাগ। লম্বাটে লেজের নিচের দিকটা সাদাটে, চোখের চারপাশে হলুদ বলয়; অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বসে থাকার সময় তার ডানার দুপাশ খয়েরি দেখাচ্ছিল।

কু-পাখি, কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা; চেহারাখানা সত্যি রহস্যময়

সেই রাতেই জেনেছিলাম, কু-পাখি আসলে এক জাতের প্যাঁচা। অনেকের কাছে কালপ্যাঁচা, কেউ বলে খয়েরি শিকড়ে প্যাঁচা। ইংরেজিতে এদের নাম ব্রাউন বুবুক, অনেকের কাছে ব্রাউন হক আউল। আসলে তার ডাকটা হচ্ছে, বুবুক...বুবুক...বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভাষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুনেছে কু-হ, কু-হ কিংবা কু...কু...কু...মানে খারাপ কিছু, তাই পাখির ডাক হয়ে গেল মানুষ মরার সংকেত।

গ্রামবাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে আরও এক জাতের কু-পাখি। আজও সন্ধ্যায় কিংবা রাতে তার ডাক শুনে হিম হয়ে আসে অনেকের রক্ত। অনেকের কাছে সে শুধু অশুভই নয়; বরং এক অতি রহস্যময় পাখি। শিকারিজীবনে আমি প্রথম তার দেখা পেয়েছিলাম এক বাঁশঝাড়ের গহিনে। শুকনা বাঁশ আর পাতার সঙ্গে যেভাবে সে মিশে ছিল, অনেকের পক্ষে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আকারে খুব বেশি বড় না, তবে চেহারাটা সত্যিই ভুতুড়ে, মাথায় আবার দুটো পালকের শিং। ওদের ধীরলয়ের কু-হ, কু-হ ডাকে আজও বিষণ্ন হয়ে ওঠে গ্রামের সন্ধ্যা। মানুষ আঁতকে ওঠে, জ্বলন্ত চুলায় শিক ঢুকিয়ে দেয় কেউ, কেউ আবার অমঙ্গলের আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। আসলেই কি সে অশুভ পাখি? মোটেও না, এ হচ্ছে প্রকৃতির এক আদরের সন্তান কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা। ইংরেজিতে যাদের বলা হয় কলার্ড স্কোপস–আউল।

কালপ্যাঁচা আর কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা, দুটোকেই কু–পাখি হিসেবে জানে মানুষ। অনেকের কাছে দুটোর ডাক আবার একরকম। আসলে কিন্তু তা না, কালপ্যাঁচা একনাগাড়ে আট–নয়টা ডাক দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয়, তারপর আবার ডাকতে শুরু করে। অন্যদিকে কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা স্বল্প সময়ের বিরতিতে একনাগাড়ে ডেকে চলে দীর্ঘক্ষণ।

এই যে পাখিরা শুধু ডাকের জন্য মানুষের কাছে অশুভ হয়ে গেল। আসলে কেন ওরা ডাকে? নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য আমরা যেমন কথা বলি, ওরা অনেকটা সেই কারণেই ডাকাডাকি করে। কখনো কখনো নিজের সীমানা নির্ধারণের জন্যও ওরা ডেকে থাকে। প্রজনন ঋতুতে ডাকাডাকিটা বেড়ে যায়। কিন্তু এতে মানুষের ক্ষতি হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। হাস্যকর একটা বিষয় যেন দৃঢ় সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ। আর মানুষ যাদের কু–পাখি মনে করে, এরা কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে মানুষের উপকার করে থাকে। কালপ্যাঁচা কিংবা কণ্ঠী নিমপ্যাঁচা—দুটোই ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে। আর কালপ্যাঁচা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে ইঁদুর শিকার করে থাকে। তাই এর মতো বন্ধু আর দ্বিতীয়টি নেই।

তাই শুধু বিশেষ পাখির ডাকে নয়, যেকোনো বিচিত্র শব্দে যেন আমরা আতঙ্কিত না হয়ে আসল সত্যটি জানার চেষ্টা করি।