অপহৃত হয়ে ৮৪ দিনের বন্দী জীবন কাটানো নূর ইসলামের গল্প যেভাবে সিনেমা হলো

আফগানিস্তানে অপহৃত হয়ে ৮৪ দিন তালেবানের হাতে বন্দী ছিলেন নূর ইসলাম
ছবি: প্রথম আলো

লম্বা টেবিলটার এক মাথায় গুটিসুটি মেরে বসে ছিলেন মোহাম্মদ নূর ইসলাম। প্রথম দেখায় ভাবতেও পারিনি, কী অভাবনীয় এক গল্প শোনাতে এসেছেন তিনি।

সাজ্জাদ ভাই (প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ) অবশ্য আগেই খানিকটা আঁচ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এনজিও কর্মী নূর ইসলাম তালেবানের হাতে বন্দী ছিলেন ৮৪ দিন। ২০০৭ সালের পত্রিকা ঘেঁটে তাই আগেই তাঁর সম্পর্কে একটু পড়ালেখা করে নিয়েছিলাম। সে সময় প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ছুটির দিনেতেও তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদকাহিনি ছাপা হয়েছিল, সংক্ষিপ্ত করে। কিন্তু পুরো ঘটনার পরতে পরতে যে এত মোড়, এত চরিত্র, এত টানটান রোমাঞ্চ, কল্পনাও করিনি।

নূর ইসলাম ভাইয়ের বয়ানে সেই অভিজ্ঞতা আমি লিখি। ছাপা হয় প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৩’–এ। তিনি নিশ্চয়ই ভাবেননি, তাঁর গল্প পরিচালক রেদওয়ান রনির চোখে পড়বে, সেই কাহিনি অবলম্বনে তৈরি হবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—দম!

মনে আছে, প্রথম দেখাতেই হড়বড় করে একধাক্কায় ৮৪ দিনের ঘটনা বলে ফেলতে চাইছিলেন তিনি। তাঁর গল্পে কখনো আসছিল সহকর্মীদের কথা, কখনো তালেবান বিদ্রোহীদের কথা, কখনোবা একটা গাধার কাহিনি। মানুষটা দারুণ ‘স্টোরিটেলার’ (গল্পকথক)। মনোযোগ কেড়ে নেন দ্রুত। কিন্তু এত দিনের জমানো কথা একসঙ্গে বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন।

২০০৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ছুটির দিনের প্রচ্ছদ

তাঁকে শান্ত করে বললাম, ‘চা খাবেন?’

‘খেতে পারি। রং চা।’

কিছুক্ষণ পর নূর ইসলাম ভাইয়ের সামনে চায়ের কাপ রেখে বললাম, ‘চলেন ভাই, আমরা শুরু থেকে শুরু করি।’

পুরোদস্তুর সিনেমা

সেদিন মোহাম্মদ নূর ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছিলাম পাক্কা দুই ঘণ্টা। এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে পুরোনো সেই অডিও শুনতে গিয়ে এখন আবার নতুন করে গায়ে কাঁটা দিল!

নূর ইসলাম ভাই তাঁর পুরো অভিজ্ঞতাই একটা ডায়েরিতে লিখেছিলেন। আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল—তাঁর সঙ্গে কথা বলে, ডায়েরি পড়ে, তাঁর বয়ানেই ঘটনাটা লেখা। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে মনে হলো কোথাও একটু অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। নূর ইসলাম ভাইয়ের স্ত্রী, অর্থাৎ (আনোয়ারা পারভীন) রানির অংশটা না শুনলে পুরোটা ঠিক চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম না।

তাই কদিন পর ফরিদপুরে রওনা হলাম। রানি ভাবির সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আরও একটা উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল। নূর ইসলাম ভাই আগেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছিলেন, ‘বাড়ি এলে আপনাকে আফগানি গরুর মাংস রান্না করে খাওয়াব।’

মাংস চুলায় বসিয়ে স্বামী-স্ত্রী আমার মুখোমুখি বসলেন। এবার গল্পটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। বন্দী অবস্থায় নূর ইসলাম ভাইয়ের একটা লড়াই তো আছেই, দেশে তাঁর স্ত্রীর লড়াইও কম নয়। সমাজ থেকে শুরু করে সরকার, অনেক কিছুর সঙ্গে তাঁকে ফাইট দিতে হয়েছে, একা!

কীভাবে দুজনের পরিচয় হলো, বিয়ে হলো; কেমন করে নূর ইসলাম আফগানিস্তানে গেলেন, ফিরে আসার পর তাঁদের জীবনে কী কী ঘটল—খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শুনেছিলাম। ডায়েরিতে নোট নিতে নিতে মনে হচ্ছিল, এ তো পুরোদস্তুর সিনেমা!

বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার যে লড়াই, যে অদম্য স্পৃহা; এটাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। যেহেতু এটা তথ্যচিত্র নয়, বড় পর্দার ছবি; তাই অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। কিন্তু অনুপ্রেরণাটা আমি ছবিতেও রাখতে চেষ্টা করেছি।
রেদওয়ান রনি, পরিচালক, দম
দম সিনেমার পোস্টার

বড় পর্দায়

লিখতে বসে একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। কখনো কানে হেডফোন গুঁজে রেকর্ডিং শুনছি, কখনো নূর ইসলাম ভাইয়ের ডায়েরির পাতা ওলটাচ্ছি, কখনো গুগল করে, বই পড়ে আফগানিস্তানের তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছি—সব মিলিয়ে আমার তখন পাগল-পাগল দশা। তার ওপর সময়ও কম। ঈদসংখ্যা বাজারে যাবে। সাজ্জাদ ভাই বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন, ‘হলো?’

যথাসময়ে লেখা জমা দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। লেখা পাঠকের হাতে পৌঁছে যাওয়ার পর আমার যখন ঘোর কাটি-কাটি ভাব, এই সময় একদিন ফোন করলেন পরিচালক রেদওয়ান রনি। বললেন, ‘নূর ইসলামের কাহিনি পড়ে আমার চোখে পানি এসে গেছে! আমি এটা নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে চাই।’

স্ত্রী আনোয়ারা পারভীনকে সঙ্গে নিয়ে দম সিনেমা দেখতে এসেছিলেন নূর ইসলাম

পরের ঘটনা তো সবারই জানা। দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে এখন মহাসমারোহে চলছে দম—নূর ইসলামের সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি রেদওয়ান রনির চলচ্চিত্র। সিনেমায় রূপ দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, কাহিনিতে যোগ-বিয়োগ হয়েছে। কিন্তু মূল কথাটা একই—এটা একজন সাধারণ মানুষের টিকে থাকার গল্প, দম ধরে রাখার গল্প, বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে বাড়ি ফেরার গল্প।

কদিন আগে নূর ইসলাম ভাই প্রথম আলোর কার্যালয়ে এসেছিলেন আরও একবার। এবার একা না। রানি ভাবি ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন পরিচালক রেদওয়ান রনি, অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো ও পূজা চেরী। পর্দার ও বাস্তবের নূর–রানির সঙ্গে বেশ একটা আড্ডা হলো।

নূর ইসলাম ভাই বলছিলেন, ‘খুব ইচ্ছা ছিল, আমার ঘটনাটা সারা দেশের মানুষ জানুক। আমি যদি না থাকি, তখন হলেও জানুক। সে জন্যই ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলাম। রনি ভাই যেদিন বললেন, আমার ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানাবেন, তার পর থেকে অপেক্ষা আর ফুরাচ্ছিল না। আশপাশের অনেককে বলতাম, জানেন, আমাকে নিয়ে রেদওয়ান রনি সিনেমা বানাচ্ছে। তাঁরা ভাবত, লোকটা পাগল হয়ে গেছে। অবশেষে স্বপ্নটা পূরণ হলো।’