
শুধু চিকিৎসক নন, সুলেখক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। প্রথম আলোর এই নিয়মিত লেখক গত বছরের ১৫ জানুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুর বর্ষপূর্তির আগে তাঁকে স্মরণ করেছেন তাঁর মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসলের পিএইচডি গবেষক সুস্মিতা চৌধুরী
জানুয়ারি মাস, স্মৃতির বুদ্বুদে ভাসছি। ১১ জানুয়ারি বাবার জন্মদিন; আর তার তিন দিন পরই তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। মনে হু হু করা বিলাপ—কেন তুমি নেই বাবা? কথা ছিল এ বছর হইচই করে তোমার ৮০তম জন্মদিন উদ্যাপন করব; কিন্তু বয়সের এই ‘ম্যাজিক স্কোর’ তোমার স্পর্শ করা হলো না; কিন্তু মন যখন চিরসবুজ, বয়স তখন সংখ্যামাত্র। জীবনের জয়গান গেয়ে আমার বাবা অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী উল্লাসে বেঁচেছেন। বুকে আশা আর চোখে স্বপ্ন নিয়ে আজীবন নিভৃতে আলো হাতে হেঁটে গেছেন। জগতের সব সুন্দরের মধে৵ তাই বাবাকে খুঁজি।
পাখির চোখে যদি আমার বাবার জীবনকে দেখি, তাঁর জীবন যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ‘সার্ভিস ওয়াজ জয়’! নিবেদনেই আনন্দ খুঁজেছেন। কখনো এই নিবেদনের অর্ঘ্য ছিল রোগীদের প্রতি চিকিৎসক হয়ে। কখনো শিক্ষক হয়ে সেই নিবেদন ছিল ছাত্রদের প্রতি—বন্ধুর পথে হাতটা ধরে পথ দেখিয়ে। কখনো সেবায় ব্রতী হয়েছেন কলম হাতে। লেখনীতে হয়তো বাংলার কোনো প্রান্তিক জনপদের অজানা কিশোরের বিজ্ঞানী মনকে উসকে দিয়েছেন। পাঠকের হৃদয় জয় করেছেন চিকিৎসাশাস্ত্র ও সাহিত্যের মধুর মিলন ঘটিয়ে। প্রতিটি ভূমিকায় ছিলেন অনন্য। কেননা, সেবাতেই ছিল তাঁর আনন্দ। ছিটকে পড়েননি বয়সের ভারে বরং বয়সী বটের ঝিলিমিলি পাতার মতোই উজ্জ্বল হয়েছেন। উজ্জ্বল হয়েছেন জীবনবোধে, প্রজ্ঞায়, নেতৃত্বে।
বাবার বয়স তখন ৭০ ছুঁয়েছে। এ বয়সে আমরা সাধারণত মনে মনে বলি, ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু।’ আমরা নীড়ে ফিরতে চাই, ডানা গুটিয়ে বসতে চাই; কিন্তু বাবা শুরু করলেন তাঁর জীবনের নতুন ইনিংস। বারডেমের প্রজেক্ট ডিরেক্টর হয়ে পরিদর্শন করলেন দেশের ৬৪ জেলার মেডিকেল ল্যাবরেটরি। মানুষের অভাব–অভিযোগের গল্প শোনালেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বাবার ক্লান্তি ছিল না। ছিল অজানাকে জানার বাঁধভাঙা কৌতূহল। ছিল বাংলার মানুষের সুস্বাস্থ্যের পথকে সুগম করার স্বপ্ন। ডানা গুটিয়ে নেওয়ার সাধ ছিল না। তবে ঢাকায় সবুজ শান্তির নীড়ে ফেরার তাড়াও যে তাঁর ছিল।
আমরা তিন ভাইবোন তখন বিদেশ–বিভুঁইয়ে। মা অপেক্ষা করতেন সফর শেষে বাবা কখন বাড়ি ফিরবেন আর চায়ের কাপে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসবেন। এ যেন তাঁদের যুগল জীবন ও রোমান্সের দ্বিতীয় ইনিংস। জ্যোৎস্নাশোভিত রুপালি সন্ধ্যায় ঝুলবারান্দায় মা–বাবার হাসি–গানে ভরা পুরোনো সেই সময় স্মৃতিপটে অক্ষয়। আমার বাবার কাছে মা শুধু তাঁর গৃহলক্ষ্মী আর সন্তানদের মা-ই ছিলেন না, ছিলেন পরম বন্ধু, প্রেয়সী।
জীবন রূপকথা নয়, হরদম আমরা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মুখোমুখি হই। বাবার ক্যানসারের ডায়াগনোসিস তেমনই এক বজ্রপাত ছিল। জীবনের সব হিসাবনিকাশ বদলে গেল। মা আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি বাবার পরম বন্ধু। নতুনরূপে বাবাকে আবিষ্কার করলাম, তিনি যেন মহাভারতের ভীষ্ম, যিনি শরশয্যায়ও স্থির, দৃঢ়। বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশেই তাঁর চিকিৎসা হবে। বিদেশে চিকিৎসার হাতছানি অনায়াসে দূরে ঠেললেন। তাতে বরাবরই তাঁর অনীহা। দেশকে বাবা ভালোবেসেছিলেন মায়ের মতো। তাই সে ভালোবাসা ছিল সরল ও সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দক্ষতায়ও বাবার অগাধ আস্থা ছিল। বাবার প্রাণপ্রিয় ছাত্ররা তাঁর চিকিৎসা করলেন, সুস্থও হলেন। ছাত্র-শিক্ষকের নিবিড় এ বন্ধনের সাক্ষী ছিলাম আমি, চমকিত হয়েছিলাম। বুঝলাম, সমাজের জন্য, দেশের জন্য বাবার রেখে যাওয়া বড় উপহার তাঁর সুযোগ্য ছাত্ররা, যাদের চেতনার ছাঁচ তিনি গড়েছেন পরম যত্নে।
ক্যানসার যোদ্ধাদের সারথি হয়ে বাবার শেষ কটি বছর কেটেছে সচেতনতার মশাল হাতে ক্যানসার জয়ের মূলমন্ত্র ছড়িয়ে। এখানে থেমো না বইয়ে লিখেছেন ‘যখন মনের সাথে বোঝাপড়া হয়— সময় অল্প, কিন্তু বাঁচব আনন্দে, মানুষ তখন ক্যানসার জয় করে।’
আমার বাবা ক্যানসারজয়ী অদম্য লড়াকু। তিনি তাঁর ক্যানসার সহযোদ্ধাদেরই একজন, যাঁরা চিরকাল অপরাজিত।
আমাদের কাছে বাবা ছিলেন ‘লর্ড অব দ্য রিংস’-এর গ্যান্ডালফ, যাঁর ছিল জাদুকরি শক্তি। তাঁর প্রজ্ঞার বিচ্ছুরিত আলোয় আলোকিত হয়েছে আমাদের চলার পথ। আমার পিএইচডি গবেষণা নিয়ে বাবার ছিল দারুণ উত্তেজনা। বাবার শিশুতোষ জিজ্ঞাসু মন, তারার মতো জ্বলজ্বলে চোখ আর আমার গবেষণা যেন বিনিসুতায় গাঁথা মালা। মাঠপর্যায়ে গবেষণা করতে, কৃষকের কুশল জানতে, বাবার হাত ধরে গিয়েছিলাম পল্লিবাংলার আনাচকানাচে। মশগুল ছিলাম গল্পে। ঢাকায় ফিরতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছবির মতো ছিমছাম গ্রামগুলোর একটি ছবিও তোলা হয়নি! মজার ব্যাপার হলো, বহুদিন পর সেদিন বাবার ফটো অ্যালবাম ঘাঁটছিলাম। মুখোমুখি হলাম বিমুগ্ধ এক বিস্ময়ের, যার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাবা তাঁর ফটো অ্যালবামে রেখে গেছেন গ্রামবাংলার সেই ছবিগুলো। আমি ক্যামেরাবন্দী করতে ভুলে গিয়েছিলাম, বাবা ভোলেননি। এ যেন গোপন সিন্দুকে গুপ্তধনের খোঁজ পেলাম। এ গুপ্তধনের নাম ‘বাবা–মেয়ের বন্ধন’, মৃত্যুতেও যা অটুট।
বড় শৌখিন মানুষ ছিলেন বাবা। ঝরঝরে ভাতের মনমাতানো সৌরভ ভালোবাসতেন। জঙ্গলের ঝুম অন্ধকারে রোমাঞ্চ খুঁজতেন। ঝিঁঝি পোকার ডাকে কান পাততেন। আমৃত্যু জীবনের অর্থ খুঁজতেন আত্মনিবেদনে, কর্মে। তাই বাবাকে খুঁজে পাই সাহিত্যে, কবিতায়, গানে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা বইয়ে বলেছেন, ‘মৃত্যুর মানে হলো অন্তহীন বিশ্রাম, তাই তার আগে অবিরাম কাজ করে নেওয়াই শ্রেয়।’
চিরকালই তো কাজ করলে মহাসমারোহে বাবা। এখন তুমি বিশ্রাম করো। আর একদিন তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ আমায় কোরো, অপেক্ষায় থাকব।