এমনই এক মাঘের শীতের রাত। নড়াইলের নড়াগাতী থানার পুটিমারি গ্রামের এক ধানখেতে বসে আছি কাঠের গ্যালারিতে। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ। কিছুক্ষণ পরপর জোর করে চোখ মেলছি, এই বুঝি এলেন। কিন্তু না, তাঁর বদলে আসছেন একেকজন সার্কাসশিল্পী। আয়োজনের শেষভাগে তিনি যখন এলেন, কাঁচা ঘুমভাঙা চোখে দেখলাম প্রায় ৬০ বছরের ব্যক্তিকে। কয়েক সপ্তাহ আগে বিটিভিতে দেখানো নায়কের সঙ্গে যাঁর মিল আছে শুধু টেরি কাটা চুলে।
মুখে পানির ঝাপটা মেরে আবার তাকালাম। এবার তিনি কথা বললেন। কী কথা, ২৪ বছর পর এসে সেটা আর পুরোপুরি মনে নেই। শুধু মনে আছে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের জাভেদ।...দুটি খেলার পরই আমি আবার মঞ্চে আসছি। তখন সবাই একসঙ্গে নাচব।’
মাইকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শুনে অবশ্য কোনো সন্দেহ রইল না, তিনি অভিনেতা ইলিয়াস জাভেদ। সেই কিশোর বয়সে তাঁকে যেদিন দেখেছিলাম, তখন তিনি আর নায়ক হিসেবে পর্দায় অভিনয় করেন না। তবে টিভিতে তাঁর পুরোনো সিনেমা দেখেছি। সেখানে ‘নিশান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি’ সিনেমায় তাঁর যেমন চরিত্র, তার সঙ্গে এই নায়কের মিল কম। তবে চুলের স্টাইল আর রঙিন পোশাকে ফারাক নেই।
পুটিমারির ওই সার্কাসের মাঠের পাশের গ্রাম পানিপাড়া, আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি। পাশের গ্রামে সপ্তাহ ধরে সার্কাস দেখানো হচ্ছে বলে ভগ্নিপতি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সার্কাস দেখাতে। আর সেখানে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল নায়ক ইলিয়াস জাভেদের উপস্থিতি। সে সময় অবশ্য শীতকালে গ্রামে গ্রামে সার্কাস, যাত্রাপালার চল ছিল। আর সেখানে দর্শক টানতে মাঝেমধ্যে টেলিভিশন, সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে যাওয়া হতো। তেমনই এক আয়োজনে সার্কাসের মাঠে গিয়েছিলেন ইলিয়াস জাভেদ।
যাহোক, পুটিমারি বাজার লাগোয়া কাঁচা রাস্তার পাশে ধানখেত। কিছুদিন আগেই যেখান থেকে ধান কাটা শেষ হয়েছে। এরপর সেখানে বিশাল প্যান্ডেল আর শাামিয়ানা খাটিয়ে তৈরি হয়েছে সার্কাসের মাঠ। মাঝখানে গোলাকার মঞ্চ আর চারপাশ ঘিরে কাঠের গ্যালারি উঠে গেছে ওপরে। সামনের দিকে অবশ্য কিছু চেয়ার দেওয়া, বিশেষ টিকিটধারীদের জন্য। প্রথমবার রুদ্ধশ্বাসে দেখলাম সার্কাসের বিস্ময়কর সব খেলা। সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা, বোর্ডের সামনে একজনকে বেঁধে রেখে চরকির মতো ঘুরিয়ে দূর থেকে চোখ বাঁধা অন্যজনের ছুরি মারা, ডিগবাজি আর রিং নিয়ে আরও কত কারিকুরি!
এরপর নায়কের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়া আর নায়ক আসার পর আবার তাঁকে কাছ থেকে দেখা, যা সেই রাতের বিস্ময় দ্বিগুণ করে তুলেছিল। বেশ কয়েকটি গানের সঙ্গে তিনি নেচেছিলেন। আর কোনো এক সিনেমার সংলাপ বলেছিলেন মাইক্রোফোনে। যেটা শুনে দর্শক মাঝরাতে হাততালি দিতে কার্পণ্য করেনি। ঠিক শুক্রবার বিটিভিতে সাপ্তাহিক সিনেমার দিন ইলিয়াস জাভেদের ‘নিশান’ দেখে যেমন তালি দিতে দেখতাম।
আজ ২১ জানুয়ারি কিছুক্ষণ আগে একটি খবর দেখলাম, ‘চিত্রনায়ক জাভেদ মারা গেছেন’। মৃত্যুর খবরটা শুনে হঠাৎ ছেলেবেলার ফিরে গেলাম। এরপর বিভিন্ন সময়ে কয়েকবার ইলিয়াস জাভেদকে দেখলেও প্রথমবার দেখার সেই দিনের কথাই মনে এল বারবার।