
একরকম ‘বাচ্চা ছেলে’ হিসেবে স্পাইডার–ম্যানে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল। সেই টম হল্যান্ড এখন হলিউড-দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেড়ে ওঠা, তারকাখ্যাতি সামলানো, এমন নানা প্রসঙ্গেই তিনি কথা বলেছেন রিচ রোলের একটি পডকাস্টে। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
সার্ফারদের একটা কথা আমার প্রায়ই মনে বড়ে। তাঁরা বলেন, বড় কোনো ঢেউয়ের মুখোমুখি হলে সবচেয়ে খারাপ হলো শরীর শক্ত করে ফেলা। আপনাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে হবে। সব সময় খেয়াল করেছি, জনপরিসরে লোকজন ছবি তোলার জন্য ছুটে এলে যদি এড়ানোর চেষ্টা করি, তাহলেই আমার দিনটা খারাপ যায়। কিন্তু যদি ভেবে নিই, ‘থাক না, এটা তো আমার কাজেরই অংশ। আমার সৌভাগ্য এই সুযোগ পেয়েছি। ছবি তুলতেও ভালোই লাগছে।’ তখন দিনটাও দারুণ কাটে।
অবশ্য লন্ডনে বড় হওয়া কারও জন্য এটা খুব কঠিন। লন্ডনের রাস্তায় কেউ যদি হঠাৎ আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসে, প্রথমেই মনে হবে, ‘ও আমার সঙ্গে কথা বলছে কেন!’ কেউ যদি স্রেফ সময় জিজ্ঞেস করে, তা-ও মনে মনে বলবেন, ‘সময় জানার দরকার কী!’ অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে লন্ডন শহরটা একেবারেই অসামাজিক। তাই একজন খাঁটি লন্ডনি হিসেবে বড় হওয়ার পর হঠাৎ যখন বিখ্যাত হয়ে গেলাম, রাস্তায় হুটহাট মানুষের এভাবে কাছে আসা মেনে নিতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।
ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকে, বিশেষ করে স্পাইডার-ম্যান ১ মুক্তির ঠিক পর মানুষ যখন ছবি তুলতে চাইত, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারতাম না, আমার সঙ্গে ছবি তোলার কী আছে! ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগত। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়াই হতো, ‘না, আমি আপনার সঙ্গে ছবি তুলতে চাই না।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি।
আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে আমার জীবনটা খুব ধীরে ধীরে বদলেছে। খুব ছোটবেলায় কাজ শুরু করেছি। স্পাইডার-ম্যান হওয়ার আগেও প্রায় ১০ বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তবে স্পাইডার-ম্যানই ছিল জীবনের বড় টার্নিং পয়েন্ট। সেখান থেকেই সবকিছু রাতারাতি বদলে যায়। আমি ভাগ্যবান যে ওই শুরুর বছরগুলোতে বড় হওয়া, ভুল করা, শুটিং সেটের জীবন সম্পর্কে জানা এবং চলচ্চিত্র তৈরির জগৎটাকে বোঝার সুযোগ পেয়েছিলাম।
পরিবারের দিক দিয়েও আমি ভীষণ ভাগ্যবান। বিশেষ করে বাবার কথা আলাদা করে বলতেই হয়। চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করা এক জিনিস, আর স্ট্যান্ড-আপ কমেডির জগতে থাকা আলাদা জিনিস। আমার মনে হয় ওটাই বিনোদনের সবচেয়ে কঠিন মাধ্যম। বাবা প্রতিদিন এই জগৎটা সামলেছেন। বাবার একটা জিনিস আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি—ছোটবেলায় যদি কখনো কোনো শোতে খারাপ পারফর্ম করতেন, আমরা সন্তানেরা কখনোই তা ঘুণাক্ষরেও টের পেতাম না। পরের দিন তাঁর মুখে বা আচরণে সেই হতাশার বিন্দুমাত্র ছাপ থাকত না। প্রতিটা শো শেষে তিনি এমনভাবে বাড়ি ফিরতেন, যেন সেদিনের মঞ্চ তিনি একাই মাতিয়ে এসেছেন! যখন কোনো অডিশন খুব করে চেয়েও পেতাম না, তখন বাবার এই গুণটা রপ্ত করার চেষ্টা করতাম।
কদিন আগে হঠাৎই আমার প্রাইমারি স্কুলের ইয়ারবুকটা খুঁজে পেলাম। সব সময় ভেবে এসেছি, আমি তো কখনোই অভিনেতা হতে চাইনি। পারফর্ম করতে, মঞ্চে থাকতে, নাচতে ভালো লাগত। কিন্তু অভিনয় আমার লক্ষ্য ছিল না।
ছোটবেলায় একটি ড্যান্স স্কুলে যেতাম। প্রতিবছর রয়্যাল ব্যালের সঙ্গে আমরা একটা শো করতাম। তো সেখানকার হেডমাস্টার আমাকে ওয়েস্ট এন্ড থিয়েটারের ‘বিলি এলিয়টে’ অডিশন দিতে বলেন। কদিন পর দেখা গেল, যে স্কুলে ছেলেরা সবাই রাগবি খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে আমি একা টিফিনের সময় জিমনেসিয়ামে ব্যালে নাচের অনুশীলন করছি। বেশ তিক্ত কিছু অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরিত্রটা আমি পেয়ে যাই। বিলি এলিয়ট শেষ করার পর যখন দ্য ইম্পসিবল সিনেমায় সুযোগ পাই, তখন প্রথম মনে হলো, ‘আরে! আমি তো অভিনয়টাও করতে পারি!’ এটাকেই হয়তো পেশা হিসেবে নেওয়া যায়।
কিন্তু এসব অনেক পরের কথা। অথচ ইয়ারবুকটাতে দেখলাম, বেশ কিছু ছেলেমানুষি প্রশ্নোত্তর লেখা। সেখানে ‘বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?’ প্রশ্নের পাশে লিখে রেখেছিলাম—অভিনেতা!
কী অদ্ভুত! সচেতন মনে কখনোই অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা জাগেনি। হয়তো অবচেতনে এটাই চেয়েছিলাম।
আমি মানসিক স্বাস্থ্যকে খুব গুরুত্ব দিই। একবার সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, কাজটা সবাইকে জানিয়েই করা উচিত। চাইনি লোকে ভাবুক, ছেলেটা কোথায় হারিয়ে গেল। কিন্তু ঘোষণা দেওয়ার পর ফল হলো উল্টো। মানুষ বলতে শুরু করল, ‘ও! তুমি তাহলে এই খ্যাতির চাপ সামলাতে পারছ না!’
অথচ আমার শুধু মনে হয়েছিল, ফোন থেকে চোখ তুলে চারপাশের জগৎটার সঙ্গে একটু যুক্ত হওয়া দরকার। আমি জানি, সোফায় বসে টানা চার ঘণ্টা স্ক্রল করে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারি! তাই এখন আমার ফোনে ইনস্টাগ্রাম অ্যাপটাই থাকে না। ফোনের এই কৃত্রিম দুনিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার পর থেকে জীবনটা আগের চেয়ে অনেক সুন্দর কাটছে।
আমি সত্যিই আশা করি, মানুষের এই চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসবে। কারণ, মনটাকে রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি। শুধু একজন বোকা মানুষই আপনাকে বলবে, ‘যতক্ষণ না তুমি ভেঙে পড়ছ, ততক্ষণ কাজ করে যাও।’ কারণ, একবার ভেঙে পড়লে আবার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার যাত্রাটা অনেক দীর্ঘ। তাই আমার মতে, একটু বিরতি নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে আবার নিজের সেরা রূপে ফেরাটাই ভালো। কটূক্তি করার বদলে এই সিদ্ধান্তকে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
লাখো মানুষ আমাকে দেখবে, আমার ভুলত্রুটি বিচার করবে—এই ভাবনা আমি কখনোই মাথায় আনি না। নিজের কাজটা নিজের পছন্দ হলো কি না, নিজের সেরাটা দিলাম কি না, এটাই আমার কাছে মুখ্য। এ ব্যাপারে বাবার একটা উপদেশ খুব মনে পড়ে। যখনই কোনো সমস্যায় পড়ি বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি, বাবাই আমার প্রথম ভরসা।
বাবা আমাকে লি ইভান্স নামে যুক্তরাজ্যের এক বিখ্যাত কমেডিয়ানের গল্প শুনিয়েছিলেন। তিনি অসাধারণ পারফরমার, দারুণ সব চরিত্র মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি নাকি মঞ্চে উঠলেই ভীষণ ঘামতেন। স্যুট পরে ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যেই ঘেমে চুপচুপা হয়ে যেতেন!
একবার বাবা আর লি একটা পাবে একসঙ্গে পারফর্ম করতে গিয়েছেন। দর্শক ছিল বড়জোর ২০০ জন। ব্যাকস্টেজে লি চোখে ড্রপ দিচ্ছিলেন। দেখে বাবা বলেছিলেন, ‘করছ কী?’ লি বললেন, ‘এটা দিলে আমার চোখ দুটো চকচক করে!’ বাবা তখন মনে মনে ভাবছিলেন, ‘সামনে দর্শক তো মোটে ২০০ জন! এত কষ্টের কী দরকার।’
কিন্তু এই ঘটনা থেকেই বাবা একটা শিক্ষা নিয়েছিলেন। সামনে এক লাখ মানুষ থাকুক, কিংবা মাত্র পাঁচজন, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলো সর্বনিম্ন শর্ত। আপনি কোনো কাজ অর্ধেক মন দিয়ে করতে পারবেন না। এই কথাটা খুব শক্তভাবে মনে গেঁথে নিয়েছি। তাই আমি সব সময় আমার শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করি।