কয়েক মাস আগেও ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ক্লাসরুমে বসে সংবিধানের ধারা, মামলার নজির আর বিচারিক ব্যাখ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতেন। তাঁরাই এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রাঙ্গণে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে করছেন নানা কাজ। এই দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে ছয় মাসের এই বিশেষ ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম। অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন সদ্য স্নাতক ২৫ আইন শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)—এই পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই ছিলেন সবচেয়ে বেশি—১২ জন। এ ছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ জন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ২ জন এবং ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস থেকে ১ জন করে এই সুযোগ পান।
সুযোগ পাওয়ার খবরটি নাঈম হকের কাছে ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আইনের ছাত্র হিসেবে বাংলাদেশের আইন পেশাজীবীদের শীর্ষতম প্রতিষ্ঠান অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের প্রতি একটা আগ্রহ, আকর্ষণ সব সময় কাজ করত। সেই জায়গা থেকে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়ার অনুভূতি অন্যান্য প্রাপ্তির চেয়ে অবশ্যই আলাদা। এ জন্য আমি বিশেষ করে আমার বিভাগের কাছে কৃতজ্ঞ।’
ইন্টার্নশিপের প্রথম কয়েক দিন অনেকের কাছেই সবকিছু নতুন ছিল। আদালতের আনুষ্ঠানিকতা, ফাইলের স্তূপ, আইনজীবীদের ব্যস্ততা, সবকিছুই যেন বইয়ের বাইরে এক নতুন বাস্তবতা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহাদ উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা মূলত ধারা, অনুচ্ছেদ ও বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আইন শিখি। যেমন সংবিধান বা দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা পড়ার সময় সেগুলো বেশ স্পষ্ট ও কাঠামোবদ্ধ মনে হয়। কিন্তু এই ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি, বাস্তবে একটি মামলার পটভূমি, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং মানবিক পরিস্থিতি আইন প্রয়োগকে অনেক জটিল করে ফেলে। অনেক সূক্ষ্মভাবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করতে হয়।’
এই ছয় মাস দিনের বড় একটা অংশ কেটেছে গবেষণার কাজে। কোনো মামলার জন্য পুরোনো নজির খোঁজা, আইনি যুক্তি বিশ্লেষণ, ফাইল প্রস্তুত করা—এসব কাজের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তাঁরা আইন পেশার বাস্তব রূপের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরিত আহসান বলেন, ‘ছয় মাস কাজের মধ্যে বেশির ভাগটাই ছিল রিসার্চকেন্দ্রিক। প্রথম তিন মাস বাকি ইন্টার্নদের সঙ্গে টিমওয়ার্ক ও গবেষণায় কেটেছে। সঙ্গে দিনের অর্ধেক আপিল বিভাগের শুনানি পর্যবেক্ষণ করেছি। সৌভাগ্যক্রমে, বেশ কিছু আলোচিত মামলার শুনানি আমরা পেয়েছি, এমনকি এগুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়েছে। শেষ তিন মাস ছিল মেন্টরদের দিকনির্দেশনায় বিভিন্ন মামলা–মোকদ্দমার ফাইল ম্যানেজমেন্ট, ব্রিফিং এবং তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক কোর্ট কার্যক্রম পরিদর্শন। পুরো ছয় মাসই দারুণ কার্যকর ছিল।’
ইন্টার্নশিপ চলাকালে তাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও জনস্বার্থ–সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর কার্যক্রম। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁরা যুক্ত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত জাকারিয়া বলেন, ‘রাষ্ট্রের যেকোনো আইনি স্বার্থ রক্ষায় অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইমত্রিতা হোসেন বলেন, ‘শুরুতে উচ্চমানের গবেষণা ও খসড়া প্রস্তুতের চাপ ছিল। আমাদের মেন্টরদের ও সামগ্রিকভাবে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে কর্মরত স্যার-ম্যামদের পরামর্শ ও নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে চাপ কাটিয়ে উঠেছি।’
ছয় মাসের অভিজ্ঞতায় অনেকে ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেজওয়ানা রশিদ যেমন বললেন, ‘ইন্টার্নশিপ করে আইন পেশা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরও পরিপক্ব হয়েছে। নিজের লক্ষ্য এখন চোখের সামনে আরও স্পষ্ট। পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। আইন শিক্ষার্থীদের বলব, তত্ত্বের পাশাপাশি গবেষণা, ড্রাফটিং ও কোর্ট অভিজ্ঞতায় নিজেকে দক্ষ করে তুলুন। নৈতিকতা ও নিষ্ঠাই আপনাকে এগিয়ে রাখবে।’