লিখেছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তাসকিদ জাবিদ
আমার জীবনের গত ৩০ বছরের বেশির ভাগটাই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে কেটেছে। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে মহাখালী ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমরাই ছিলাম প্রথম ব্যাচ। মনে আছে, যে ২০ জন ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমি ছিলাম সর্বশেষ।
তখনো বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটা নতুন। ডিগ্রির কোনো মূল্য থাকবে কি না, এখানে পড়ে আদৌ চাকরি হবে কি না—অভিভাবকদের মনে এমন অনেক প্রশ্ন ছিল। তবু আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা) স্যারকে দেখে ভর্তি হয়েছিলাম। দেশে অর্থনীতিবিদ হিসেবে স্যারের যেহেতু একটা সুনাম আছে, তাঁর প্রতি আমরা আস্থা রেখেছিলাম।
আস্থা রাখা যে ভুল হয়নি, সে প্রমাণও প্রথম সেমিস্টারেই পেয়ে গিয়েছিলাম। শুরু থেকেই টের পাচ্ছিলাম, পড়ালেখার মানের ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। শিক্ষার্থীরাও ছিলেন ভীষণ আন্তরিক। মুখস্থ নয়, বুঝে বুঝে পড়াই ছিল আমাদের মূলমন্ত্র। গণিত, পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোও গভীরে গিয়ে পড়ানো হতো। আবার পরীক্ষা বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হতো মার্কিন শিক্ষাপদ্ধতি।
মধ্যবিত্ত সমাজই গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে যেখানে আর্থিক সক্ষমতা নয়, শিক্ষার্থীদের মেধাই হবে প্রধান যোগ্যতা। বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণের পেছনেও রয়েছে গভীর দর্শন—পশ্চিমের বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রজ্ঞার সঙ্গে পূর্বের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান সভাপতি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
হাতে-কলমে শেখার ওপর জোর দেওয়ার চর্চাটা তখন থেকেই ছিল। মাঠপর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করতাম আমরা, করতাম বিশ্লেষণ। মনে আছে, প্রথম সেমিস্টারেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গিয়ে আমাকে প্রচুর উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়েছিল। সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেখানে পড়ে থেকেছি, বাজার যাচাই করেছি। ৩০ বছর আগে এই ব্যাপারটা কিন্তু খুব প্রচলিত ছিল না। যদি ভুল না করি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও এই চল খুব একটা ছিল না। দল বেঁধে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যেতেন, তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করতেন। মনে আছে, একটা দল গিয়েছিল বাংলাদেশ বিমানে। বিমানের ক্ষতির কারণগুলো কী, খরচের খাতগুলো কোথায়, এগুলো নিয়ে সেই সময়ই শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণ করেছিলেন।
যে ছয়জন শিক্ষক আমাদের ছিলেন, বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন। তাই তাঁদের পড়ানোর ধরনও ছিল একটু আলাদা, আধুনিক।
ছোট পরিসরে, কিন্তু বড় স্বপ্ন নিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির জন্ম হয়েছিল। উদ্দেশ্যটা শুরু থেকেই ছিল পরিষ্কার। উচ্চশিক্ষাকে সুলভ, সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন করা; এবং বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখা। তিন দশক পরও এটাই আমাদের মূলমন্ত্র।শামস রহমান, উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
পাস করার পরপরই আমি ইস্ট ওয়েস্টেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে নানা গবেষণায় যুক্ত ছিলাম। তাই উচ্চশিক্ষার জন্য কোরিয়ায় পাড়ি জমাতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। স্নাতকোত্তর, পিএইচডি শেষে ২০১২ সালে যখন ফিরি, ইস্ট ওয়েস্ট তখন মহাখালী থেকে আফতাবনগর ক্যাম্পাসে চলে এসেছে।
প্রথমবার নিজস্ব ক্যাম্পাসে পা রাখতেই মন ভালো হয়ে গিয়েছিল। এত বড় ক্যাম্পাস দেখে একটু অবাকও হয়েছিলাম। কোন দিকে কী আছে, রীতিমতো খুঁজে খুঁজে বের করতে হচ্ছিল।
তারপরও একটা জীবনই তো ইস্ট ওয়েস্টে কেটে গেল। শুরুতে শিক্ষার্থী, এরপর প্রভাষক, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, এখন অধ্যাপক। বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। যে শিক্ষা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছি, সেটাই এখন শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এই ৩০ বছরে শিক্ষার্থী, শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে, আকারে বড় হয়েছে ক্যাম্পাস, তবে আমার আনন্দ হয় তখন, যখন দেখি দেশে ও সমাজে আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। আমরা শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে চাই না; বরং এমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই, যারা সমাজকে এগিয়ে নেবে, দিকনির্দেশনা দেবে। এখান থেকেই তৈরি হবে বুদ্ধিজীবী।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অবদান রাখতে একসময় ফরাসউদ্দিন স্যার, সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী স্যারের মতো মানুষেরা ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি গড়ে তুলেছিলেন। সেই মশাল বহনের দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের। আশা করি ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা দেশ গঠনের কাজে আরও বেশি অবদান রাখবে।