মর্টারবোর্ড ক্যাপের উৎপত্তি ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালিতে
মর্টারবোর্ড ক্যাপের উৎপত্তি ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালিতে

সমাবর্তনের টুপিগুলো গোল না হয়ে চারকোনা হয় কেন

মাথার অন্যান্য টুপি গোল হলেও গ্র্যাজুয়েশনের এই টুপি কেন এমন চারকোনা? এই টুপির ইতিহাস সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষ হয় সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে সব শিক্ষার্থী একসঙ্গে তাঁদের মাথার টুপি আকাশের দিকে ছুড়ে দেন। তবে টুপি ওড়ানোর আগে একটি বিশেষ নিয়ম পালন করতে হয়।

অনুষ্ঠানে যখন ঘোষণা করা হয় ‘আপনারা এখন গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক’, ঠিক তখনই শিক্ষার্থীদের টুপির ঝুলন্ত ফিতা বা ট্যাসেলটি ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সরাতে বলা হয়। এই ট্যাসেলটি ডান থেকে বাঁয়ে সরানোর মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থীর ডিগ্রি পাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

এই আনুষ্ঠানিকতার পরই বিশেষ টুপিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবারের সামনে আসার মুহূর্তটি তাঁদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক ও স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকে। সমাবর্তনের টুপিটিকে বলা হয় মর্টারবোর্ড ক্যাপ। ওপরের অংশটি চ্যাপ্টা হওয়ায় দূর থেকে চোখে পড়ে।

চারকোনা হওয়ার কারণ

মর্টারবোর্ড ক্যাপের উৎপত্তি ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালিতে। সে সময় ‘বাইরেটা’ নামের ক্যাথলিক যাজকদের একধরনের টুপি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয় এই টুপি। চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই গির্জার যাজক ও বড় বড় পণ্ডিত এই বাইরেটা টুপি পরতেন।

তবে শুরুর দিকের মর্টারবোর্ড ক্যাপগুলো আজকের মতো চারকোনা ছিল না। সেসবের ওপরের দিকে তিনটি উঁচু অংশ ও মাঝখানে একগুচ্ছ সুতা থাকত।

এই টুপি চারকোনা রূপ নিতে শুরু করে ১৬৬০ সালের দিকে। সে বছর রাজা দ্বিতীয় চার্লস ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। ইতিহাসবিদ স্টিফেন ওলগাস্টের মতে, নতুন রাজার প্রতি আনুগত্য ও সম্মান দেখানোর জন্য যাজক ও পণ্ডিতেরা তাঁদের টুপির ওপরের অংশটি ধীরে ধীরে বড় করতে শুরু করেন।

কিন্তু টুপির ওপরের অংশটি বেশি বড় হয়ে যাওয়ায় তা সোজা বা চ্যাপ্টা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সেই বড় অংশটির আকৃতি ঠিক রাখার জন্য ভেতরে শক্ত কিছু দিয়ে তা সমতল করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবেই জন্ম নেয় আজকের এই শক্ত ও সমতল চারকোনা গ্র্যাজুয়েশন টুপি।

গ্র্যাজুয়েশনের এই বিশেষ টুপির নাম মর্টারবোর্ড হয়েছে মূলত এর আকৃতি থেকে

মর্টারবোর্ড নামটি এসেছে যেভাবে

গ্র্যাজুয়েশনের এই বিশেষ টুপির নাম মর্টারবোর্ড হয়েছে মূলত এর আকৃতি থেকে। টুপিটি দেখতে আদতে নির্মাণশ্রমিকদের মর্টার (গাঁথুনির মসলা) বহন করার জন্য ব্যবহৃত বর্গাকার বোর্ডের মতো।

নির্মাণশ্রমিকদের ব্যবহৃত আসল মর্টারবোর্ডটি মূলত সমতল কাঠের তক্তা। একাডেমিক বা গ্র্যাজুয়েশন টুপিটির ওপরের অংশটি দেখতে হুবহু ওই তক্তার মতো ছিল। তাই ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এটি নিয়ে ঠাট্টাও করতেন।

ছাত্ররা এর নাম দেন মর্টারবোর্ড। পরে এই নামই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এই টুপির নামের সুনির্দিষ্ট উৎপত্তি নিয়ে কিছুটা ভিন্নমতও আছে।

সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে এই টুপি

সপ্তদশ শতকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোশাক নিয়ে কঠোর নিয়ম ছিল। তখন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের এই টুপি ও গাউন পরতে হতো। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের পরতে হতো পুরোনো আমলের গোল টুপি। অন্যদিকে যাঁরা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতেন, কেবল তাঁরাই মর্যাদার প্রতীক হিসেবে চারকোনা টুপি পরার অনুমতি পেতেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে শিক্ষার্থীরা

১৬৭৫ সালের দিকে ধনী পরিবারের সাধারণ স্নাতকদেরও এই চারকোনা টুপি পরার অধিকার দেওয়া হয়। এভাবেই টুপিটি উচ্চশিক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। নতুন মহাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময় পড়াশোনার নিয়ম ও ডিগ্রির শর্তগুলো ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলেই তৈরি করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রথম দিকের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের অন্যান্য জায়গায় নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখন ইউরোপের এই প্রাতিষ্ঠানিক পোশাকের ঐতিহ্যও পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে যায়। পরে সারা বিশ্ব তা অনুসরণ করতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই টুপি পরার পদ্ধতিতে নতুন কিছু প্রথা তৈরি হয়। প্রায় ১০০ বছর আগে সেখানকার শিক্ষার্থীরা সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তাঁদের টুপির ট্যাসেলটি ডান দিক থেকে ঘুরিয়ে বাঁ দিকে সরানো শুরু করেন।

আজ পর্যন্ত এই ফিতা ঠিক কোন পাশে রাখা উচিত, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো লিখিত নিয়ম তৈরি হয়নি। তবে তখন করা হতো বলে আজও সেটি করা হয়।

এই প্রথা এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেনে চলে।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও রিডার্স ডাইজেস্ট