
চলতি মৌসুমে আপনি ‘ব্রাজিল’ হোন আর ‘আর্জেন্টিনা’, সারা বছর আপনি বাংলাদেশি। অতিথি আপ্যায়ন, ভূরিভোজ, আড্ডা, উত্তেজনা আর উচ্ছ্বাসে ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা’ হয়ে যাক ভাই ভাই।
৭ জুন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত। কিছু করার ছিল না, তাই রেললাইনের পাশের ভবনগুলোর ছাদে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকার সংখ্যা গুনছিলাম। অবশ্য মিনিট চল্লিশ পরই ঘুমিয়ে পড়ি। ফলে জরিপটা মাঠে মারা যায়।
রেললাইনের দুই পাশে ঘরবাড়ি আর ছাদে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্সসহ নানা দেশের পতাকা উড়ছে পতপত করে। অনেকের বাড়ির বারান্দা থেকে ঝুলছে প্রিয় দেশের পতাকা। বাড়ির সদর দরজা আর দেয়ালও রং করা হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার রঙে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেশ কিছু বাড়ি আর কন্ডোমিনিয়াম অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে দেখা গেল ৮-১০টি করে ব্রাজিলের পতাকার বিপরীতে মাত্র ১টি বা ২টি আর্জেন্টিনার পতাকা। সেখানে বোধ হয় ব্রাজিলের সমর্থকেরাই দলে ভারী।
বেশ কিছু বাসার ছাদে নিয়ম মেনে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকার ওপরে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা, এটা দেখেই বেশি ভালো লাগল।
বিয়ের পর প্রথম আমরা ঢাকার দিলু রোডে যে বাসাটায় উঠি, সেটির নাম ছিল ‘আর্জেন্টিনা বাড়ি’। ১০ তলা ভবনের দুই পাশে চারটি করে ইউনিট, পুরোটাই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো। তাতে সুবিধা ছিল এই যে আত্মীয়স্বজন দিলু রোডে পা রাখামাত্র যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিত কোনটা ‘আর্জেন্টিনা বাড়ি’।
আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল—দুটি দেশই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। উভয় দেশের ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশে বিপুল সমর্থন, বিশ্বকাপ চলাকালে উভয় দেশের সমর্থকদের উন্মাদনা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেসব পাগলামি সীমাও ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীতে আছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—উভয় দেশের দূতাবাস। অবশ্য দীর্ঘকাল দেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস ছিল না। ১৯৭২ সালে আর্জেন্টিনা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সে বছরই ঢাকায় দূতাবাস খোলে। পরে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার দূতাবাসটি বন্ধ করে দেয়।
এরপর বহু বছর আর্জেন্টিনার কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো ভারতের নয়াদিল্লি থেকে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। আর্জেন্টিনা একেকটি ম্যাচ জেতার পর দেশের বিভিন্ন রাস্তার আনন্দমিছিল ফলাও করে প্রচারিত হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এমনকি এ-ও বলা হয়, বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের ‘আর্জেন্টিনা ক্রেজ’ নাকি খোদ আর্জেন্টিনার চেয়েও বেশি!
সে বছর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর মিষ্টি বিতরণ, আনন্দমিছিল ও বিরিয়ানি ভোজ চলে মহাসমারোহে। আর্জেন্টিনার সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আন্তরিক হন। তাঁরা প্রিয় বন্ধু বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যের কথাও বলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালের পর দীর্ঘ সময় আর বিশ্বকাপ না জেতায় ব্রাজিলের সমর্থকেরা টিটকারি মেরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বলত ‘আর-জেতে-না’।
এদিকে ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭ গোল খাওয়ার পর থেকে ব্রাজিল সমর্থকদের নাম হয়ে গেল ‘সেভেন আপ’। অবশ্য ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ‘আর-জেতে-না’র দুঃখ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর সমর্থকেরা উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য ‘গোসল করে’ ‘আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল সমর্থক হওয়ার ফরম’ পূরণ করে ‘আর্জেন্টিনা’ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। সেই ফরম ভাইরাল করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এভাবেই তাঁরা ব্রাজিল সমর্থকদের আর্জেন্টিনার সমর্থক বানিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উল্লাস করেছেন একসঙ্গে।
চলছে ‘আপনি ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা’—এ প্রশ্নের মৌসুম। বাংলাদেশ সময় ১১ জুন রাত ১টায় উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রুপ পর্বের খেলা। ৪৮টি দল থেকে ৩২টি দেশের মূল পর্বের খেলা শুরু হবে ২৮ জুন। কোন দেশ বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের বিজয়ী হবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ফাইনাল)।
বিশ্বসেরার বর্তমান মুকুট যেহেতু এখনো আর্জেন্টিনার মাথায়, তাই আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ব্রাজিল সমর্থকদের একসঙ্গে খেলা দেখার দাওয়াত দিতেই পারেন। সেই সঙ্গে চা-নাশতার আড্ডা, একটুখানি খুনসুটি আর লাইভ খেলা দেখা, ভূরিভোজ তো চলবেই।
ব্রাজিলের সমর্থকেরা তো আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বাসায় যাওয়ার সময় খালি হাতে যাবেন না…পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বলে কথা! জেন-জির কল্যাণে ট্রেন্ডে থাকা সূর্যমুখী ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। নিয়ে যেতে পারেন একগুচ্ছ হলুদ গোলাপও। রাত জেগে খেলা দেখার জন্য কফিও নিয়ে যেতে পারেন। ব্রাজিল আবার কফি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে। হলুদ, সবুজ, নীল, রঙিন পোশাক পরে খেলা দেখবেন। আর যদি ব্রাজিল জিতেই যায়, তাহলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের খানিক সাম্বা নাচও দেখিয়ে দিতে পারেন।
এখন কথা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা কীভাবে ব্রাজিল সমর্থকদের আপ্যায়ন করবেন?
ঘরের অন্দরসজ্জায় আকাশি-সাদার প্রাধান্য রাখুন।
অতিথিদের ট্যাঙ্গো নাচ দেখাতে ভুলবেন না। কেননা আপনারা গতবারের বিজয়ী। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ট্যাঙ্গো নাচকে আবার ইউনেসকো ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চার বছরের পুরোনো সুখ নতুন করে একটুখানি ঝালিয়ে নিতে, বিশ্বজয়কে আরেকবার উদ্যাপন করতে আর অতিথি আপ্যায়নে এটুকু তো চলতেই পারে, নাকি?
উভয় দেশের সমর্থককেই ধৈর্য, সহনশীলতা আর পরমতসহিষ্ণুতার সঙ্গে সাম্বা আর ট্যাঙ্গো নাচ উপভোগ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সবাই মিলে সাম্বা আর ট্যাঙ্গো নাচে অংশ নেন। এখন থেকেই ইউটিউব ছেড়ে অনুশীলন করতে পারেন।
আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম গরুর মাংস উৎপাদনকারী দেশ। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার আসাদো, যা মূলত গরুর মাংস ও অন্যান্য মাংস ধীরে ধীরে কয়লার আগুনে গ্রিল করে তৈরি হয়।
ঈদুল আজহার পর তাই আপনার বাসায় ব্রাজিল সমর্থক অতিথি এলে গরুর কালাভুনা খাওয়াতেই পারেন। গরুর মাংসের বিরিয়ানিও করে ফেলতে পারেন। ডেজার্টে অর্ধেক আকাশি আর অর্ধেক হলুদরঙা কেক অর্ডার করতে পারেন। সঙ্গে যে ‘সেভেন আপ’ রাখতে ভুলবেন না, ব্রাজিল সমর্থকেরা সেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন। আষাঢ়ে ‘রিটার্ন গিফট’ হিসেবে থাকতে পারে আকাশি-সাদা ছাতা বা রুমাল।
এখন সময় দল বেঁধে খেলা দেখার। চলতি মৌসুমে আপনি ‘ব্রাজিল’ হোন আর ‘আর্জেন্টিনা’, সারা বছর আপনি বাংলাদেশি। অতিথি আপ্যায়ন, ভূরিভোজ, আড্ডা, উত্তেজনা আর উচ্ছ্বাসে ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা’ হয়ে যাক ভাই ভাই। বিভেদ ভুলে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে উদ্যাপন করতে করতে জয় হোক বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্ববোধের।