অনেক পেশাজীবীই ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে এমবিএ করার কথা ভাবছেন
অনেক পেশাজীবীই ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে এমবিএ করার কথা ভাবছেন

দক্ষ ও পেশাদার এমবিএ গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা বাড়ছে কেন

লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ

এমবিএ বা মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিগ্রি মূলত একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যবস্থাপনামূলক চিন্তাধারার ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করে দেয়। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা জনবল থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনাও শেখে। বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে আজকের যুগে প্রতিদিন আপনি নতুন নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে যাবেন। এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে একটি ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া বিশাল দক্ষতার কাজ। এই জটিল বাস্তবতায় এ ধরনের ফ্রেমওয়ার্কই একজন পেশাজীবীকে টেকসই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিগতভাবে সঠিক থাকার ভিত্তি গড়ে দেয়।

১৯৬০ দশকের শেষ ভাগ থেকেই বিশ্বজুড়ে করপোরেটদের জগতে এমবিএ ডিগ্রির এক অভাবনীয় চাহিদা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক বিশ্বায়ন ও বিশ্বব্যাপী পপ কালচারের উত্থান ভোক্তার চাহিদার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। অনেকে মনে করেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অটোমেশন সবকিছু দখল করে নিচ্ছে, সেখানে এমবিএর মতো প্রথাগত ডিগ্রির গুরুত্ব হয়তো কমছে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষার ধরন বদলেছে সত্য, তবে এমবিএর মূল দর্শন মূলত নেতৃত্ব ও কৌশলগত চিন্তাভাবনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

প্রকৃতপক্ষে এমবিএ শিক্ষার্থীদের শেখায়—কীভাবে প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে একে উদ্ভাবনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। ডেটা অ্যানালিটিকস (উপাত্ত বিশ্লেষণ) থেকে শুরু করে ডিজিটাল রূপান্তর—সবকিছুর পেছনে যে সূক্ষ্ম ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তা এমবিএর মাধ্যমেই অর্জিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ডিগ্রির প্রাসঙ্গিকতা এখন আরও বেশি সুদূরপ্রসারী। তবে হ্যাঁ, বেশ কিছু জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে। দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের এমবিএ পাঠ্যক্রম ও এর কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। ভালো শিক্ষকের অপ্রতুলতাও একটি বড় সীমাবদ্ধতা, সেটা নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।

আমাদের দেশ এখন এক বিশাল অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, দ্রুত বর্ধনশীল স্টার্টআপ ও মেগা প্রজেক্টগুলোর সফল পরিচালনার জন্য প্রচুর দক্ষ ব্যবস্থাপক (ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল) প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্প খাতগুলোতে এখন এমন নেতার দরকার, যাঁরা একই সঙ্গে স্থানীয় চ্যালেঞ্জগুলো বুঝবেন এবং আন্তর্জাতিক মানের কর্মদক্ষতার প্রমাণ দেবেন।

একজন এমবিএ ডিগ্রিধারী যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বসেন, তিনি কেবল বর্তমান লাভ-ক্ষতি দেখেন না, একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনের পথ তৈরি করেন। ফলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ ও পেশাদার এমবিএ গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

যাঁরা নিজের ব্যবসা বা স্টার্টআপ শুরু করার স্বপ্ন দেখেন, এমবিএ তাদের জন্যও একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। একজন সফল উদ্যোক্তা কেবল মূলধন দিয়ে তৈরি হয় না, তাঁর পেছনে থাকে উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি ও কৌশলগত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।

কী শেখানো হয়

এমবিএ ডিগ্রির মাধ্যমে যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য কারিগরি ও মানসিক—উভয় দক্ষতার সমন্বয় শেখানো হয়। আমরা মূলত উদ্ভাবনের দক্ষতা, যোগাযোগের দক্ষতা ও নতুন পরিস্থিতিকে গ্রহণ করার মানসিকতার ওপর জোর দিই।

ক্রস-ফাংশনাল কমিউনিকেশন (ভিন্ন ভিন্ন দলের মধ্যে যোগাযোগ), কনফ্লিক্ট রেজোল্যুশন (দ্বন্দ্ব নিরসন), ইমোশনাল রেগুলেশন (আবেগ নিয়ন্ত্রণ) ও অ্যাডাপ্টিভ থিঙ্কিং (অভিযোজনমূলক চিন্তা)—এগুলো কোনো পরীক্ষাগারে মাপা যায় না, কিন্তু করপোরেট বাস্তবতায় এগুলোই পার্থক্য গড়ে দেয়। আমরা কেস স্টাডি, লাইভ প্রজেক্ট আর পিয়ার লার্নিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এমন একটি মানসিক কাঠামো গড়ে তুলি, যেখানে সমস্যা কোনো নতুন উদ্ভাবনের ক্যানভাস হিসেবে কাজ করে। আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাই, কীভাবে উপাত্ত থেকে পাওয়া জ্ঞানকে কৌশলগত ‘অ্যাকশনে’ রূপান্তর করতে হয়। বিশেষ করে উপাত্তগুলো বোঝা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা—এগুলো আজকের সময়ে বড় প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসহ দেশের প্রথম সারির বিজনেস স্কুলগুলোতে এই সফট স্কিলগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চাকরিদাতাদের চোখে

নিয়োগদাতারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা থেকে কর্মী নিয়োগ দেন। একজন এমবিএ ডিগ্রিধারীর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো বিভাগ যেমন মার্কেটিং, ফিন্যান্স বা এইচআরের জন্য নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। তার যে বহুমুখী জানাশোনা তৈরি হয়, তা প্রতিষ্ঠানকে বহুমুখী সুবিধা দেয়। নিয়োগদাতারা মূলত প্রার্থীর মধ্যে এই বহুমুখী প্রতিভা ও চাপের মুখে কাজ করার সক্ষমতা খোঁজেন। সে কারণেই চাকরিদাতাদের কাছেও এমবিএ ডিগ্রির আলাদা গুরুত্ব আছে।

অনেক সময় পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধিতেও এমবিএ ডিগ্রি ভূমিকা রাখে। তবে আমি মনে করি, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি—এগুলো একসময় হবেই। কিন্তু এমবিএর আসল সার্থকতা হলো সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। আমরা সব সময় উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিই। একজন এমবিএ গ্র্যাজুয়েট যখন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, তিনি তা সমাধানের জন্য গতানুগতিক পথের বাইরে গিয়ে (আউট অব দ্য বক্স) চিন্তা করতে পারেন। পেশাদার চিন্তাধারার এই পরিবর্তনই তাঁর ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদি চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে।

আরেকটা বড় ইতিবাচক দিক হলো—নেটওয়ার্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই যদি বলি, আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের ও আন্তর্জাতিক শীর্ষ সব প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে দিচ্ছেন। এই বিশাল অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক একজন এমবিএ শিক্ষার্থীর জন্য এক অমূল্য সম্পদ। তাঁরা যখন একে অপরকে সহযোগিতা করেন বা অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় পর্যায়েও বিভিন্নভাবে অবদান রাখে।