অনেকেই মনে করেন, সৃজনশীলতা হয়তো জন্মগত প্রতিভা। তবে বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীলতা কোনো জন্মগত রহস্যময় ক্ষমতা নয়; এটি অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি করা যায়।
আজকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু তথ্য জানলেই হবে না, নিজেকে সৃজনশীলভাবে দক্ষ করাটাও বেশ জরুরি। সৃজনশীলতা এমন এক দক্ষতা, যা যন্ত্র সহজে নকল করতে পারে না।
জেনে নিন কীভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক পাঁচ সহজ কৌশলে আপনি আপনার সৃজনশীলতা বাড়াতে পারবেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা একাধিক ভাষা জানেন, তাঁরা সাধারণত বেশি সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে পারেন। কারণ, একই বিষয়কে ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে মস্তিষ্ক নতুনভাবে ভাবতে শেখে। এতে শুধু নতুন শব্দ নয়, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও চিন্তার ধরনও জানা হয়। ফলে নতুন ধারণা তৈরি করা আরও সহজ হয়ে ওঠে। যেমন বাংলা ‘ভালোবাসা’ শব্দটির ইংরেজি ‘লাভ’ এবং জার্মান ‘লিবে’ শিখেছেন। এতে আপনার মস্তিষ্ক শুধু দুটি শব্দ শেখে না; বরং দুটি ভিন্ন ধারণা জগৎ তৈরি করে, যেখানে আবেগ, সংস্কৃতি এবং ভাব প্রকাশের ধরন আলাদা। এতে আপনার চিন্তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
২০২৪ সালে তুরস্কের মনোবিজ্ঞানী সেলকুক আসকার এবং তাঁর সহগবেষকেরা প্রায় ৫ হাজার মানুষের ওপর করা ৩৯টি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখেছেন, দুটি ভাষা জানা মানুষের সৃজনশীল চিন্তাশক্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে দুই ধরনের ভাষা জানলেই কেউ অসাধারণ সৃজনশীল হয়ে যাবেন। আর ভাষা একেবারে নিখুঁতভাবে জানতে হবে, এমনও নয়। নতুন ভাষা শেখার শুরুর চেষ্টাও মস্তিষ্ককে নতুনভাবে কাজ করতে শেখায়।
নতুন ভাষা শিখতে আপনি ভাষা শেখার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন, প্রতিদিন নতুন শব্দ লিখে রাখতে পারেন এবং অন্য ভাষায় ছোট ছোট বাক্য বলার অনুশীলন করতে পারেন।
সৃজনশীল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো খুব দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে না যাওয়া। কারণ, সৃজনশীল চিন্তা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা একটি মাত্র উত্তরকে চূড়ান্ত না ভেবে আরও বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবি। সহজভাবে বললে, কম সৃজনশীল মানুষ সাধারণত একটিমাত্র উত্তরেই থেমে যান। কিন্তু বেশি সৃজনশীল মানুষ একাধিক বিকল্প ভাবেন, সেখান থেকে সবচেয়ে ভালো সমাধানটি বেছে নেন।
ধরুন, কারও বন্ধু হঠাৎ কথা বলা কমিয়ে দিল। একজন ভাবল, ‘সে নিশ্চয়ই রাগ করেছে,’ আর সে–ও কথা বলা বন্ধ করল। অর্থাৎ সে আর কোনো কিছু চিন্তা করল না।
অন্যজন ভাবল, সে কি ব্যস্ত? কোনো সমস্যা হয়েছে? নাকি আমি ভুল বুঝছি?
এই দ্বিতীয় ধরনের চিন্তাই হলো একটিমাত্র সিদ্ধান্তে না থেমে বিভিন্ন সম্ভাবনা খোঁজা, যা মানুষকে আরও গভীর ও সৃজনশীলভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় ডাইভারজেন্ট থিঙ্কিং। এর মানে হলো, একটি সমস্যার জন্য শুধু একটি নয়; বরং একাধিক সমাধান খোঁজা।
ধারণাটি মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জো পল গিলফোর্ড ১৯৫০ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক বিখ্যাত বক্তৃতায় প্রথম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কিছু মানুষ শুধু ‘একটি সঠিক উত্তর’ খোঁজেন, এটিকে বলা হয় কনভারজেন্ট থিঙ্কিং। আর সৃজনশীল মানুষ সাধারণত একই সমস্যার নানা সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ভাবেন, এটিই ডাইভারজেন্ট থিঙ্কিং।
সহজ কিছু অনুশীলনে এই ক্ষমতা বাড়ানো যায়। যেমন আপনাকে যদি একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল দেওয়া হয় এবং বলা হয়, এটি কী কী কাজে ব্যবহার করবেন।
প্রথমে সহজ উত্তর আসবে—গাছে পানি দেওয়া, তেল রাখা বা টব বানানো।
কিন্তু একটু বেশি সময় নিয়ে ভাবলে আরও নতুন ধারণা আসতে পারে—ঝুলন্ত টব, মুরগির খাবারের পাত্র, খুচরা পণ্য মাপার পাত্র বা এমনকি বন্যার সময় ছোট জিনিস রাখার ভাসমান কনটেইনার হতে পারে।
এই পর্যায়েই আসল সৃজনশীলতা তৈরি হয়, যখন পরিচিত আইডিয়া শেষ হয়ে নতুন ভাবনা আসতে শুরু করে।
মস্তিষ্ককে শুধু এক ধরনের চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। অনেক সৃজনশীল মানুষ নানা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা একাধিক বিষয়ে দক্ষ ছিলেন এবং সেখান থেকেই নতুন নতুন ধারণা তৈরি করতে পারতেন। এদের বলা হয় পলিম্যাথ।
যেমন ব্রিটিশ দার্শনিক ও গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল গণিত, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আর মার্কিন অর্থনীতিবিদ হারবার্ট এ সাইমন অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণবিষয়ক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
এ জন্য আপনার মূল কাজের বাইরে আলাদা কোনো শখ শুরু করতে পারেন। যেসব বিষয়ে আগে জানতেন না, সেসব বিষয়ে বই পড়ুন, এতে চিন্তার পরিসর বাড়বে।
ভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, তাঁদের কাজগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। আঁকাআঁকি বা অন্য কোনো নতুন দক্ষতার মৌলিক বিষয় শেখা শুরু করতে পারেন, এগুলো মস্তিষ্ককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সীমাবদ্ধতা অনেক সময় সৃজনশীলতা বাড়ায়। যখন মানুষ স্বাভাবিক উপায়ে কাজ করতে পারে না, তখন সে নতুন সমাধান খুঁজতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ সীমাবদ্ধতাই অনেক সময় নতুন চিন্তার জন্ম দেয়।
যেমন করোনার সময় অনেক শিক্ষক সরাসরি ক্লাস নিতে না পেরে ভিডিও, অ্যানিমেশন বা ইন্টারঅ্যাকটিভ পদ্ধতিতে পড়াতে শুরু করেন। পরে দেখা যায়, এসব নতুন পদ্ধতি শিক্ষাকে আরও সহজ ও কার্যকর করেছে।
আবার, ছোট বাসায় জায়গার অভাব থেকেই ভাঁজ করা যায় এমন আসবাবের ধারণা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সীমাবদ্ধতা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সৃজনশীলতা।
সূত্র: মিডিয়াম