এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আজও চিকিৎসা খাতে দেশের আপামর জনসাধারণের বড় ভরসা এই হাসপাতাল। ১৯৭১ সালে কেমন ছিল সেখানকার পরিস্থিতি? পঁচিশে মার্চের কালরাতেই বা সেখানে কী ঘটেছিল? হাসপাতালটির সেই সময়কার আবাসিক সার্জন ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ–এর সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন রাফিয়া আলম
১৯৭০ থেকে ১৯৭২, সব মিলিয়ে প্রায় তিন বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবাসিক সার্জন এবং রেজিস্ট্রার ছিলেন ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ। পরে অর্থোপেডিক সার্জন থেকে হয়েছেন অধ্যাপক। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান।
বয়স নব্বই পেরিয়েছে। স্মৃতির পাতাগুলো আজ ধূসর। এত বছর আগের নির্দিষ্ট কিছু দিনের কথা মনে করাটা তাই নিতান্তই কঠিন কাজ। তবে নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাসকে তুলে ধরার অনুরোধে রাজি না হয়ে পারলেন না। একটু একটু করে ফিরে গেলেন পঞ্চান্ন বছর আগের দিনগুলোয়।
তখন হাসপাতাল ভবনেই ছিল আবাসিক সার্জনের কোয়ার্টার। কোয়ার্টার বলতে একখানা কেবিন। কেবিন নম্বর সাত। স্ত্রী–কন্যাকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ। হাসপাতালের মূল ভবনেই তখন জরুরি বিভাগ। সেখানেই তাঁকে বসতে হতো। রোগী দেখার বিরতিতে ছোটখাটো আড্ডাও হাসপাতালেই হতো।
পঁচিশে মার্চের আড্ডার বিষয় ছিল মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক। ডা. শামসুদ্দিন বললেন, ‘আমরা ভাবছিলাম, আজকেই একটা কিছু হবে। রাতে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধু হয়তো প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন, আর সে কারণেই উৎসব শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই শব্দ থামছিলই না।’ তাতেই বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালির আশা পূরণ হয়নি। বরং ভিন্ন কিছু, ভয়ংকর কিছু ঘটছে।
রাতে সাত নম্বর কেবিনে চলে গেলেন ডা. শামসুদ্দিন। রাত দুইটার দিকে ওয়ার্ডবয়ের মাধ্যমে খবর পেলেন, রোগী এসেছে। ছুটে গিয়ে দেখেন গুলিতে আহত রোগী, সবাই ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্টের (ইপিআর) সদস্য।
আহত অবস্থায়ই তাঁদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ পার হতে হয়েছিল। ঢাকা মেডিকেলের কাছে রেললাইনের ঢাল প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হয়ে এসেছিলেন তাঁরা। ওই রেললাইনের কাছেই যে এফসিপিএস প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের মেস, এটা তাঁদের জানা ছিল।
তাঁদের কয়েকজন ওই দেয়াল টপকে মেসের চিকিৎসকদের জানান। সেখানকার চিকিৎসকেরাই তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।
ডা. শামসুদ্দিনের মনে আছে, একজন ইপিআর সদস্যকে সে রাতে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ভর্তি রাখাটা নিরাপদ না, যেকোনো সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খোঁজ নিতে পারে, এই আশঙ্কায় অধিকাংশ আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সমাজকল্যাণ দপ্তরের কর্মকর্তা হিসেবে আজিমপুর কলোনিতে একটা বাসা পেয়েছিলেন ডা. শামসুদ্দিনের স্ত্রী। আবাসিক সার্জনের দায়িত্ব পাওয়ার আগে ডা. শামসুদ্দিনরা সেখানেই থাকতেন। ঢাকা মেডিকেলের সাত নম্বর কেবিনে ওঠার পর ওই বাসায় তাঁদের কিছু আত্মীয় ছিলেন।
২৭ মার্চ নয় ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলে সকাল ১০টার দিকে টয়োটায় করে সেই বাসায় সবার খোঁজ নিতে বের হন ডা. শামসুদ্দিন। পথে হঠাৎ শোনেন চিৎকার ‘হল্ট, হল্ট’। জানালা দিয়ে ঘাড় বের করতেই দেখলেন, রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে এক পাকিস্তানি সেনা—গাড়ি পিছিয়ে আনতে বলছে।
দ্রুত গাড়ি পেছালেন ডা. শামসুদ্দিন। এবার শুরু হলো গালাগাল। উর্দুতে জঘন্য সব কথা বলতে শুরু করল রাইফেলধারী। প্রাণনাশের হুমকিও দিল।
সে পথে তখন রেললাইন ছিল। ডা. শামসুদ্দিন দেখলেন, রেললাইনের ঠিক পাশেই ছোট টেবিল আর চেয়ার পাতা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন তরুণ ক্যাপ্টেন সেখানে বসা। ক্যাপ্টেন তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে বিস্তারিত বললেন। সব শোনার পর ক্যাপ্টেন বললেন, তুমি আরেকটু এগোলে ও সত্যিই তোমাকে গুলি করত।
ডা. শামসুদ্দিনের মুখে সেই ঘটনার বর্ণনা শুনতে শুনতে শিউরে উঠছিলাম। তবে তাকিয়ে দেখি, তাঁর মুখে স্মিত হাসি। কী বিভীষিকাই না পেরিয়ে এসেছিলেন তিনি!
শেষ পর্যন্ত অবশ্য আজিমপুরের বাসায় যেতে পেরেছিলেন সেদিন। তবে ফেরার সময় আর ওই পথে ফেরেননি।
মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস ঢাকা মেডিকেলে অন্যান্য রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে রোজই আসত যুদ্ধাহত লোকজন। ভর্তি রাখার প্রয়োজন হলে তাঁদের দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি হিসেবে রাখা হতো। এ ব্যবস্থাপনায় যাঁরা নিয়োজিত ছিলেন, সেই চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিশেষভাবে পঞ্চম বর্ষের এক শিক্ষার্থীর কথা বললেন ডা. শামসুদ্দিন। যদ্দুর মনে পড়ে, সেই তরুণের নাম ছিল সিরাজ।
মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলের কাছে টিনশেড ভবনে থাকত সিরাজ। আর তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যেত জরুরি বিভাগে। এভাবে ঘোরাঘুরি করার কারণে সে বকাও খেয়েছিল ডা. শামসুদ্দিনের কাছে! ওখানে সে কী করে, প্রথমে জানতেন না ডা. শামসুদ্দিন। কারণ, তখন যাঁরাই মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করতেন, কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলতেন না।
আবাসিক সার্জন হিসেবে ওষুধ সরবরাহের কাগজে স্বাক্ষর দিতে গিয়ে ডা. শামসুদ্দিনের একবার মনে হলো, দু–এক দিন আগেই এসব ওষুধ আনানো হয়েছে। এত ওষুধ গেল কই! চিকিৎসক এবং নার্সদের ওপর খুব রাগারাগি করলেন। সবার একই কথা, ‘লাগে স্যার, লাগে।’ পরে বুঝেছিলেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে নয় বরং গোপনে মুক্তিবাহিনীকে ওষুধ, গজ, ব্যান্ডেজ সরবরাহ করা হতো।
যুদ্ধাহত যেসব ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আবাসিক চিকিৎসকের কক্ষেই পরে তাঁদের ফলোআপ করা হতো। সে কাজে নিয়োজিতদের মধ্যে একজনের কথা আলাদা করে বললেন ডা. শামসুদ্দিন। সার্জারি বহির্বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আজহারুল হক।
এই চিকিৎসকের কণ্ঠ ছিল বেশ জোরালো, বেশ দূর থেকেও তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। নভেম্বরের মাঝামাঝি একদিন ডা. শামসুদ্দিন খেয়াল করলেন, আজহারের কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। পিয়ন পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলেন, চিরদিনের মতো নিঃশব্দ হয়ে গেছেন ডা. আজহার। তাঁকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলেছে আলবদর বাহিনী।
তরুণ ছাত্র সিরাজকে নিয়েও ডা. শামসুদ্দিনের ভয় ছিল। রাতে তাকে ওই টিনশেডে থাকতে নিষেধও করেছিলেন। অকুতোভয় সেই তরুণ বলেছিল, ‘কিছু হবে না।’
আলবদরেরা তাকেও রেহাই দেয়নি।
বাঙালি–অবাঙালি বৈরিতার সেই সময়েও ঢাকা মেডিকেলের বাঙালি চিকিৎসকদের নানাভাবে সাহায্য করতেন একজন অবাঙালি চিকিৎসক। তিনি ডা. নবী আলম খান। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের রেজিস্ট্রার। অবাঙালি রোগীদের নিয়ে যেকোনো সমস্যায় বাঙালি চিকিৎসকদের পাশে থাকতেন তিনি। পরে এই চিকিৎসকও অধ্যাপক হন।
অক্টোবর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বনানীতে সেনাবাহিনীর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। জরুরি বিভাগে আসে বিশেষ ফোন।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁর অপারেশন করা হয়। চারজন সার্জনসহ চিকিৎসক দলের সেই চেষ্টা অবশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে মারা যান তিনি। এ রকম একটা মানুষকে এভাবে সেরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় পরে তাঁদের সমালোচনাও হয়েছে। তবে ডা. শামসুদ্দিন মনে করেন, চিকিৎসকদের কাছে রোগীর একটাই পরিচয়—রোগী। যুগ যুগ ধরে এভাবেই রোগীদের সেবা দিয়ে এসেছে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকেরা, তা সেই রোগীর ব্যক্তিগত পরিচয় যা-ই হোক না কেন।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছে এই প্রতিষ্ঠান। তাই দেরিতে হলেও প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ায় দারুণ খুশি সেই সময়ের সাক্ষী ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ।