জেন–জি বা জেনারেশন জেডদের সবকিছুতেই নাকি থাকে নিজস্বতার ছোঁয়া। পোশাক থেকে হেয়ারস্টাইল, সাজগোজ—সবকিছুতেই তারা চায় নিজের মতো কিছু করতে। বাদ যায় না বিয়েবাড়িও। বিয়েবাড়িতে জেন–জিদের সাজ নিয়ে লিখেছেন বিপাশা রায়
এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। এই সময়ে বিয়েবাড়িতে যাদের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ে, তারা হলো এই জেন–জি প্রজন্ম। আরামদায়ক পোশাক তো চাই, এ ছাড়া যেন ফ্যাশনও বাদ না যায়, সেদিকে থাকে তাদের বিশেষ খেয়াল, অনেক সময় দেখা যায় সাজপোশাক দিয়েই পুরো বিয়েবাড়ি মাতিয়ে রাখে তারা।
ফ্যাশন হাউস বাটারফ্লাই বাই সাগুফতার স্বত্বাধিকারী সাগুফতা ওসমান বলছিলেন, এই প্রজন্ম সাধারণ সময়ে পোশাকে ফিউশন পছন্দ করলেও বিয়েবাড়িতে নাকি জমকালো ট্র্যাডিশনাল পোশাকেই নিজেকে দেখতে ভালোবাসে। ২০১০ সালে টিনএজদের ফ্যাশনের যে ধারা জনপ্রিয় হয়েছিল, সেই ধারাই দেখা যাচ্ছে ২০২৫–এ জেন–জিদের ফ্যাশনে। শর্ট কামিজে সিকোয়েন্সের হালকা কাজের পোশাক এই প্রজন্মের মেয়েদের বেশি পছন্দ। শাড়ি পরছেন, তবে তাতেও থাকছে ফিউশন। জাম্পস্যুট, লেহেঙ্গা, শারারার মতো পোশাকগুলো তাঁদের কাছে সব সময় সব পরিস্থিতিতেই প্রিয়।
এ বছর বিয়ের মৌসুম উপলক্ষে জেন–জিদের পোশাকের নকশা করার সুযোগ পেয়েছেন ভায়োলা বাই ফারিহার স্বত্বাধিকারী ফারিহা তাশমীন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, এটা তাঁর কাছেও মনে হয়েছে যে এক্সপেরিমেন্টাল পোশাক পরতে ভালোবাসলেও বিয়ের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোয় তাঁরা একটু ট্র্যাডিশনাল পোশাকের দিকেই ঝুঁকছেন।
তবে সেখানেও কথা থাকে। অনুষ্ঠানটা যদি নিজের পরিবারে অথবা কাছের কোনো মানুষের হয়, তখন তাঁদের পোশাক নির্বাচনটা একটু ট্র্যাডিশনালই হয়। আবার যদি দূরের কারও বিয়েতে তাঁরা অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পান, তখন ফিউশন আর আরামের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই পোশাক নির্বাচন করে থাকছেন। কাফতান–জাম্পস্যুট যেমন জনপ্রিয় আউটফিট জেন–জিদের কাছে, শাড়ি বা ট্র্যাডিশনাল লেহেঙ্গার কদরও কিন্তু তাঁদের কাছে কমেনি।
রেডিমেড শাড়ি এই সময়ে বেশ জনপ্রিয় এক পোশাক। এতে শাড়ি পরার কোনো ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয় না। এ বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই ফ্যাশন হাউস শাড়ির নকশা করছে। বিভিন্ন ধরনের অর্নামেন্টাল কাজ যুক্ত হচ্ছে শাড়ির ক্যানভাসে। শাড়িকে স্টাইলিশভাবে উপস্থাপন করতে অনেকেই ব্লাউজের পরিবর্তে টপস বেছে নিচ্ছেন। কোমরে ব্যবহার করছেন বেল্ট।
এখনকার ডিজাইনারদের ধারণা, জেন–জিদের মধ্যে ২০১০ সালের ফ্যাশনধারা ফিরে আসছে বা আসবে। তাঁদের মধ্যে শর্ট কামিজ পরার প্রবণতা বাড়ছে। এখন পর্যন্ত চুমকি বা জারদৌসি কাজের শর্ট কামিজের নকশাই বেশি দেখা যাচ্ছে। রঙের ক্ষেত্রে সাদার প্রাধান্য বেশি। একরঙা কাপড়ে হালকা ফুলেল নকশাই বেশি টানছে তাঁদের।
অন্য সময়ে এমন আরামদায়ক পোশাকেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন জেন–জিরা। হালকা রঙের প্রতি এখানেও তাঁদের আকর্ষণ। মসলিন বা ক্রপ কাপড়ের টপ দেখা যাচ্ছে ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এর সঙ্গে কখনো প্যান্ট বা স্ট্রেট কাট সালোয়ার আবার পালাজ্জো বেছেন নিচ্ছেন তরুণীরা। এই ধরনের পোশাকে স্টাইল স্টেটমেন্ট সহজেই ভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায়।
যখন বিয়েবাড়িতে দূরের অতিথি হিসেবে জেন–জিরা আমন্ত্রিত হন, তখন এ ধরনের ক্যাজুয়াল পোশাকই বেছে নেন তাঁরা। ক্লাব হাউসের ডিজাইনাররা বলেন, জাম্পস্যুট নাকি জেন–জিদের পছন্দের শীর্ষে থাকা পোশাক। যেহেতু বিয়ের আয়োজনগুলো আমাদের দেশে শীতকালেই হয়ে থাকে, তাই ভেলভেটের জাম্পস্যুটের চাহিদা একটু বেশি থাকে। ক্রপ কাপড়ের জাম্পস্যুটও এখন চলছে বেশ। তাতে থাকছে জরির সুতার এমব্রয়ডারি।
যদি কনে বা বর খুব আপনজন হন, তখন জেন–জি তরুণীটি বেছে নেন জমকালো পোশাক। সে ক্ষেত্রে লেহেঙ্গা থাকে তাঁদের প্রথম পছন্দ। মসলিন বা অরগাঞ্জা কাপড়ের পুরো সিকোয়েন্সের ট্র্যাডিশনাল লেহেঙ্গাই তাঁদের বেছে নিতে দেখা যায়। দিনের আয়োজনে হালকা রঙের পোশাকই প্রাধান্য পায়। রাতের নিমন্ত্রণেও হালকা রং প্রাধান্য পায়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম তো হয়েই থাকে।
এখনকার তামা, মেটাল বা রুপার গয়নাই বেশি পরতে দেখা যায় জেন–জিদের। সোনার গয়নার প্রতি তাঁদের আগ্রহটা কম। তবে সাজের উপস্থাপনায় থাকে নতুনত্ব। একসঙ্গে অনেক গয়না পরে জবুথবু থাকা নয়, বড় বিশেষ একটি গয়নাকে বেছে নিতে দেখা যায় তাঁদের। হয়তো কানে বড় নকশার দুল বেছে নিচ্ছেন আবার কখনো হাতে পরছেন বড় নকশার মানতাসা। গলায় চোকার যেন এই বয়সীদের বিশেষ পছন্দের গয়না। পোশাকটা পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাক হলে একটু জাংক গয়না বেছে নিতে পারেন। ছোট ছোট নকশার আংটি এই বয়সীদের কাছে বিশেষ প্রিয়।
মেকআপে মিনিমালিজম ধারাকেই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ভালোবাসেন আইলাইনারের ব্যবহার। হালকা ব্লাশন, নুড লিপস্টিকেই যেন সম্পূর্ণ হয় তাঁদের সাজ।
কখনো একটু ফ্যান্সি আবার কখনো স্ট্রেটকাট খোলা চুল—দুটোই পছন্দ এই বয়সীদের। কানে থাকে ফিউশন। পনিটেইলও যেন বাজিমাত করে তাঁদের। চুলে বিভিন্ন অর্নামেন্টের ব্যবহার করে থাকে। পার্ল বা মুক্তা দিয়ে চুলে সাজানো তাঁদের বিশেষ পছন্দ। কখনো খোলা চুলে ব্যান্ডের ব্যবহার করতে দেখা যায় তাঁদের।
নিজেকে একটু ব্যতিক্রমভাবে প্রকাশ করাটা যেন এই বয়সের একটা ধর্ম। তবে তাতেও নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া থাকে। মুখে ফেস পেইন্টিং করতে ভালোবাসেন তাঁরা। মুখ সাজাতেও বেছে নেন বিভিন্ন রকমের স্টোন বা মুক্তা। তবে ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সাজলেই হবে না, অনুষ্ঠানের আবহ ও আবহাওয়া বুঝে সাজে চোখের আরামের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।