ঈদের যে আমেজ, সেটা বোঝা যাচ্ছে দরজিবাড়ির বাইরে আর ভেতরের ব্যস্ততায়। ঈদের পোশাক বানানোর ফরমাশ এখন এক মাস আগে থেকেই চলে আসে। বিভিন্ন এলাকার দরজিবাড়ি ঘুরে দেখা গেল, কোথাও ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক, কোথাও আবার প্যানেলওয়ালা সিল্ক বা সিনথেটিক কামিজ বানাচ্ছেন দরজিরা। এলাকাভেদে শুধু পোশাকের নকশায় নয়, দামেও আছে ভিন্নতা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দরজিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এবারের ঈদের নতুন ডিজাইন, চলতি ধারা, কাপড় ও সেলাই খরচের হালচাল।
গাউছিয়ার মৌসুমি লেডিস টেইলার্সের দরজি রেজওয়ান হোসেন বলেন, ‘যে যার পছন্দমতো কামিজ বানাতে দেয়। তবে আজকাল ঢিলেঢালা কামিজ বানাচ্ছেন অনেকে।
পালাজ্জো আর ঢোলা হাতা দিয়ে অনেকে বানাচ্ছেন কো-অর্ড সেট’ গাউছিয়াতে সুতির সালোয়ার-কামিজ বানাতে খরচ হবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, আর ইনারসহ কামিজ বানাতে দাম পড়বে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।
হাফহাতা ও হাতাকাটা ব্লাউজ বানাতে দেখা গেল গাউছিয়ায়। পানপাতা, হাইনেক ও ভি-নেকের দেখা মিলছে ব্লাউজের গলায়। গাউছিয়াতে ব্লাউজের মজুরি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
সেলাই ছাড়া থ্রি-পিসের কাপড় কিনে ‘ক্যাটালগ’-এর মতো ডিজাইন দেখিয়ে পোশাক বানানোর তাড়াহুড়া দেখা যায় ধানমন্ডি এলাকায়। ধানমন্ডির প্লাজা এআরের একটি দরজিবাড়িতে পোশাক সেলাই করতে দিয়েছেন রুম্পা আহমেদ।
তিনি জানালেন, ঈদের সময় এগিয়ে এলে দরজির দোকানগুলোয় এখন আর জামা বানাতে চায় না, মজুরিও বেড়ে যায়। তাই আগে আগেই ঈদের জামা বানাতে দিয়েছেন। তিনি লম্বা কাটের কামিজের সঙ্গে বানাতে দিয়েছেন সোজা কাটের প্যান্ট।
শুভ লেডিস টেইলার্সের টেইলর মাস্টার সেলিম শহীদ বলেন, কামিজে বেশি চলছে লম্বা কাট আর বেলবটম হাতা। তরুণীরা কামিজের সঙ্গে পরার জন্য পালাজ্জো আর সোজা কাটের প্যান্ট বানাতে দিচ্ছেন বেশি।
ব্লাউজের ক্ষেত্রে শাড়ির সঙ্গে থাকা ব্লাউজ পিস দিয়ে ব্লাউজ বানাচ্ছেন। ধানমন্ডি এলাকায় সুতির সালোয়ার-কামিজ বানাতে খরচ পড়ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।
কামিজে ইনার লাগাতে হলে গুনতে হবে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ব্লাউজ বানাতে লাগবে ৭০০ টাকা। ব্লাউজে ইনার ব্যবহার করতে হলে ইনারসহ মজুরি পড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
এবার ঈদে সারারা ও গারারা স্টাইলের প্যান্ট সঙ্গে খাটো কুর্তার পোশাকের চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে জানান গুলশান পিংক সিটির লেভেল-৪-এ অবস্থিত ব্রাইট স্টাইল টেইলার্স অ্যান্ড ফেব্রিকসের স্বত্বাধিকারী আলমগীর হোসেন।
সারারা মূলত কোমর থেকে ঢিলেঢালা, ছড়ানো প্যান্ট, যা হাঁটার সময় কুঁচির মতো ডিজাইন তৈরি করে।
অন্যদিকে গারারা হাঁটুর কাছ থেকে আলাদা করে জোড়া দেওয়া ঘেরওয়ালা পায়জামা। লম্বা ও ঢিলেঢালা হাতার কামিজ, প্যানেলযুক্ত ডিজাইনের নকশা প্রাধান্য পাচ্ছে।
ভারতীয় বুটিকের সেলাই ছাড়া জামাও কিনে বানাতে দিচ্ছেন অনেকে। চুড়িদার বা আঁটসাঁট সালোয়ার আজকাল আর দেখা যায় না। গুলশানের দরজিবাড়িতে সাধারণ সুতি থ্রি-পিস সেলাইয়ের খরচ শুরু ১০০০ টাকা থেকে, জামার ডিজাইন ও প্যানেল বাড়লে তা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্তও হতে পারে।
পিংক সিটির লেভেল-২-এর পিংক লেডি বুটিক অ্যান্ড টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী হাশিদুল ইসলামও জানান, পাকিস্তানি হালকা এমব্রয়ডারিযুক্ত সুতির ড্রেসের চাহিদাই বেশি। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী গজ কাপড় দিয়ে কাস্টমাইজড ড্রেসও বানান তাঁরা।
আজকাল রঙের ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে হালকা রঙের প্যাস্টেল শেডগুলো। সাধারণ সুতি কামিজ ও সালোয়ার বানাতে এখানে খরচ হয় ১ হাজার টাকা। জামার পাশে অন্য রঙের কাপড়ের বর্ডার দিলে বা কাজ থাকলে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
জমকালো পোশাকের ক্ষেত্রে পোশাক বানানোর মজুরি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু, আর প্যানেল সেলাইয়ের খরচ ডিজাইনভেদে ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
বনানীর দরজিবাড়িগুলোয় এখন পাকিস্তানি ক্যাটালগ ড্রেস ও ভারতীয় সেলাই ছাড়া পোশাকের চাহিদা বেশি বলে জানান বনানী টেইলার্স অ্যান্ড ফেব্রিকসের স্বত্বাধিকারী সুব্রত দত্ত।
তিনি বলেন, ঈদে গজ কাপড় কিনে জামা বানাতে খুব একটা দেখা যায় না। নতুন চলতি ধারা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ‘ফারসি সালোয়ার’, যা অনেকটা ঢিলেঢালা ও নিচের দিকটা ছড়ানো কাটের পায়জামা। সঙ্গে ছোট কামিজের সংমিশ্রণও বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া বেলবটম প্যান্ট ও ডিভাইডার স্টাইলও দেখা যাচ্ছে। এখন যেহেতু গরমের সময়, তাই আরামদায়ক লন ও সুতি কাপড়ের কদর বেশি।
ভারতীয় পোশাকের ক্ষেত্রে সিল্ক ও সিনথেটিক কাপড়ও দেখা যাচ্ছে। বনানীতে সুতির পোশাক সেলাইয়ের খরচ শুরু ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে। প্যানেল ও বেশি ডিজাইন থাকলে তা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্তও হতে পারে।
উত্তরার সেক্টর ৬-এ অবস্থিত চাহিদা বুটিক অ্যান্ড টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ রাকিব জানান, এবারের ঈদে বেশি দেখা যাচ্ছে সুতির পোশাক। বাংলাদেশি বুটিক ড্রেস, পাকিস্তানি ও ভারতীয়—সব ধরনের পোশাকের চাহিদা আছে।
তবে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত পছন্দেও রয়েছে ভিন্নতা। কথা হলো নাফিসা নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। ঈদের জামা বানাতে এসে জানান, তিনি বাংলাদেশি বুটিকের জামাগুলোকেই বেশি পছন্দ করেন। বর্তমানে সাদামাটা ডিজাইন ও হালকা রঙের পোশাক আছে চলতি ধারায়। সালোয়ার-কামিজের পাশাপাশি ব্লাউজ তৈরির ফরমাশ আসছে। সুতি সালোয়ার-কামিজ বানানোর খরচ শুরু ৮০০ টাকা থেকে।
ডিজাইন ও কাজ বাড়লে তা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ঈদের ব্যস্ততার কথা মাথায় রেখে তিনি জানান, এখন জামা বানানোর ফরমাশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হাতে কয়েক দিন অতিরিক্ত সময় রাখা ভালো।
মিরপুরের দরজিবাড়ি ঘুরে দেখা গেল, লম্বা কাটের পাশাপাশি চলছে বড় ঘেরের ছোট বা খাটো কামিজ। তরুণীরা তাঁদের পছন্দসই হাতা দিচ্ছেন কামিজে। সবচেয়ে বেশি চলছে কুঁচি ও ঝালর দেওয়া লম্বা হাতা।
খাটো কামিজের সঙ্গে ফারসি সালোয়ার ও পালাজ্জো পছন্দ করছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার শুধু খাটো কামিজ বানিয়ে সেটা পরছেন জিনস বা গ্যাবার্ডিন প্যান্টের সঙ্গে।
মিরপুর-১৪-তে অবস্থিত সুলতান ফ্যাশন টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী সুলতান আহমেদ বলেন, সুতির থ্রি-পিস বানাতে খরচ হবে ৩৫০ টাকা। থ্রি-পিসে ইনার যোগ করতে হলে গুনতে হবে ৬০০ টাকা। অনেকে শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে একরঙা ব্লাউজ বানাতে দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
গোল গলার ব্লাউজ আর থ্রি কোয়ার্টার হাতা চলছে বেশি। কেউ কেউ বানাচ্ছেন কোমর পর্যন্ত লম্বা ব্লাউজ। মিরপুরে ব্লাউজের মজুরি পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।