টাঙ্গাইল শাড়ির বৈশিষ্ট্যগুলো জানেন কি

কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্যই টাঙ্গাইলে তৈরি শাড়িগুলো যেন ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসে। সহজেই পরা যায় যেকোনো উৎসবে। পাশাপাশি স্টাইল ও আরাম দুটোই পাওয়া যায় এই শাড়িতে।

ব্লক প্রিন্ট, হ্যান্ডস্টিচ, কড়ির কাজ—টাঙ্গাইলের থান শাড়ির ওপর
টাঙ্গাইল শাড়ি

নতুন প্রজন্ম তাঁতে বসছে না। তাহলে আর কয়েক বছর পর কি পাওয়া যাবে না তাঁতে বোনা শাড়ির হদিস? টাঙ্গাইলের শাড়ি নিয়ে কথা বলতে গেলে শাড়ি বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে এমন আশঙ্কার কথা প্রায়ই শোনা যায়।

অথচ টাঙ্গাইলে এখনো নানা ধরনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। সুতি, সিল্ক, সিনথেটিক—নানা ধরনের কাপড়ে হচ্ছে নানা রকমের কাজ।

দেশীয় উৎসব কিংবা বিয়ের আয়োজন—সব ক্ষেত্রেই টাঙ্গাইলের তাঁতে বোনা শাড়ির আবেদন আলাদা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে এই শাড়ি।

২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের নয়াদিল্লির লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ইউনেসকোর ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’তে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় টাঙ্গাইল শাড়ির বয়নশিল্প।

বাংলাদেশের ষষ্ঠ অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প জায়গা করে নেয় ইউনেসকোর তালিকায়। এর আগে ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।

দেশের বাইরে যে শাড়ির এমন জয়জয়কার, দেশের উৎসব-আয়োজনেও তার উপস্থিতি থাকবে না, তা কি হয়?

টাঙ্গাইল শাড়িতে নকশি কাজ। শাড়ি পরার ঢংয়ে আধুনিকতা

ঈদ, পূজা, বিয়ে, বৈশাখে কিংবা অন্য যেকোনো উৎসব—বাঙালির নানা আয়োজনে টাঙ্গাইলের শাড়ির কদর এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। সময়ের সঙ্গে নকশা ও বুননে পরিবর্তন এলেও নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে এই শাড়ি।

টাঙ্গাইল শাড়িতে আগে বুটির কাজ দেখা যেত বেশি। তখন জ্যাকার্ডে বোনা শাড়ির পরিমাণ ছিল কম। পাড় ছিল ছোট, আঁচলও তেমন ছিল না। মিরপুরের তাঁতিদের সহায়তা নিয়ে শাড়িতে আঁচল বসানো শুরু করেন টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী মুনিরা এমদাদ।

‘নকশা’র ফটোশুটের জন্য শাড়ি নেওয়ার সময় দেখাচ্ছিলেন টাঙ্গাইলে তৈরি নানা ধরনের শাড়িগুলো। তিনি জানালেন, শাড়ি বা পোশাকে শিবোরি, টাই–ডাই, ব্লক প্রিন্ট, এমব্রয়ডারিসহ অনেক ধরনের কাজ করাচ্ছেন।

কিন্তু কাপড়টি বুনিয়েছেন টাঙ্গাইল থেকে। টাঙ্গাইলে বোনা কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে নানা ধরনের পোশাক আর স্কার্ফ। হাতে বোনা বুটি শাড়ির দাম একটু বেশি। কিন্তু এই শাড়িগুলো যেন বনেদি আভিজাত্যের প্রকাশ।

মেশিনে শাড়ি বোনা হলে দাম কমে আসে অনেকটাই। নকশা আর বুননের ভিন্নতা অনুযায়ী শাড়ির পাড়গুলোর নামও কিন্তু আলাদা—পাতি পাড়, চুড়ি পাড়, ঘষা পাড়।

শাড়ির বৈশিষ্ট্য কী

ঢাকার ছোট-বড় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে দেখলেই আলাদা করে চেনা যায় টাঙ্গাইলের শাড়ি

ঢাকার ছোট-বড় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে দেখলেই আলাদা করে চেনা যায় টাঙ্গাইলের শাড়ি। কিছু বৈশিষ্ট্যই শাড়িগুলোকে যেন আলাদা করে ফেলে।

আমাদের আবহাওয়া, নদী, গ্রামের গাছের গল্পই তুলে ধরে টাঙ্গাইল শাড়ি। আমাদের অন্য পোশাকে অতটা ভালো লাগে না, যতটা তাঁতের শাড়িতে মানায়, এটা আমার কাছে মনে হয়। টাঙ্গাইলের শাড়ি কম দামেও পাবেন, বেশি দামেও পাবেন। সুন্দর একটা ব্লাউজ দিয়ে একটু গুছিয়ে পরলে সাজে আভিজাত্য চলে আসে।
মুনিরা এমদাদ, স্বত্বাধিকারী, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির

এটা ঠিক টাঙ্গাইলের শাড়ি, শুনলে অনেকে মনে করেন উৎসবে পরার উপযোগী নয়। আটপৌরে সাদামাটা হয়ে যায় নকশা। শাড়িটি কীভাবে পরছেন, স্টাইল করেছেন কীভাবে, সেটার ওপর কিন্তু নির্ভর করে অনেক কিছু।

টাঙ্গাইলের শাড়ির যে সহজাত সৌন্দর্য, সেটাও কিন্তু সুন্দর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রং-নকশায় পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগ্রহের দিকে তাকালেও সেটা বোঝা যায়। আদি শাড়িতেও চলে এসেছে আধুনিক রূপ।

খুঁতের স্বত্বাধিকারী এবং ডিজাইনার ফারহানা হামিদ ও ঊর্মিলা শুক্লা জানান, বাংলাদেশের একেক জায়গায় একেক রকম শাড়ি বোনা হয়। সুতাতেও দেখা যায় ভিন্নতা। টাঙ্গাইলের শাড়িগুলোয় অনেক মিহি বুনন থাকে। আরাম লাগে পরতে।

শাড়িটি কীভাবে পরছেন, স্টাইল করেছেন কীভাবে, সেটার ওপর কিন্তু নির্ভর করে অনেক কিছু

দ্বিতীয়ত, শাড়িগুলো মজবুতও হয় বেশি। টাঙ্গাইল শাড়ির আরেকটি বিশেষত্ব পাড়ের নকশা এবং জমিনের ভেতরে থাকা বুটি। ওই বুটির জন্যই টাঙ্গাইলের শাড়ি যেন বিশেষ।

টাঙ্গাইলের শাড়িতে তাঁতে বোনা পাড় যেমন আছে, তেমনি থান শাড়িও আছে। এ ধরনের শাড়ির টেক্সচার হয় খুবই মসৃণ। ব্লক প্রিন্ট, টাই–ডাই, শিবরি—নানা ধরনের কাজ দেখা যায় এ ধরনের শাড়ির ওপর।

খুঁতে মূলত ব্লক প্রিন্ট, হ্যান্ডস্টিচ—এ ধরনের কাজ করা হয় টাঙ্গাইলের থান শাড়ির ওপর। এই শাড়িগুলোই বেশি কেনেন ক্রেতারা। ধোয়ার পরও টাঙ্গাইল শাড়ি হাতে-বহরে কমে না। বর্তমানে ব্লাউজ পিসসহ এই শাড়ির দৈর্ঘ্য ১৪ হাত।

নানা ধরনের তাঁতের শাড়ি

টাঙ্গাইলে বোনা সিল্কের শাড়িতে চেকের নকশা

তিন ধরনের তাঁতে তৈরি হয় টাঙ্গাইলের শাড়ি—

  • হাতে চালানো গর্ত তাঁত (পিটলুম)

  • আধা স্বয়ংক্রিয় (চিত্তরঞ্জন তাঁত)

  • বিদ্যুৎ-চালিত তাঁত (পাওয়ার লুম)

এ কারণে শাড়ির উপকরণেও চলে এসেছে বৈচিত্র্য। টাঙ্গাইল শাড়ি বলতে সুতি শাড়িকেই যে বোঝানো হতো, সেই ধারণা এখন পুরোনো।

টাঙ্গাইলে সুতি শাড়ির পাশাপাশি মার্সেরাইজড সুতি, হাফ সিল্ক, সিল্ক, অ্যান্ডি, সিনথেটিক শাড়িও বোনা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের শাড়িতে মূলত ৬০ কাউন্ট, ৮০ কাউন্ট এবং ৮০ বাই ৮০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বেশির ভাগ শাড়ি ৮০ বাই ১০০, ৮০ বাই ৮০ অথবা ৬০ বাই ৮০ কাউন্টের।

টাঙ্গাইলে ৫০০ টাকার শাড়িও যেমন পাওয়া যায়, আবার ৫০ হাজার টাকার শাড়িও পাওয়া যায়।