জামালপুরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথায় খুঁজে পাওয়া যায় আরাম ও মমতা
জামালপুরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথায় খুঁজে পাওয়া যায় আরাম ও মমতা

জামালপুরের নকশিকাঁথাকে অনন্য বলার কারণ কী

গ্রামীণ নারীদের হাতে সেলাই করা নকশিকাঁথা বিক্রি হয় ঢাকার ছোট-বড় বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায় জামালপুরের তৈরি নকশিকাঁথা। গায়ে দেওয়া কাঁথার পাশাপাশি নানা ধরনের পোশাক, কুশন কাভার, মানিব্যাগ, চশমার খাপ, ব্যাগে তোলা হচ্ছে নকশির নকশা।

হুট করেই কমে গেছে শহরের শীত। আর কয়েক দিন পরই তুলে রাখা হবে লেপ-কম্বল। হালকা ঠান্ডার এই সময়টায় তখন কাঁথায় মিলবে আরাম। আর সেটা যদি হয় একটা নকশিকাঁথা, তাহলে গ্রামীণ দৃশ্য কিংবা ফুল-পাতার নকশায় নয়নও জুড়াবে। কিন্তু শহুরে ব্যস্ত জীবনে একটা নকশিকাঁথার শখ থাকলেও বোনার সময় কই? কিনে নেওয়াটাই যেন সহজ সমাধান। জামালপুরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথায় খুঁজে পাওয়া যায় আরাম ও মমতা। কাঁথার পাশাপাশি পোশাকের ওপরও দেখা যাচ্ছে নকশির নকশা।

জামালপুরের নকশিকাঁথাকে অনন্য বলার কারণ আছে

‘জামালপুর জেলার মেয়েরা সুই-সুতার কাজ ভালো করে। তাই জামালপুরের নকশিকাঁথা অনন্য। অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে জামালপুরের নকশিকাঁথা নান্দনিক।’ এভাবেই নিজের এলাকার নকশিকাঁথার গুণগান করলেন জামালপুরের নকশিকাঁথার উদ্যোগ দীপ্ত কুটিরের স্বত্বাধিকারী দেলোয়ারা বেগম। এ জেলার নকশিকাঁথাকে অনন্য বলার নানা কারণ আছে। জেলার সব উপজেলাতেই তৈরি হয় নকশিকাঁথা। জেলা প্রশাসন জামালপুর জেলার ব্র্যান্ডিং করেছে নকশিকাঁথা দিয়ে। এমনকি জামালপুরের নকশিকাঁথা ইউনেসকোর জিআই পণ্য স্বীকৃতিও পেয়েছে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

জামালপুরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভরাট নকশা

১৯৯৬ সালে টুকটাক নকশিকাঁথা নিয়ে কাজ শুরু করেন শাহিনূর রহমান। এখন তাঁর উদ্যোগ যথেষ্টই বড়। প্রতিষ্ঠান আছে দুটি। শতদল ও কারুকলা। তিনি বলেন, ‘এখন জেলায় উদ্যোক্তা আছেন দুই হাজারের বেশি। দোকান আছে ২০০টির মতো। জামালপুরে নকশিকাঁথা তৈরির ঐতিহ্য ১০০-১৫০ বছরের পুরোনো। তখন পুরো ব্যাপারটাই ছিল শৌখিন। ব্যবসা হিসেবে নকশিকাঁথা আছে, তা-ও ৫০ বছরের মতো।’

আড়ংয়ের জন্য প্রথমে নকশিকাঁথা তৈরি করে ব্র্যাকের আয়েশা-আবেদ ফাউন্ডেশন। তারা নিজেদের অফিসে নারীদের দিয়ে কাঁথা তৈরি করায়। অন্যরা একেক এলাকায় দলনেতা বানিয়ে কর্মীদের দিয়ে তৈরি করান, যাতে গ্রামীণ নারীরা নিজের বাসাতেই কাজটা করতে পারেন। এসএমই ফাউন্ডেশন জামালপুরে নকশিকাঁথা ক্লাস্টার করেছে। বিভিন্ন উপজেলায় দলনেতা আছে। জামালপুরের সদর, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় এবং নান্দিনা, নরুন্দি, ভাটারা, বেলটিয়া এলাকায় বেশি নকশিকাঁথার কাজ হয়।

গাউনের ওপর করা হয়েছে নকশিকাঁথার নকশা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নকশিকাঁথায়ও পরিবর্তন এসেছে। পণ্যের ধরন পাল্টেছে। শাহিনূর রহমান বললেন, ‘নকশিকাঁথা তো আছেই, এর সঙ্গে এখন বেডশিট, কুশন, ছেলে ও মেয়েদের পাঞ্জাবি, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, গায়ে পরার চাদর, ওয়ালম্যাট, সালোয়ার-কামিজ, বালিশের কাভার ইত্যাদি নানা কিছু তৈরি হয়। এখন ছিমছাম নকশা হয়। জামালপুরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভরাট নকশা। তবে এখন অনেকটা জায়গাজুড়ে কাজ কম করা হচ্ছে।’

‘আসলে বাজারচাহিদার ওপর আমাদের কাজের ধরন ও পণ্য বদলায়। তবে মূল যে নকশিকাঁথা, তা ঠিক থাকে। অন্যান্য পণ্যে আসল নকশিকাঁথার মোটিফই ব্যবহার করা হয়।’ জানালেন দেলোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা হালকা ও ভারী দুই ধরনের কাজই করি। মাত্র ৫ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে ২০০১ সালে শুরু করা উদ্যোগ এখন বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ পেয়েছে। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নকশা বদলায়। এখন যেমন নকশায় মানুষ, প্রাণীর সংখ্যা একেবারেই কম। আমরা তাই ফুল, লতাপাতা, আলপনার নকশা বেশি করি।’

জামালপুরের নকশায় ফুল, লতাপাতা, আলপনার নকশা বেশি দেখা যাচ্ছে এখন

জামালপুরের নকশিকাঁথার বেশির ভাগ দোকানই উদ্যোক্তার বাড়িতে। বাসাবাড়ি, সামনের অংশটাতে শোরুম করে ব্যবসা করে। কর্মীরা পুরো জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। নিজ বাড়িতেই তাঁরা সুই-সুতায় গেঁথে যাচ্ছেন নকশিকাঁথার মাঠ।