বান্দরবানের তরুণ শিক্ষক উথোয়াইয়ই মারমা
বান্দরবানের তরুণ শিক্ষক উথোয়াইয়ই মারমা

ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন এই তরুণ

বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন সমাজসেবী উথোয়াইয়ই মারমার গল্প।

শুধু ‘দুর্গম’ শব্দটি দিয়ে মেনরতপাড়ার দুর্গমতাকে ঠিক বোঝানো সম্ভব নয়। বান্দরবানের আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নের এই ম্রো পাড়ায় যেতে চাইলে আলীকদম পানবাজার থেকে নদীপথে ইঞ্জিন নৌকায় চার ঘণ্টা ভ্রমণ করে প্রথমে যেতে হবে দোছড়ি বাজারে। সেখান থেকে হাঁটা শুরু। পাহাড়ি পথে পার হতে হবে ‘রুংরাং’ নামের উঁচু পাহাড় আর অনেক ঝিরিঝরনা। পাহাড়ি বনের পথে এভাবে আট ঘণ্টা চলার পর মেনরত পাড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।

গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই পাড়াতেই গিয়েছিলেন উথোয়াইয়ই মারমা। তারপর কী হলো, তাঁর জবানিতেই শুনুন, ‘১১ ঘণ্টা পরিশ্রমের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল, যখন দেখলাম পাড়ার সামনে প্লুং (ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশি) বাজিয়ে আমাদের স্বাগত জানাতে এসেছেন ম্রো জনগোষ্ঠীর লোকজন। প্লুংয়ের তালে তালে আমাকে ঘিরে তাঁরা নাচলেন। আমাকেও নাচতে বাধ্য করলেন। বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এমন ভালোবাসা পেয়ে এত দূর হেঁটে আসার কষ্টের কথা আর মনেও নেই।’

পাহাড়ের বাসিন্দা হলেও উথোয়াইয়ই ম্রো নন, তিনি মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ; তবু যখনই কোনো ম্রো পাড়ায় যান, এমন ভালোবাসাই পান উথোয়াইয়ই। এমন উচ্ছ্বাসভরে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার কারণ, ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি স্কুল ও একটি হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেছেন এই উদ্যমী তরুণ।

শুরুটা ২০১৬ সালে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে উথোয়াইয়ই মারমা তখন লামা চেয়ারম্যান পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি বাবার কিনে দেওয়া ক্যামেরা দিয়ে দুর্গম পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে ছবি তোলেন। ছবি তুলতে গিয়েই চংকত কারবারি পাড়ায় শাহরিয়ার পারভেজের সঙ্গে পরিচয়। বর্তমানে ঢাকার একটি ক্রিয়েটিভ এজেন্সির জ্যেষ্ঠ কপিরাইটার শাহরিয়ার তখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো তরুণটি অনগ্রসর ম্রো শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে চান। তাঁর পরিকল্পনা শুনে নিজেকেও এ স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন উথোয়াইয়ই। পাড়ার কারবারি চংকতের বাড়িতেই চার-পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম ‘পাওমুম থারক্লা’। ম্রো ভাষায় কথাটার অর্থ ‘কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটানো’।

এক দশকে পাওমুম থারক্লা বড় হয়েছে। আড়াই হাজার বর্গফুটের স্কুলটিতে বর্তমানে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে ৭৮ শিশু। তাদের মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৮। স্কুলটি পরিচালনার জন্য আছেন চারজন শিক্ষক, একজন বাবুর্চি। পাড়াবাসীর সহায়তা, ক্রাউড ফান্ডিং আর নানাজনের ব্যক্তিগত অর্থে স্কুলটি চলছে। সৌরবিদ্যুতে চলে পাখা, জ্বলে বাতি। আবাসিক শিশুদের জন্য আছে দুই বেলার খাবার আর সুপেয় পানির ব্যবস্থা। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও স্কুলটি অনন্য। বুয়েটের স্থাপত্যবিদ সায়নসুর ও কৌশিক কুমারের নকশায় ২০২১ সালে তৈরি হয় পরিবেশবান্ধব দোতলা স্কুলঘর।

পাওমুম থারক্লার পর ২০২১ সালে লামার সরই ইউনিয়নে চেননৈ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০২২ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি দোছড়ি ইউনিয়নে রেংয়নপাড়া আশা-হোফনং বিদ্যালয়, ২০২৪ সালে লামা সদর ইউনিয়নে পোপা বদলা আশা-হোফনং আনন্দময়ী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন উথোয়াইয়ই মারমা। সব কটি বিদ্যালয়ই ম্রো শিশুদের জন্য গড়ে তোলা। প্রথমবারের মতো বিদ্যালয়ে যাচ্ছে এসব এলাকার ম্রো শিশুরা। বিশেষ করে পোপা বদলা আশা-হোফনং আনন্দময়ী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে ওই এলাকায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না।

উথোয়াইয়ই মারমা

স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো সাহায্য সংস্থা কিংবা সরকারের কাছে হাত পাতেননি উথোয়াইয়ই মারমা। রেংয়নপাড়া আশা-হোফনং ও পোপা বদলা আশা-হোফনং আনন্দময়ী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খরচ জুগিয়েছেন জার্মানিপ্রবাসী সৈয়দ সাকিল নামের এক ব্যক্তি। পাওমুম থারক্লার জন্য সোলার প্যানেলের খরচ জুগিয়েছে ‘আজিমুর রোকেয়া’ নামের একটি ট্রাস্ট।

উথোয়াইয়ই মারমার জন্ম বান্দরবানের লামা উপজেলার গাইন্দাপাড়ায়। গ্রামের পাশের বড় বম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে পড়েছেন তিনি। এরপর বাবা তাঁকে লামায় নিয়ে যান। তখন গজালিয়া থেকে লামায় যাওয়ার কোনো সড়ক ছিল না। হেঁটে হেঁটেই দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগত। সেখানে আবু তাহের মিয়া নামের এক বাঙালির বাড়িতে থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। বাঙালি পরিবারটিতে সন্তানের স্নেহ পেয়েছিলেন উথোয়াইয়ই। রাঙামাটির রাজস্থলীর একটি আশ্রমেও থেকেছেন। এভাবে তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে নানা অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হতে হতে লামা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর মাতামুহুরী কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করেন। ২০১২ সালে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়।

উথোয়াইয়ই মারমা বলেন, ‘শিক্ষকতা পেশায় আসার পেছনে আমার নিজের কষ্টটাই কাজ করেছে। ছোটবেলায় শিক্ষার জন্য নিজের গ্রাম, বন্ধু, পরিবার সব ছেড়ে থাকতে হয়েছে। আরেকটা বিষয়ও আমাকে ভাবিয়েছে—ভাষা। পাহাড়ি শিশুদের মাতৃভাষা তো বাংলা নয়। পিছিয়ে পড়া ম্রো শিশুরা ভাষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে। এ জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছি। তাই তাদের জন্য স্কুল করাটা জরুরি মনে করেছি।’

বিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি লামা উপজেলার ১১টি ম্রো পাড়ার জন্য পাঁচটি রিংওয়েল বসিয়েছেন উথোয়াইয়ই। কুরুকপাতা এলাকার ছাইপ্রা পাহাড়ে হুংনৈ ছাত্রাবাসে ২৪টি ম্রো শিশুর ঠাঁই হয়েছে। শিশুদের প্রিয় ‘দাদাভাই’ হিসেবে মাঝেমধ্যে সেখানে যান তিনি। আর গেলেই মেলে প্লুংয়ের সুরে অভ্যর্থনা।

ভালোবাসার সেই সুরে উথোয়াইয়ই মারমার মনে হয়, জীবনটা সার্থক।