
আকাশচুম্বী এক অট্টালিকা ‘তাইপে ১০১’। যেখানে কাচ আর ইস্পাতের দেয়ালে খালি হাতে ঝুলে আছেন এক ব্যক্তি। হাজার হাজার মানুষ নিচ থেকে তাকিয়ে দেখছে, কেউ কেউ আবার জানালায় উঁকি দিয়ে উপভোগ করছে তার দুঃসাহসী যাত্রা। একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবনের স্বীকৃতি ছিল তাইওয়ানে অবস্থিত আইকনিক ভবন ‘তাইপে ১০১’-এর। সেই ভবনের চূড়ায় আরোহণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অ্যালেক্স হনোল্ড। এর পর থেকে তাঁকে নিয়ে আলোচনা যেন থামছেই না।
অ্যালেক্স হনোল্ডকে বলা হয় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী ও দক্ষ ‘ফ্রি সোলো ক্লাইম্বার’। ‘ফ্রি সোলো’ এমন এক পদ্ধতি, যেখানে আরোহীরা কোনো রশি বা যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই বিশাল পাহাড় বা আকাশছোঁয়া ভবনের চূড়ায় আরোহণ করেন। এমনকি তাঁদের সঙ্গে থাকে না কোনো জীবন রক্ষাকারী রশিও। অর্থাৎ একমুহূর্তের ভুল মানেই নিশ্চিত মৃত্যু।
সেই মৃত্যুর সঙ্গে খেলতে ভালোবাসেন ফ্রি সোলো ক্লাইম্বাররা। ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত ফ্রি সোলো ক্লাইম্বিং করে আসছেন অ্যালেক্স হনোল্ড। ২০০৭ সালে এক দিনে দুই পাহাড় জয় করে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন তিনি।
হনোল্ড মূলত বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান ২০১৭ সালে। সে বছর ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কের ৩ হাজার ফুট উঁচু গ্রানাইট পাহাড় ‘এল ক্যাপিটান’ জয় করে তাক লাগিয়ে দেন। তাঁর এই অসাধ্যসাধনের গল্প নিয়ে তৈরি করা তথ্যচিত্র ‘ফ্রি সোলো’ জিতে নিয়েছিল অস্কার। এর পর থেকে হনোল্ডের জনপ্রিয়তা শুধু বেড়েই চলেছে।
তবে ৪০ বছর বয়সী অ্যালেক্স হনোল্ডের জন্য এবারের চ্যালেঞ্জটা একটু কঠিনই ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে হনোল্ড সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তাইপে ১০১ ভবনে চড়বেন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ অট্টালিকার খেতাব ছিল এ ভবনের। একে তো মাটি থেকে ১ হাজার ৬৬৭ ফুট উঁচু একটি ভবন, সেই সঙ্গে পুরো ভবনই তৈরি করা হয়েছে বাঁশের কঞ্চির আদলে। ফলে সেখানে ঝুলে থাকতে হলে পুরো শরীরের সহায়তা পাওয়া যায় না বললেই চলে।
শুধু হাতের তালুর ওপর ভরসা করে পুরো ভবনের একেকটি অংশ উঠতে হয়েছে অ্যালেক্স হনোল্ডকে। তাঁর এই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিল নেটফ্লিক্স। ভবনে নিচ থেকে চূড়া জয়ের এই পুরো সময়টা সরাসরি স্ট্রিমিং করে নেটফ্লিক্সে। সরাসরি বললে একটু ভুল হবে; কারণ, ১০ সেকেন্ডের একটা বিরতি রেখে সেটা নেটফ্লিক্স প্রচার করছিল। কারণ, নেটফ্লিক্স তৈরি ছিল যেকোনো দুর্ঘটনার জন্যও।
নেটফ্লিক্সের নির্বাহী জেফ গাস্পিন ‘ভ্যারাইটি ম্যাগাজিন’কে বলেন, ‘খারাপ কিছু ঘটলে আমরা দ্রুত দৃশ্যটি সরিয়ে নিতাম। কারণ, কেউ এমন কিছু দেখতে চায় না। যে কারণে আমাদের লাইভটি ১০ সেকেন্ড দেরিতে সম্প্রচার হচ্ছিল।’
অ্যালেক্স হনোল্ড দুঃসংবাদ পেয়েছিলেন ভবনটিতে চড়ার আগের দিন। বৃষ্টির কারণে ২৪ জানুয়ারি নির্ধারিত দিনক্ষণ ঠিক করেও পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। এক দিন পর ২৫ জানুয়ারি সকালে ভবনে চড়তে শুরু করেন হনোল্ড। এদিন বৃষ্টি না থাকলেও ছিল রোদ। রোদের কারণে কোনো সমস্যা হয় কি না, সে নিয়ে চিন্তিত ছিল অনেকে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি।
উল্টো সব রেকর্ড ভেঙে চূড়ায় ওঠেন অ্যালেক্স হনোল্ড। মাটি থেকে ভবনের চূড়ায় পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছে মাত্র ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট। এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন ফরাসি পর্বতারোহী অ্যালাইন রবার্ট। যিনি আবার ‘স্পাইডার-ম্যান’ নামেও পরিচিত। নিরাপত্তা রশি ব্যবহার করে অ্যালাইন এই ভবন জয় করেছিলেন চার ঘণ্টায়।
অ্যালেক্স হনোল্ড অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার এই যাত্রায় বারবার শরীর অসাড় হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, অনন্তকাল ধরে উঠেই যাচ্ছি। ওপরে তাকালেই মনে হচ্ছিল, ভবনটা যেন শেষই হচ্ছে না।’
তবে সবচেয়ে দারুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ৮৯ তলায়। কাচের দেয়ালের ওপাশে থাকা দর্শনার্থীরা হনোল্ডকে দেখে হাত নেড়ে উৎসাহ দিতে থাকেন।
ভবনের মালিক থেকে শুরু করে তাইওয়ানের সরকার, কেউই প্রথমে হনোল্ডকে এই অনুমতি দিতে চায়নি। দুর্ঘটনার ভয় ছিল সবার মনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই পুরো আরোহণ শেষ করেছেন হনোল্ড। ভবনের চূড়ায় পৌঁছেই তাই হনোল্ডের অভিব্যক্তি ছিল, ‘সিক (দারুণ)!’
তাইওয়ানের ভাইস প্রেসিডেন্ট শিয়াও বি-খিম হনোল্ডকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘দৃশ্যটি দেখতে আমার এত ভয় লাগছিল, মনে হচ্ছিল, আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।’
হনোল্ডের ফ্রি সোলো যেন আরেকবার জানান দিল, একবার লক্ষ্য ঠিক করলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ভয়কে জয় করার মানসিকতা থাকলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না।
সূত্র: বিবিসি, সিএনএন ও একাধিক তথ্যচিত্র