মারিয়া মুমুর হাতে সম্মানজনক ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড
মারিয়া মুমুর হাতে সম্মানজনক ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড

মানসিক স্বাস্থ্য

ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত মারিয়া

মারিয়া মুমু মানসিক স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ভূষিত হয়েছেন সম্মানজনক ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডে। তরুণদের সামাজিক ও মানবিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য মাত্র ২০ বছর বয়সেই মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেলেন তিনি। প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মাথায় মারিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘মশাল মেন্টাল হেলথ’ এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল।

তরুণদের সামাজিক ও মানবিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন মারিয়া মুমু

পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে মারিয়া বলেন, ‘আমার যখন তিন বছর বয়স, তখন আমার বাবা আর মা আলাদা হয়ে যান। আমি মায়ের কাছেই বড় হই। তারপর বাবার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। আমি চেষ্টা করেছি, বাবা সাড়া দেননি। আমি বাবার এই সিদ্ধান্তকে বাধা হিসাবে নেইনি। তবু বাবা দিবসে একটু মন খারাপ লেগেছে। আর সেদিনই অ্যাওয়ার্ডটা আমার হাতে আসে। কী যে খুশি লাগল! এর আগেই অবশ্য জানতে পেরেছিলাম। যাঁরা আমাকে মনোনীত করেছিলেন তাঁদের মাধ্যমে।’

জানা গেল, মশাল মেন্টাল হেলথের জন্মকাহিনিও। মারিয়া বললেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটিতে ভুগেছি। এমনকি আমি হেলুসিনেটিংও করতাম। এটা ২০১৭ সালের ঘটনা। সেই সময় আমার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে আমি একজন সাইকোথেরাপিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করি। উনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি নিয়ে পড়ছিলেন। তাঁর কাউন্সেলিংয়ে আমি সেরে উঠি। তারপর ভাবলাম, যে অসুখে আমি নিজেই বারবার আত্মহত্যার কথা ভেবেছি, মানুষ কেন সেটা গ্রাহ্যই করে না। সেটা নিয়ে কথা বলে না! আমার খুব কাছের একটা বন্ধু ক্লাস নাইনে রেজাল্ট খারাপ করে আত্মহত্যা করে। এসবই আমার এই প্রতিষ্ঠান খোলার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আর তিন মাস পরেই আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানাতে দেখা করি। আমার সেই সাইকোথেরাপিস্ট পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে আমার কোম্পানির উপদেষ্টা হিসেবে আছেন।’

সম্মননা স্মারক হাতে মারিয়া

দীর্ঘদিন বিষণ্নতা আর উদ্বিগ্নতার সঙ্গে লড়াই করেছেন মারিয়া। পরবর্তীকালে তিনি নিজেকে একজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। মারিয়ার সামাজিক কার্যক্রমের প্রভাব শুরু হয় ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০১৯’ থেকে। সেবার তিনি এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। শেষ পাঁচে এসে চতুর্থ হয়ে যাত্রা শেষ হয় তার। তিনি নাকি সেখানে বিজয়ী হতে যাননি। গিয়েছিলেন মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলার একটা প্লাটফর্ম পেতে। আর কারও প্রিয়জন যাতে বিষণ্নতায় আত্মহত্যা করে মারা না যায়, সে জন্য কাজ করে চলছেন তিনি।

মিস ইউনিভার্স অবশ্যই তাঁর জীবনের দারুণ এক অভিজ্ঞতা। এর পরের বছর অর্থাৎ গত বছর তিনি ‘মশাল মেন্টাল হেলথ’ প্রতিষ্ঠা করেন। মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের। একই সঙ্গে তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী আর কার্যকর করে তুলতে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে থাকেন।

মারিয়া মুমু

খুব অল্প সময়ে মশাল দেশের ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ভেতর উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে সক্ষম হয়। চলমান করোনা অতিমারির কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রথমে হটলাইনের মাধ্যমে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান শুরু করে মশাল। সম্প্রতি তারা সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি অনাথ শিশুদের বিনা মূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। ‘ইয়ুথ ফর দ্য ওয়ার্ল্ড’ (যেখানে অংশ নেয় সাতটি দেশ) কিংবা ‘লেটস টক মেন্টাল হেলথ’-এর মতো কর্মসূচির আয়োজন করেছে। প্রথমবারের মতো এই ধরনের ইভেন্ট আয়োজন করে দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ নজির স্থাপন করেছে মারিয়ার প্রতিষ্ঠান।

মাত্র এ লেভেল শেষ করা মারিয়া সাইকোলজি নিয়েই উচ্চতর শিক্ষা অর্জনে আগ্রহী। সে লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে মশাল নিয়েও রয়েছে তাঁরা নানা পরিকল্পনা। সে প্রসঙ্গেই জানালেন, অদূর ভবিষ্যতে মশাল বেশ কিছু নতুন আয়োজন করবে, পাশাপাশি ক্রীড়াবিদদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করছে মশাল। এমনকি অনাথ শিশুদের বিনা মূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও দিচ্ছে তারা।

তিন শ শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি কার্যক্রমের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল মশাল; সেটি আরও বড় হয়েছে। মশালের মাধ্যমে আমি এমন একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে একটি শিশু ছোটবেলা থেকে সমর্থনশীল পরিবেশে বেড়ে উঠছে। যেখানে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক খুবই মধুর, ভালো ফল করতে না পারাটা কোনো অপরাধ নয়। আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি সমাজের, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংগ্রাম করে যাওয়া একজন মানুষ সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক আর প্রয়োজনীয় সেবা হয়ে উঠেছে—এমন স্বপ্নের কথাই শোনালেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী এই সদস্য তরুণী।

মানসিক স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর মারিয়া মুমু

মারিয়ার প্রচেষ্টায় মশাল এমন একটি সমাজ তৈরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংগ্রাম করে চলা মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসবে। মানসিক স্বাস্ব্যসেবাকে একটা স্বাভাবিক প্রয়োজন হিসেবে দেখা হবে। এমন দিনের প্রতীক্ষায় কেবল মারিয়া নন, আমরা অনেকেই। মারিয়ার প্রয়াস এই দিনকেই কোনো সন্দেহ নেই নিয়ে যাবে সেই আশাময় দিনের কাছে।

ছবি: মারিয়া মুমু