বয়স সত্তরের কোঠায় পৌঁছানোর পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বলতা, জড়তা ও নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ অনেকটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। স্মৃতিশক্তি ঘোলাটে হয়ে যায়, সব সময় একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঘুম ঘুম ভাব।
ঘুমের ধরন ও নিয়মেও ঘটে পরিবর্তন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, নিয়মিত স্বাস্থ্যকর রুটিন অনুসরণ করলে ৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সেও শরীর ও মস্তিষ্ক ভালো রাখা সম্ভব। আর সেই প্রস্তুতি ৩০ বছর বয়স থেকেই নিতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার বাক ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন এজিংয়ের গবেষকদের মতে, জীবনযাত্রায় কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস যোগ ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমে দীর্ঘায়ু ও সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী এরিক ভার্ডিন বলেন, অনেকে ৯০ থেকে ৯৫ বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকতে পারেন, যদি আগে থেকেই বার্ধক্য প্রতিরোধে কাজ শুরু করেন।
নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বা অ্যালকোহল কমানো—এই অভ্যাসগুলো যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে, স্বাস্থ্যে এর ইতিবাচক প্রভাবও তত দ্রুত লক্ষণীয় হবে। গবেষকেরা মানুষের ৩০–পরবর্তী সময়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দশক বলে উল্লেখ করেন।
কারণ, তিরিশের পর থেকেই শরীরের শক্তি, মাংসপেশি, হাড়ের ঘনত্ব ও বিপাকক্রিয়ায় নীরব পরিবর্তন শুরু হয়। তাই এ সময় থেকে কিছু অভ্যাস রপ্ত করলে শেষ বয়সে চলাফেরা কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা যায়।
নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়াম
মিনেসোটার মায়ো ক্লিনিকের কোগোড সেন্টার অন এজিংয়ের ফিজিওলজির অধ্যাপক জোয়াও পাসোস বলেন, ৩৫–এর বেশি বয়সী অ্যাথলেটরা খেলাধুলা অব্যাহত রাখেন বলে ষাটোর্ধ্ব বয়সেও তাঁরা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন।
ক্রীড়াবিদদের অনেকেই অন্যদের তুলনায় বিলম্বে বার্ধক্যে উপনীত হন। তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা, মাংসপেশির দৃঢ়তা ও শারীরিক শক্তি–সামর্থ্য অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত বজায় থাকে।
এতে তাঁদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে অনেক বেশি সময় ধরে গতিশীল ও স্বনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সীদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হোঁচট খাওয়া ও পড়ে যাওয়া।
এতে হাড়ের জয়েন্টে দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী ক্ষতির কারণে চলাফেরার তৎপরতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই হাড় ও জয়েন্টের যত্ন ও সুস্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলা বা শরীরচর্চা এ ক্ষেত্রে চমৎকার একটি উপায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের মতো খেলার সঙ্গে দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের একটি জাপানি গবেষণায় সাইক্লিংয়ের উপকারিতা তুলে ধরা হয়।
যেখানে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা নিয়মিত সাইকেল চালান, তাঁদের মধ্যে অকালমৃত্যু বা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার হার অনেক কম। প্রতি সপ্তাহে ৭৫ মিনিটের বেশি দৌড়ানো বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে ধীর করে।
অন্য একটি গবেষণায় বলা হয়, প্রতিদিন পাঁচ মিনিটের কম সময় ধরে মাঝারি বা দ্রুতগতির শরীরচর্চা মস্তিষ্কের বার্ধক্যকে ধীর করতে সাহায্য করে। এমনকি খাওয়ার পর ১৫ মিনিটের দ্রুত হাঁটাও লক্ষণীয় পরিবর্তন আনতে পারে।
দাঁত ও মাড়ির যত্ন
নিয়মিত চেকআপ, ভালোভাবে দাঁত মাজা, ধূমপান পরিহার ও চিনিযুক্ত খাবার সীমিত করার মাধ্যমে মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখা যায়। তিরিশের কোঠাতেই এসব রুটিন মেনে চললে পিরিয়ডন্টাল বা মাড়ির রোগের বিকাশ রোধ করা সম্ভব। মাড়ির প্রদাহ মস্তিষ্কের প্রদাহ বাড়াতে পারে। তাই সচেতন ও যত্নশীল হলে পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়া হওয়ারও ঝুঁকি কমে।
নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম
কেবল এক রাতের অপর্যাপ্ত ঘুম বিপাকের প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই নিয়মিত ঘুমের ধরন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষ সার্কাডিয়ান প্রাণী, যার শরীর দিন–রাতের চক্র অনুসরণ করে। জিনের প্রকাশ থেকে বিপাক পর্যন্ত দেহঘড়ির সবকিছু এই ২৪ ঘণ্টার চক্র মেনে চলে। এ কারণে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া শরীরকে সবকিছুর সঙ্গে সুসংগত রাখতে সাহায্য করে। যাঁরা মধ্যবয়সে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখেন, তাঁদের হৃদ্রোগ, স্মৃতিলোপ ও দুর্বলতার ঝুঁকি কম থাকে।
পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস
৩০ বছর বয়স পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করার উপযুক্ত সময়। অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বেশি বেশি ফল ও শাকসবজি খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আনতে পারে। গাজর, মিষ্টি আলু, আম, খেজুর, অ্যাপ্রিকট—এসবের ক্যারোটিনয়েড শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় এবং বয়সের গতি ধীর করে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং
অনেকে এ সময় মাঝেমধ্যে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের উপকারিতার ওপরও জোর দিয়েছেন। দীর্ঘায়ু–বিষয়ক গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীর হজম প্রক্রিয়ায় শক্তি খরচ না করে নিজেকে মেরামত বা রিপেয়ারের অবকাশ পায়।
১৬: ৮ ডায়েট জনপ্রিয় হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১২ ঘণ্টা উপবাস + ১২ ঘণ্টা খাবার এই সহজ রুটিনেও বার্ধক্য প্রতিরোধে বড় উপকার পাওয়া যায়।
সামগ্রিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রথম ধাপে আমরা যে জীবনযাপন বেছে নিই, তা আমাদের বয়সের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ফ্রেমিংহাম হার্ট স্টাডি ও নার্সেস হেলথ স্টাডির মতো দীর্ঘ দশকব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখলে হৃদ্রোগ, ডিমেনশিয়া, পেশিশক্তি হ্রাস ও চলাফেরা সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকে। যদিও আমরা বার্ধক্য থামাতে পারি না, কিন্তু বার্ধক্যের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে অবশ্যই পারি।
সূত্র: বিবিসি