মানসিক বা ভালো থাকার উপায় হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিবলিওথেরাপির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বিবলিওথেরাপি হলো বই বা সাহিত্যের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও আরোগ্যের সৃজনশীল এক উপায়।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও গ্রন্থাগারিক এলিজাবেথ রাসেল বিবাহবিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ইন্টারনেটে সৃজনশীল বিবলিওথেরাপি সম্পর্কে জানেন। ‘বিবলিওথেরাপি’ দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে—‘বিবলিও’ অর্থাৎ ‘বই’ এবং ‘থেরাপি’ অর্থাৎ ‘চিকিৎসা’।
এলিজাবেথ সে সময় যুক্তরাজ্যের সাসেক্সের বিবলিওথেরাপিস্ট এলা বার্থউডের নাম শোনেন, যিনি সাহিত্যভিত্তিক এই নিরাময়পদ্ধতি নিয়ে ‘দ্য নভেল কিওর’ নামে একটি বইয়ের সহলেখক। এলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এলিজাবেথ। রাসেলের পড়ার অভ্যাস ও জীবনের কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর বার্থউড তাঁকে এমন কিছু বইয়ের তালিকা পাঠান, যা তাঁর জীবনের পরিস্থিতির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
অনেক বইয়ে এমন সব চরিত্র ছিল, যারা দাম্পত্য জীবনে কঠিন সব সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন। ন্যান্সি পার্লের লেখা ‘জর্জ অ্যান্ড লিজি’ তার মধ্যে অন্যতম। বইটির কাল্পনিক চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা এলিজাবেথকে নিজের পরিস্থিতি বুঝতে ও সামলে উঠতে সাহায্য করে। তাঁর একাকিত্বের অনুভূতিও অনেকটা কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিবলিওথেরাপির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এতে কেবল কথাসাহিত্য নয়; বরং নন-ফিকশনাল তথ্যমূলক বা বাস্তবধর্মী সাহিত্য এবং আত্ম-উন্নয়নমূলক বইয়ের পরামর্শও দেওয়া হয়। ‘সেলফ-হেল্প’ বা আত্ম-উন্নয়নমূলক সাহিত্যের সুফল নিয়ে প্রচুর তথ্যপ্রমাণ আগে থেকেই ছিল।
এখন ‘ক্রিয়েটিভ বিবলিওথেরাপি’-র সমর্থকেরাও সাহিত্যভিত্তিক বই থেকে একই ধরনের উপকার পাওয়ার দাবি করছেন। তাঁদের মতে, বইয়ের কাল্পনিক জগতের গভীরে গিয়ে একজন পাঠক দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তি পান। আবার বইয়ে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে যে কাহিনি লেখা হয়, তা তাদের আবেগ অনুধাবন ও সামলানোর উপায় খুঁজে পেতে সহায়তা করে।
২০১৬ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দুজন গবেষক উল্লেখ করেন, ‘অনেক দেশেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল। সেই দিক বিবেচনা করলে বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক সহায়তা পাওয়ার ধারণাটি বেশ চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয়। যাঁরা নাটক, কবিতা বা সাহিত্য পড়েন এবং ভালোবাসেন, তাঁরা জানেন, আমাদের মন ও আবেগের ওপর গল্পের গভীর প্রভাব রয়েছে।
ধারণা করা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিবলিওথেরাপির উৎপত্তি হয়েছিল। সৈন্যদের কষ্ট ও মানসিক আঘাত লাঘবে তখন কথাসাহিত্য ও তথ্যমূলক বই ব্যবহার হতো। নব্বইয়ের দশকে এই ধারণা পুনরায় ফিরে আসে। বর্তমানে নানাভাবে বিবলিওথেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে।’
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার (এনএইচএস) জেনারেল ফিজিশিয়ান অ্যান্ড্রু শুম্যান মতে, অন্যান্য চিকিৎসার তুলনায় এর সুবিধা হলো মানুষ এটি নিজের সুবিধামতো সময়ে করতে পারেন। যখন ইচ্ছা বই পড়বেন, আবার যখন মানসিক চাপ মনে হবে, তখন সরিয়ে রাখবেন।
২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য রিডিং এজেন্সি’-র ‘রিডিং ওয়েল’ কর্মসূচিটি ডিমেনশিয়া ও বিষণ্নতার মতো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করে আসছে। সংস্থাটির স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক প্রধান জেমা জলি জানান, বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সহায়তায় সতর্কতার সঙ্গে এই তালিকা বাছাই ও পর্যালোচনা করা হয়। এর লক্ষ্য হলো মানুষকে সত্যিকার অর্থে উপকারী বইয়ের সন্ধান দেওয়া।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ‘রিডিং ওয়েল’ কর্মসূচিটি শুরু হয়। এর পর থেকে ৩৯ লাখের বেশি বই ধার দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কিছু স্বাস্থ্য সংস্থাও গ্রন্থচিকিৎসার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। যেমন ইটিং ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকায় ‘সেলফ-হেল্প’ বা আত্মসহায়ক বইগুলোকে চিকিৎসার একটি মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
একটি বিষয় এখানে মনে রাখা জরুরি, সব ‘সেলফ-হেল্প’ বই সব রোগীর জন্য উপকারী বা কার্যকর নাও হতে পারে। স্বাস্থ্যগত কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু কথাসাহিত্য বা ফিকশন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিখ্যাত গবেষক ট্রোসকিয়াঙ্কো, যিনি সাইকোলজি, লিটারেচার ও হেলথ হিউম্যানিটিজ নিয়ে কাজ করেন, তিনি যুক্তরাজ্যের ‘ইটিং ডিসঅর্ডার’–বিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘বিট’–এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ৯০০ জনের ওপর একটি জরিপ চালান। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কথাসাহিত্য পড়ার কারণে মনমেজাজ, আত্মসম্মান বোধ, খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার রুটিন এবং শারীরিক কী প্রভাব পড়েছে।
যেসব বইয়ে ইটিং ডিসঅর্ডারে ভোগা চরিত্র ছিল, সেসব বই পড়ার কারণে উপসর্গগুলো আরও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেসব বই নেতিবাচক অনুভূতি উসকে দেয় বা খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে—এমনই বইগুলোই আবার অনেকে খুঁজে খুঁজে পড়েছেন। আসক্তিতে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম হতে পারে। অর্থাৎ, যেসব উপন্যাসে মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহারকারী চরিত্র আছে, সেগুলো আসক্তিকে উসকে দিতে পারে। তাই যেকোনো বিষয় নিয়ে বই পড়াই উপকারী—এ ধারণা ঠিক নয়।
সাহিত্য জটিল বিষয়, মানুষও জটিল; তাই এর প্রভাবও জটিল ও নানামুখী। এনএইচএসের চিকিৎসক শুম্যান জানান, তিনি কেবল তাঁদের সঙ্গেই কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন, যাঁদের তিনি ভালোভাবে চেনেন। যাঁরা কোনো সাইকোটিক বা মানসিক বিকারজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন কিংবা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, তাঁদের কখনোই তিনি বিবলিওথেরাপির পরামর্শ দেন না। কারণ, এটি কেবল ক্ষতিকরই নয়, চিকিৎসকদের প্রতি রোগীর আস্থাও কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেন যে সবার সমস্যার সমাধান বই নয়। এটি মূলত একটি বাড়তি উপায়, যা কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো কাজে আসতে পারে। আবার একা একা বই পড়ার চেয়ে গ্রুপ রিডিংয়ের ইতিবাচক ফলাফল তুলনামূলক বেশি।
বিষণ্নতায় ভোগা আট সদস্যের দুটি দলের ওপর ছোট একটি গবেষণা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, এক বছর ধরে কবিতা ও কথাসাহিত্যের গ্রুপ রিডিংয়ে অংশ নেওয়ার ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ সমস্যায় ভোগা মানুষদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধরনের কথাসাহিত্য উপকারী হতে পারে। কারণ, উদ্বেগের মূল কারণই হলো অনিশ্চয়তা।
যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর শার্লক হোমস-গোছের গল্পগুলো অনেকের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, এ ধরনের গল্প–উপন্যাসে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করতে দেখা যায়। যা ভুক্তভোগীকেও নিজের জীবনের সমস্যা সমাধানে উদ্বুদ্ধ করে।
সূত্র: বিবিসি