ব‍্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সঠিক নিয়ম জানেন তো?

‘প্রাইভেট পার্ট’ পরিষ্কার রাখা যেমন নিজের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সঙ্গীর সুস্থতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এ কথা প্রযোজ্য। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. হাসিনা সাদিয়া খান

পুরুষেরা অপরিচ্ছন্ন থাকলে সেটার প্রভাব পড়তে পারে তাঁর সঙ্গীর ওপরেও
প্রাইভেট পার্ট পরিষ্কার

কেন সঠিক নিয়ম জানা জরুরি

প্রাইভেট পার্টের ত্বক দেহের অন্যান্য অংশের তুলনায় সংবেদনশীল। বিশেষত নারীর প্রাইভেট পার্টের সংবেদনশীলতা অনেক বেশি। নারী ও পুরুষ যে কেউ অপরিচ্ছন্ন থাকলে সেটার প্রভাব পড়তে পারে তাঁর সঙ্গীর ওপরেও।

নারীর যোনিপথ (ভ্যাজাইনা) এবং যোনিপথের বাইরের অংশ (ভালভা) নির্দিষ্ট পিএইচ বজায় না থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সংক্রমণ হলে জ্বর, চুলকানি, ব্যথা ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব হতে পারে।

সংক্রমণ কখনো কখনো গর্ভাশয়, এমনকি গর্ভনালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। গর্ভনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে একজন নারীর সন্তানধারণের সম্ভাব্যতাও কমে যেতে পারে।

এ ছাড়া নারীর প্রস্রাবে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি।

পুরুষের ক্ষেত্রে প্রাইভেট পার্টে অস্বস্তিকর চুলকানি হতে পারে। নারীর তুলনায় ঝুঁকি কিছুটা কম থাকলেও পরিচ্ছন্নতার অভাবে প্রস্রাবের মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে পুরুষের। জটিলতা সৃষ্টি হলে মূত্রনালি সরুও হয়ে যেতে পারে।

নারীর জন্য

  • ভালভার বিভিন্ন অংশ আছে। যোনিপথের দুই পাশে ঠোঁটের মতো ছড়ানো যে অংশ থাকে (ল্যাবিয়া মেজোরা ও ল্যাবিয়া মাইনোরা) এবং এর ওপর যে ছোট্ট উঁচু অংশ থাকে (ক্লাইটোরিস), এসবই কুসুম গরম পানি দিয়ে ধোয়া উচিত। এসবের আশপাশে যে ভাঁজের মতো জায়গা আছে এবং আশপাশে যতটা ত্বক আছে, তা-ও কুসুম গরম পানি দিয়ে ধোয়া উচিত।

  • যখনই প্রাইভেট পার্টে পানি দেবেন, তখনই পানিটা সামনে থেকে পেছন থেকে প্রবাহিত করবেন। অবশ্যই খেয়াল রাখুন, হাত বা টিস্যুপেপার যেন পেছন থেকে সামনের দিকে না আসে। প্রতিবার শৌচকর্মের সময়ও এটা মনে রাখতেই হবে।

পিরিয়ডের সময় ব্যবহৃত স্যানিটারি পণ্য ও মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সঠিক নিয়ম মেনে চলুন
  • তবে এসব জায়গায় কোনো সাবান বা সুগন্ধি ব্যবহার করতে নেই। পানি ব্যবহার করার সময় আলতোভাবে আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করাই যথেষ্ট।

  • নারীর যোনিপথ কখনোই পরিষ্কার করতে নেই। এটি প্রাকৃতিক নিয়মেই পরিষ্কার হয়ে যায়। এমনকি এর ভেতর পানিও দিতে নেই। বাইরে থেকে কিছু দেওয়া হলে যোনিপথের পিএইচের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

  • যোনিপথ পরিষ্কার করতে ‘ভ্যাজাইনাল ডাউচ’–জাতীয় কিছুও ব্যবহার করবেন না।

  • পিরিয়ডের সময় ব্যবহৃত স্যানিটারি পণ্য বদলে নিতে হবে নিয়মমাফিক, সময়মতো। যেমন রক্তপ্রবাহ কমে হলেও স্যানিটারি ন্যাপকিন চার-ছয় ঘণ্টার মধ্যেই বদলে ফেলতে হবে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ট্যাম্পুন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সঠিক নিয়ম মেনে চলুন।

পুরুষের জন্য

  • পুরুষের ক্ষেত্রে প্রস্রাব করার পরও অনেক সময় মূত্রনালিতে কিছুটা প্রস্রাব রয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিবার প্রস্রাব করার পর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। এরপর পরিষ্কার এক বা একাধিক আঙুল রাখুন পেরিনিয়ামে। অণ্ডকোষের ঠিক পেছনে, পায়ুপথের আগে যে অংশ থাকে, এটাই হলো পেরিনিয়াম। আঙুলের সাহায্যে সামান্য চাপ দিয়ে নিচ থেকে ওপরের দিকে এবং পেছন থেকে সামনের দিকে (অর্থাৎ পুরুষাঙ্গের গোড়ার দিকে) আলতো করে বুলিয়ে আনুন। এতে মূত্রনালিতে প্রস্রাবের ফোঁটা জমে থাকলে তা বেরিয়ে আসবে এবং সহজেই টিস্যুপেপার দিয়ে মুছে ফেলতে পারবেন।

প্রাইভেট পার্ট স্পর্শ করার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন
  • প্রতিবার শৌচকর্ম করুন সঠিকভাবে। পানি ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। খতনা করা না থাকলে শৌচকর্মের সময় পুরুষাঙ্গের সামনের চামড়াটুকু আলতোভাবে টেনে সরিয়ে নিন। এই চামড়ার নাম ফোরস্কিন। এর নিচের ছোট্ট অংশটাও পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন। তবে খেয়াল রাখবেন, ফোরস্কিন অতিরিক্ত টানবেন না। এতে তা আটকে যেতে পারে।

  • রোজ অন্তত একবার কুসুম গরম পানি দিয়ে প্রাইভেট পার্ট পরিষ্কার করুন। এই জায়গার ত্বকের প্রতিটি ভাঁজ এবং খাঁজ যত্ন করে ধুয়ে ফেলুন হাতের সাহায্যে। সপ্তাহে দু-তিন দিন এই কাজে সুগন্ধিবিহীন, হাইপোঅ্যালার্জেনিক ও মৃদু ধরনের সাবান ব্যবহার করুন, তবে প্রস্রাবের ছিদ্র বা ফোরস্কিনের আশপাশে সাবান ব্যবহার করা উচিত নয়।

খেয়াল রাখুন দুজনই

  • প্রাইভেট পার্ট স্পর্শ করার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।

  • কুসুম গরম পানি না থাকলে সাধারণ তাপমাত্রার পানি দিয়েই প্রাইভেট পার্ট পরিষ্কার করুন।

  • প্রাইভেট পার্ট পরিষ্কার করার পর আলতো করে চেপে মুছে নিন (প্যাট ড্রাই)।

  • মোছার জন্য পরিষ্কার, নরম টিস্যুপেপার ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যবহৃত টিস্যুপেপার ফেলে দিন ময়লার বিনে।

  • টিস্যুপেপারের বদলে কাপড় ব্যবহার করতে চাইলে নরম কাপড় বেছে নিন। ব্যবহারের আগে তা মৃদু ধরনের পরিষ্কারক দিয়ে ধুয়ে, ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।

শেভ বা ট্রিম করার পর ত্বক ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে অ্যালকোহলমুক্ত ও সুগন্ধিবিহীন হাইপোঅ্যালার্জিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন
  • প্রাইভেট পার্ট শেভ করার জন্য সুগন্ধিবিহীন, হাইপোঅ্যালারজেনিক ও মৃদু ধরনের পরিষ্কারক বেছে নিন। অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করাই ভালো।

  • লোম যেদিকে দৈর্ঘ্যে বাড়ে, শেভ বা ট্রিম করুন সেই দিক বরাবর। রেজার বা ট্রিমার যেটিই ব্যবহার করবেন, তা পরিষ্কার রাখুন। সময়মতো রেজার বদলে নিন।

  • শেভ বা ট্রিম করার পর ত্বক ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে অ্যালকোহলমুক্ত ও সুগন্ধিবিহীন হাইপোঅ্যালার্জিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

  • সুতি ও ঢিলেঢালা অন্তর্বাস পরুন।

  • ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী কারও সঙ্গেই শেয়ার করবেন না।

  • সুগন্ধি কনডম ব্যবহার করলে সংবেদনশীল ত্বকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

  • সহবাসের পর প্রস্রাব করা উচিত দুজনেরই।

  • যেকোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।