সুস্থ থাকতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির রোজ ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। দিন-রাত মিলিয়ে আপনি হয়তো রোজ ৭-৯ ঘণ্টাই ঘুমাচ্ছেন। তবু আপনি পড়তে পারেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। এ বিষয়ে ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নওসাবাহ নূর–এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

মানবদেহের ভেতর নানা ক্রিয়া-বিক্রিয়া চলতে থাকে দিনরাত। বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘড়ির সময় অনুযায়ীই চলে এসব প্রক্রিয়া। অর্থাৎ দিন ও রাতের সময় অনুযায়ী এসব প্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়। কখন ঘুমাচ্ছেন, তা-ও এসবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানেই লুকিয়ে আছে তারুণ্য ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ এক সূত্র।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি রাত ১০টায় ঘুমাতে যান; ভোর ৬টায় ওঠেন। আরেক ব্যক্তি ঘুমাতে যান রাত দুইটায়; ওঠেন সকাল ১০টায়। দুজনই ৮ ঘণ্টা ঘুমান। তবে দুজনের শরীরে ঘুমের প্রভাব কিন্তু এক রকম হবে না।
এই দুজনের ঘুমের সময়কাল ৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ পর্যাপ্ত সময় ঘুমাচ্ছেন দুজনই। কিন্তু একজন ঘুমাচ্ছেন ভুল সময়ে, দেহঘড়ির সময়ের বিপরীতে।
রাত মানুষের জন্য বিশ্রামের সময়। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। রাতে ঘুমের মান ভালো হয়।
সন্ধ্যায় অন্ধকার হওয়ার সময় থেকে দেহ ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য তৈরি হতে থাকে। এ সময় মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে থাকে।
মেলাটোনিন হলো ঘুমের হরমোন। ঘরে আলো আসতে থাকলে আবার মেলাটোনিন কমতেও শুরু করে। ভোররাতে বাড়তে থাকে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ। কর্টিসল হরমোনকে সাধারণভাবে বলা হয় স্ট্রেস হরমোন। আমাদের কর্মচাঞ্চল্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে।
এমন সব বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাব পড়ে মানবদেহে। তাই যাঁর মোট ঘুমের বড় অংশ হলো ভোরের আলো ফোটার পর, সাধারণত তাঁর ঘুমের মান খুব একটা ভালো হয় না।
এ ছাড়া দিনের আলো, শব্দ, অন্যদের কর্মচাঞ্চল্য—সবই গভীর ঘুমের অন্তরায়। রাত ১০টায় ঘুমালে ঘুমের মান যেমন ভালো হয়, রাত দুইটায় ঘুমাতে গেলে তেমনটা হয় না।
ভালো মানের ঘুমে একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে গভীর ও অগভীর ঘুমের পর্যায়ে পৌঁছান। সুস্থতার জন্য গভীর-অগভীর ঘুমের এ চক্র ঠিক রাখা খুবই জরুরি। আলো-অন্ধকারের সঙ্গে ঘুমের চক্র জড়িয়ে আছে। এ চক্রের সঙ্গে নানান হরমোনের নিঃসরণ গভীরভাবে যুক্ত।
ঘুমের গভীর পর্যায়ে গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণ হয় সবচেয়ে বেশি। অনেকেই জানেন, বাড়ন্ত বয়সে সঠিক বৃদ্ধির জন্য এ হরমোন ভীষণ প্রয়োজনীয়। তবে এটাও খেয়াল রাখুন যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহের রোজকার ক্ষয়পূরণের জন্যও গ্রোথ হরমোন জরুরি। তাই ঘুমের মান ভালো না হলে ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও আপনি পুরোপুরি সতেজ হবেন না।
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন, কর্টিসল, গ্রোথ হরমোন এবং আরও নানান হরমোনের ভূমিকা আছে। সঠিক সময়ে না ঘুমালে এসব হরমোনের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।
ক্ষুধার হরমোন (গ্রেলিন) ও তৃপ্তির হরমোনের (লেপটিন) ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।
দেহের রোজকার ক্ষয়পূরণ যদি ঠিকভাবে না হয়, আর এভাবেই যদি চলতে থাকে দিনের পর দিন, সহজেই বুড়িয়ে যেতে পারেন যে কেউ। নানান হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। প্রভাব পড়তে পারে শরীর ও মনে।
ঘুমানোর পরও ক্লান্তি থেকে যেতে পারে। মনমেজাজ বিগড়ে যেতে পারে সহজেই। মানসিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাড়তে পারে ওজন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ত্বকের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হতে পারে। বলিরেখা দেখা দিতে পারে কম বয়সেই।
বুঝতেই পারছেন, সুস্থ থাকতে এবং তারুণ্য ধরে রাখতে কেবল ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমালেই হবে না, বরং ঘুমাতে হবে সময়মতো।
খেয়াল রাখুন এসব বিষয়—
রোজ একই সময়ে ঘুমাতে এবং ঘুম থেকে উঠতে চেষ্টা করুন। সকালের আলোয় সময় কাটান।
প্রয়োজনে দিনে ‘ন্যাপ’ নিতে পারেন, তাতে ক্ষতি নেই। তবে ঘুমের মূল সময় হোক রাত, রাতের ঘুম রাতেই ঘুমান।
ঘুমের সময় ঘর অন্ধকার রাখতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে চোখে ‘আই মাস্ক’ ব্যবহার করুন।
নিতান্তই যদি রাতের শিফটে কাজ করতে হয়, তাহলে দিনের বেলায় যতটা সম্ভব রাতের মতো পরিবেশ তৈরি করে ঘুমান। এ ধরনের বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রাত জাগবেন না।
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির চেয়ে কিশোর-কিশোরীর ঘুমের চাহিদা বেশি। শৈশবে ঘুমের চাহিদা আরও বেশি। শিশু-কিশোরদের রাতের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।