আলঝেইমারে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তাশক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার স্বাভাবিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণও এই স্নায়ুরোগ। রোগটি প্রতিরোধের উপায় তাহলে কী?

চাবিটা কোথাও রেখে মনে করতে না পারা, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের কথা বেমালুম ভুলে যাওয়া—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মধ্যেই ভুলে যাওয়ার এসব প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই ভুলে যাওয়াটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে দৈনন্দিন জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে পড়ে।
দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, পরিবারগুলোয় বাড়ছে বয়স্ক সদস্যের সংখ্যা। এই ভুলে যাওয়া সমস্যার কারণে তাঁদের জটিলতাও বাড়ছে।
ভুলে যাওয়ার সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে তাকে ‘ডিমেনশিয়া’ বলে। ডিমেনশিয়ার অন্যতম কারণ হলো আলঝেইমার রোগ। এই রোগে রোগীর ভুলে যাওয়ার সমস্যার সঙ্গে আচরণ, ব্যক্তিত্ব, ঘুমের ছন্দ, কথাবার্তায় অসংলগ্নতা ও মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। এই রোগ সাধারণত ৬৫ বছরের পর হয়ে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অল্প বয়সেও আলঝেইমার হতে পারে।
আলঝেইমার রোগের কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বংশগত প্রভাব, মাথায় আঘাত, হতাশা, উচ্চ রক্তচাপ, মেধার কম ব্যবহার ও কম কায়িক শ্রম করার সঙ্গে এই রোগের যোগ আছে। মস্তিষ্কের ‘টেম্পোরাল লোব’ নামক অংশে আমাদের স্মৃতি জমা থাকে। আলঝেইমারের কারণে এ অংশ ক্ষয় হয়ে যায়। তা ছাড়া এই রোগে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড নামে একধরনের অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হয়, যা তার ব্যক্তিত্বকে পরিবর্তন করে দেয়।
নিকট অতীতের কথা ভুলে যাওয়া, তবে অনেক আগের কথা মনে থাকা।
একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকা।
ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে অস্বীকার করা, বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তর্ক করা।
কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
প্রস্রাব–পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, অতিরিক্ত অস্থিরতা, ঘুম কম হওয়া, হঠাৎ রেগে যাওয়া, ভুল দেখা বা শোনা।
ডিমেনশিয়া রোগনির্ণয়ের জন্য ডাক্তাররা সাধারণত প্রশ্ন–উত্তরভিত্তিক একটি পরীক্ষা করে থাকেন, যাকে বলে ‘মিনি মেন্টাল স্টেট এক্সামিনেশন’। ডিমেনশিয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য থাইরয়েড হরমোন, রক্তে ভিটামিন বি১২–এর পরিমাণ ও মাথার এমআরআই করা যেতে পারে। পেট স্ক্যান নামের একটি পরীক্ষা আলঝেইমার রোগ নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে পারে। অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে আলঝেইমার নির্ণয়ের জন্য মেরুদণ্ডের সিএসএফ (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) পরীক্ষা করে অ্যামাইলয়েডের পরিমাণ দেখা হয়।
আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় একাধিক বিভাগের ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা প্রয়োজন। স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ, মনোরোগবিশেষজ্ঞ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, পুষ্টিবিদ ও দক্ষ নার্সের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ দল এই ধরনের রোগীর চিকিৎসায় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আলঝেইমার রোগের চিকিৎসা দুইভাবে হতে পারে:
১. ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা
রিভাসটিগমিন, ডোনেপেজিল ও মেমানটিন–জাতীয় ওষুধ আলঝেইমার রোগীর চিকিৎসায় কার্যকর। এর মধ্যে রিভাসটিগমিন প্যাচ, যা চামড়ার ওপর লাগাতে হয়। এই রোগের চিকিৎসায় অনেক ব্যবহৃত হয়।
২. পরামর্শ
খাদ্যে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ভিটামিন প্রদান।
বিহেভিয়ারাল থেরাপি।
অকুপেশনাল থেরাপি।
নিয়মিত ব্যায়াম।
বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা।
আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় নতুন কিছু ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো বেশির ভাগই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি–জাতীয় ওষুধ। এই ওষুধগুলো আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রদান করলে রোগের অগ্রগতি অনেকটা থামিয়ে দেওয়া সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে।
জীবনব্যাপী সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে।
পরিমিত ঘুম (দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা) দরকার।
বই পড়া খুব ভালো অভ্যাস।
বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় অংশ নিন।
মেধার ব্যবহার করুন, যেমন দাবা খেলা, বিতর্কে অংশগ্রহণ, ধাঁধা বা সুডোকু মেলানো, শব্দজট সমাধান ইত্যাদি।