কাজটা একদম নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত আপনার শান্তি নেই? ছোট একটা ভুল নিয়েও বারবার ভাবেন? অন্যরা আপনার প্রত্যাশামতো কাজ না করলে বিরক্ত হন? নাকি সব সময় মনে হয়, অন্যরা আপনাকে কীভাবে দেখছে? এসবের সঙ্গে যদি নিজের মিল খুঁজে পান, তাহলে আপনি হয়তো পারফেকশনিজমের কোনো একটি ধরনে ভুগছেন।

পারফেকশনিজম হলো নিজের বা অন্যের জন্য অত্যন্ত উঁচু মানদণ্ড ঠিক করে তা নিখুঁতভাবে পূরণ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সমস্যা হয় তখন, যখন কোনো কাজ বা অর্জনই যথেষ্ট মনে হয় না, সামান্য ভুলও বড় ব্যর্থতা বলে মনে হয় কিংবা নিজের মূল্যবোধকে সাফল্য ও অন্যের স্বীকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়।
মনে রাখবেন, পারফেকশনিজম কোনো মানসিক রোগ নয়। তবে এটি অতিরিক্ত মাত্রায় গেলে উদ্বেগ, আত্ম-অসন্তুষ্টি, মানসিক চাপ ও বার্নআউটের মতো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ‘সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে নিজেকে পারফেকশনিস্ট বলে মনে করা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। যেন নিখুঁত হওয়াটা অনেকের কাছেই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব পারফেকশনিজম এক রকম নয়। মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত এটিকে তিন ধরনের প্রবণতায় ভাগ করেন—
১. সেলফ-ওরিয়েন্টেড
২. আদার-ওরিয়েন্টেড
৩. সোশ্যালি-প্রেসক্রাইবড পারফেকশনিজম
এ ধরনের মানুষ নিজের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ‘থ্রাইভওয়ার্কস’-এর থেরাপিস্ট এমিলি সিমোনিয়ানের মতে, নিজের প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা, ক্লান্তি এবং নিজের অর্জনকে কখনোই যথেষ্ট মনে না হওয়া—এসব এর লক্ষণ।
এ ধরনের মানুষ প্রচুর কাজ করেও নিজেকে বোঝান যে তাঁর অর্জন যথেষ্ট নয়। ফলে সাফল্য উদ্যাপনের পরিবর্তে তাঁরা অতৃপ্তি ও ক্লান্তিতে ভোগেন। কী অর্জন করেছেন, তার চেয়ে কী অর্জন করতে পারেননি, সেদিকেই মনোযোগ বেশি থাকে। একটি সাফল্য পাওয়ার পরই তাঁরা আরও বড় সাফল্যের দিকে ছুটতে শুরু করেন।
মুক্তির উপায়
একটু জিরিয়ে নিন। ‘স্লো লিভিং’-এ মনোযোগ দিন। ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করুন। সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্য রাখুন। নিজের প্রতিও সহানুভূতিশীল হোন।
এ ধরনটির সঙ্গে আমাদের অনেকেরই পরিচয় আছে। কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে কিংবা স্কুল-কলেজে এর মুখোমুখি হয়েছেন নিশ্চয়ই।
এ ধরনের মানুষ আশপাশের মানুষকে নিজের ঠিক করে দেওয়া মানদণ্ডে মাপতে চান। মনে করেন, অমুকের তমুকের মতো হওয়া উচিত। অন্যরা তাঁর প্রত্যাশামতো আচরণ না করলে তিনি বিরক্ত হন, তাঁদের বিচার করেন। এতে একসময় সম্পর্কের মধ্যে বিষাক্ত ও বিচারমূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা দুই পক্ষের জন্যই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তোলে।
‘থ্রাইভওয়ার্কস’-এর থেরাপিস্ট এমিলি সিমোনিয়ান বলেন, অন্যদের কাছ থেকেও নিজের মতো পেশাদারত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রত্যাশা করা এ ধরনের পারফেকশনিজমের একটি উদাহরণ। এতে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মুক্তির উপায়
একবার ভাবুন, কেন অন্য কেউ আপনার মনের মতো হবে? সে তার মতোই হবে। সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। কেউ আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তাঁর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে দেখুন। হয়তো তিনি ক্লান্ত, হয়তো আপনার মতো গোছানো নন, আর সেটাই স্বাভাবিক। কাছের মানুষদের ভালো দিকগুলোর দিকে মনোযোগ দিন। কৃতজ্ঞতার তালিকাও তৈরি করতে পারেন।
এটি আদার-ওরিয়েন্টেড পারফেকশনিজমের প্রায় বিপরীত। এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি সব সময় ভাবেন, অন্যরা তাঁকে নিয়ে কী ভাবছে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ও কাজ করে।
সিমোনিয়ানের ভাষায়, অন্যরা কী ভাবছে, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তা করা স্বাভাবিক। কিন্তু পারফেকশনিজম যখন এই উদ্বেগকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। স্মার্ট, নিয়ন্ত্রিত বা আকর্ষণীয় দেখানো কিংবা অন্যের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার তাগিদ এতটাই তীব্র হয়ে উঠতে পারে যে তা আত্মমর্যাদা ও আত্মমূল্যবোধকে প্রভাবিত করে।
মুক্তির উপায়
সব সময় অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা না করে নিজের মূল্যবোধ ও পছন্দের দিকে মনোযোগ দিন। মনে রাখতে হবে, সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
তিন ধরনের পারফেকশনিজমই আলাদা আলাদা জায়গা থেকে জন্ম নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় গেলে ফলাফল প্রায় একই—ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা, নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং শেষ পর্যন্ত বার্নআউট।
দিন শেষে ঘুমাতে যাওয়ার পরও মনে হতে পারে, আরও কিছু করা দরকার ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেও নিজেকে সতেজ ও প্রাণবন্ত মনে না–ও হতে পারে।
তাই প্রথম কাজ হলো নিজের প্রবণতাটা চেনা। আপনি কি নিজের ওপর অসম্ভব রকমের প্রত্যাশা চাপিয়ে দিচ্ছেন? নাকি অন্যদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করছেন? অথবা সব সময় ভাবছেন, অন্যরা আপনাকে কীভাবে দেখছে?
কারণটা বুঝতে পারলে সেটি বদলানোর পথও সহজ হয়। আর যদি এই প্রবণতা আপনার দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক বা মানসিক সুস্থতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করে, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নিন।
সূত্র: হাফপোস্ট