ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হয় পড়ে যাচ্ছেন, কেন এমন হয়

ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, আপনি বুঝি পড়ে যাচ্ছেন। চমকে উঠলেন কিংবা কেঁপে উঠলেন। এমন ঘটনা কি আপনার সঙ্গেও ঘটেছে কখনো? বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছিল স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের নিউরোমেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জেরিন আলম-এর কাছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

ঘুমের সময় অনেকেরই হঠাৎ মনে হয়, পড়ে যাচ্ছি
ছবি: সুমন ইউসুফ, গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ঘুমের সময় অনেকেরই হঠাৎ মনে হয়, পড়ে যাচ্ছি। শরীরের পতন ঠেকাতে তখন নড়েচড়ে বা কেঁপে ওঠে হাত-পা। সাধারণত শরীরের যেকোনো একটা পাশ নড়ে ওঠে।

এই নড়াচড়ায় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমন ঘটনাটাকে বলা হয় ‘হিপনিক জার্ক’। এমন অবস্থায় চমকে গিয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। অস্বস্তি হতে পারে।

শোয়া অবস্থায় হিপনিক জার্ক হলেও ওই সময় কারও মনে হতে পারে, তিনি হয়তো দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে যাচ্ছেন। কিংবা তিনি হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যাচ্ছেন। একটা স্বপ্নের মতো আবেশের মধ্যে থাকতে পারেন তিনি ওই মুহূর্তে। তবে সেটা ঠিক স্বপ্ন নয়; বরং হ্যালুসিনেশন (ভ্রম)।

কখনো কখনো দেখা যায়, হিপনিক জার্কে ব্যক্তির ঘুম না ভাঙলেও শরীরের এই আকস্মিক নড়াচড়া টের পেয়ে চমকে ওঠে পাশে থাকা মানুষটা।

বিষয়টা আদতে কী

পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, হিপনিক জার্ক মস্তিষ্কের ‘মিসফায়ার’-এর জন্য ঘটে। বিষয়টা একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলা যাক।

ঘুমানোর সময় আমাদের শরীরের পেশিগুলো শিথিল অবস্থায় থাকে। মস্তিষ্কও বিশ্রাম পায়। তবে ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি সময়ে শরীর যখন শিথিল হতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কের কিছু অংশ (বিশেষ করে রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম, যা পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে) পুরোপুরিভাবে ঘুমের সংকেত না-ও পাঠাতে পারে।

এ সময় শরীর শিথিল হওয়াকে ‘পতন’ বা বিপদের সংকেত হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে মস্তিষ্ক পেশিকে সংকুচিত হতে নির্দেশ দেয়। এটাই হিপনিক জার্ক।

অর্থাৎ মস্তিষ্ক শরীরকে রক্ষা করার জন্যই সংকেত পাঠাল বা ‘ফায়ার’ করল। তবে এটা ‘মিসফায়ার’। এই ‘ফায়ার’-এর আদতে কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কারণ, শরীর বিছানাতে নিরাপদেই আছে।

কেন হয়

হিপনিক জার্কের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। গবেষণার ফলাফল বলছে, মোটামুটিভাবে ৭০ শতাংশ মানুষেরই জীবনে কখনো না কখনো হিপনিক জার্ক হয়েছে। সাধারণত শৈশবের চেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পরই এ ঘটনা বেশি ঘটে। তবে সেটা মস্তিষ্কের কোনো বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে নয়।

মস্তিষ্কের বিশ্রামে বাধা হয়ে দাঁড়ানো যেসব বিষয়ের কারণে হিপনিক জার্কের সম্ভাব্যতা বাড়তে পারে—

  • মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা

  • ঘুমের ঘাটতি

  • ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম

  • নিকোটিন

  • অ্যালকোহল

  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা ঘুমের আগে ক্যাফেইন

হিপনিক জার্ক হলে কী করবেন

হিপনিক জার্ক হলে মস্তিষ্ক বা শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে বিষয়টা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই হিপনিক জার্ক কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে প্রায়ই এমন হলে এসব বিষয় খেয়াল রাখুন—

  • মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তা কমাতে চেষ্টা করুন। ইতিবাচক চিন্তা করুন। ঘুমের আগে ধ্যান করতে পারেন, হালকা ধরনের বই পড়তে পারেন, কুসুম গরম পানিতে গোসল করতে পারেন, পোশাক বদলে নেওয়াও ভালো।

  • রোজ একই সময়ে ঘুমাতে এবং উঠতে চেষ্টা করুন, এমনকি ছুটির দিনেও।

  • খেয়াল রাখুন, ঘুমের সময় ঘর যেন অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে না থাকে।

  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। তবে ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।

  • ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।

  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করবেন না। ঘুমের আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, কেবল চা-কফিতেই নয়, এনার্জি ড্রিংক এবং চকলেটেও ক্যাফেইন থাকে।

হিপনিক জার্ক হলে মস্তিষ্ক বা শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে বিষয়টা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে

কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে

  • ঘুমের মধ্যে হিপনিক জার্ক ছাড়া যদি অন্য ধরনের নড়াচড়া বা খিঁচুনি হয়।

  • ঘুমের সময় ছাড়া অন্য সময়ও অর্থাৎ জেগে থাকা অবস্থাতেও যদি শরীরের কোনো পেশি কেঁপে ওঠে বা নড়ে ওঠে।

  • ঘুমের মধ্যে যদি কেউ চিৎকার করেন, ধস্তাধস্তি করেন, পাশের মানুষটাকে আঘাত করেন, কোনো কিছু খাওয়ার চেষ্টা করেন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক কাজ করেন।