
শিশুদের জন্মগত ত্রুটির মধ্যে ঠোঁটকাটা কিংবা তালুকাটা খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা জাগে, শিশুটি কি স্বাভাবিকভাবে খেতে পারবে, কথা বলতে পারবে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে? ঠোঁট ও তালুকাটা নিয়ে জন্মালে অনেক পরিবার সামাজিক কুসংস্কারে ভোগে, কেউ কেউ একে অভিশাপ কিংবা অমঙ্গলের লক্ষণ বলেও মনে করেন। বাস্তবতা হলো, ঠোঁট ও তালুকাটা কোনো অভিশাপ নয়; এটি একটি জন্মগত শারীরিক ত্রুটি, যার সুচিকিৎসা আছে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সমন্বিত পরিচর্যা পেলে অধিকাংশ শিশুর জীবনেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। প্লাস্টিক সার্জারি শুধু মুখের গঠন সংশোধন করে না, শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থার ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে শিশুর মুখের পাঁচটি খণ্ড জোড়া লেগে ঠোঁট ও তালু তৈরি হয়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়াটি সামান্য বিঘ্নিত হলেই ফাঁক থেকে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে ক্লেফট লিপ ও ক্লেফট প্যালেট।
প্রতি ৭০০ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর এই সমস্যা দেখা যায়। এর পেছনে বংশগত প্রবণতা, ফলিক অ্যাসিডের অভাব, মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ধূমপান, গর্ভাবস্থায় না বুঝে কিছু ওষুধ সেবন ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অনেক সময় কোনো কারণই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই মা-বাবাকে এ জন্য দোষারোপ করা ঠিক নয়।
প্লাস্টিক সার্জারি মানে শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয়, জন্মগত ত্রুটি সারানো ও অঙ্গের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঠোঁট বা তালুকাটা রোগে প্লাস্টিক সার্জারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঠোঁটকাটা সংশোধনের অস্ত্রোপচারে ঠোঁটের পেশি ও টিস্যু যথাযথভাবে পুনর্গঠন করে আকৃতি, সামঞ্জস্য ও কার্যক্ষমতা উন্নত করার চেষ্টা করা হয়। তালুকাটার অস্ত্রোপচারে ফাঁক বন্ধ করার পাশাপাশি কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর তালু গঠন করা হয়।
তবে অস্ত্রোপচারই সম্পূর্ণ চিকিৎসা নয়। শিশুর বৃদ্ধি, দাঁতের বিন্যাস, শ্রবণশক্তি ও কথা বলার বিকাশ পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কারও কারও পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি শিশুর জন্য চিকিৎসার পরিকল্পনা তাই আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
এ ধরনের চিকিৎসা একটি অস্ত্রোপচারে শেষ হয় না, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা।
ধাপ ১ (ঠোঁট জোড়া দেওয়া): ৩-৬ মাস বয়সে। শিশুর ওজন পাঁচ কেজি আর হিমোগ্লোবিন ১০ হলে প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু ত্বক নয়, ঠোঁটের ভেতরের পেশিটা ঘুরিয়ে এনে জোড়া দিতে হবে, যাতে সে হাসতে পারে।
ধাপ ২ (তালু জোড়া দেওয়া): ৯-১২ মাসে, কথা শেখার আগে। তালুর ফাঁক বন্ধ করলে খাওয়া সহজ হয়, স্পষ্ট কথার ভিত্তি তৈরি হয়।
ধাপ ৩ (মাড়ির হাড় গঠন): ৬-৮ বছরে, স্থায়ী দাঁত ওঠার আগে।
ধাপ ৪ (ফাইনাল টাচ): ৯-১৮ বছরে নাকের সামান্য বাঁকা ঠিক করা।
তালুকাটা শিশুর দুধ পান করতে অসুবিধা হতে পারে, ফলে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কোনো কোনো শিশুকে খাওয়ানোর সময় দুধ নাক দিয়ে বেরিয়েও আসতে পারে। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের সহায়তায় সঠিক খাওয়ানোর কৌশল শেখা এবং প্রয়োজনে বিশেষ ফিডিং বোতল ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিশুর ওজন ও পুষ্টি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কানের সংক্রমণ, শ্রবণশক্তি এবং দাঁতের বিকাশের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের আগের এই যত্নগুলো জরুরি।
তালুকাটা শিশুর কথা বলার বিকাশে সমস্যা হতে পারে। কারও কথায় অতিরিক্ত নাসিক্যতা দেখা দেয়, কারও কিছু ধ্বনি উচ্চারণে অসুবিধা হয়। তালু পুনর্গঠনের অস্ত্রোপচার এসব সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে স্পিচ থেরাপি এবং নাক-কান-গলাবিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার হতে পারে।
শিশুর কথা বলার অসুবিধা নিয়ে তাকে উপহাস বা তিরস্কার করা উচিত নয়। ধৈর্য ধরে থেরাপি নিতে হবে। পরিবারের উৎসাহ তার আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
ঠোঁট ও তালুকাটার সর্বোত্তম চিকিৎসায় একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয় প্রয়োজন। প্লাস্টিক সার্জনের পাশাপাশি শিশুবিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, দন্ত ও অর্থোডন্টিক বিশেষজ্ঞ, স্পিচ থেরাপিস্ট, নাক-কান-গলাবিশেষজ্ঞ এবং পুষ্টিবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সমন্বিত ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু ফাঁক বন্ধ করা নয়; শিশুর খাওয়া, কথা বলা, শ্রবণশক্তি, দাঁতের বিকাশ ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সর্বোত্তম সুযোগ নিশ্চিত করা। পরিবারের সঙ্গে চিকিৎসকের নিয়মিত যোগাযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ঠোঁট ও তালুকাটা শিশুদের চিকিৎসায় প্রভূত অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, যেমন স্মাইল ট্রেইনের মাধ্যমে অনেক শিশু চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে। তবু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞের অভাব, আর্থিক অসচ্ছলতা, কুসংস্কার এবং অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অসুবিধা বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠোঁট ও তালুকাটা কোনো পাপের শাস্তি নয়, কোনো ব্যর্থতা নয়, কোনো অভিশাপও নয়। এটি একটি জন্মগত অবস্থা, যার চিকিৎসা আছে এবং আধুনিক প্লাস্টিক ও পুনর্গঠন সার্জারি অনেক শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান, প্লাস্টিক সার্জারি, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা