কান্না থামাতে, খাওয়াতে বা ব্যস্ত রাখতে আমরা শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছি ডিজিটাল ডিভাইস; যেমন মুঠোফোন, ট্যাব, টিভি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে গেমিং ডিসঅর্ডারকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে; যেমন মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, ভাষা ও শেখার বিকাশে দেরি হয়, সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা কমে যায় এবং উদ্বেগ ও রাগের প্রবণতা বাড়ে।
আসক্তির শুরু কোথায়
চুপ বা শান্ত করতে ও খাওয়াতে কম বয়সে মুঠোফোন দেওয়া।
মা-বাবার নিজের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস।
খেলাধুলা, গল্প বা পারিবারিক সময়ের অভাব।
স্পষ্ট নিয়ম ও সীমারেখার অনুপস্থিতি।
কখন সতর্ক হবেন
ডিভাইস না পেলে তীব্র রাগ, কান্না বা আক্রমণাত্মক আচরণ।
পড়াশোনা ও খেলাধুলায় আগ্রহ কমে যাওয়া।
রাতে দেরি করে ঘুমানো বা ঘুম ভেঙে যাওয়া।
পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কমে যাওয়া।
শিশু একা থাকতে বেশি পছন্দ করা।
স্কুলে বা পড়াশোনায় মনোযোগে সমস্যা।
যা করবেন
শিশুর ডিজিটাল আসক্তি দূর করা মানে জোর করে সরানো বা শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তাকে বিকল্প বিনোদন শেখানো। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করুন। ২ থেকে ৫ বছর হলে দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। স্কুল বয়সে পড়াশোনার বাইরে সীমিত সময় ডিভাইস ব্যবহার করতে দেবেন। শিশুকে ফোন ছাড়তে বলার আগে নিজের স্ক্রিন ব্যবহার কমান। শিশুর বিকল্প অভ্যাস তৈরি করুন। গল্প, আঁকাআঁকি, খেলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ব্যবস্থা রাখুন। হঠাৎ নিষেধ নয়, ধাপে ধাপে সীমা টেনে দিন। আচমকা ফোন কেড়ে নেওয়া শিশুর মধ্যে আরও প্রতিরোধ তৈরি করে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও একটা ভূমিকা থাকে। ক্লাসে শিশু-কিশোরদের মনোযোগের পরিবর্তন হচ্ছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। স্ক্রিন-বিহীন সৃজনশীল কাজে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিন।
মনে রাখবেন
নিজেদের ব্যস্ততার কারণে আমরা শিশুকে ব্যস্ত রাখতে বা শান্ত রাখতে হাতে তুলে দিচ্ছি ডিভাইস। এতে মুহূর্তের স্বস্তি মিললেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি শিশুর আবেগ, কল্পনাশক্তি ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। চারপাশের প্রত্যেক মানুষ একটি শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশের অংশ। শিশুর সামনে আমরা কী দৃষ্টান্ত রাখছি, সেটি তার শেখার একটি বড় মাধ্যম।
শিশুদের জন্য খেলার জায়গা, সঙ্গী ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, দলগত কাজ—এসবই শিশুকে নিজের আবেগ বুঝতে, অন্যকে সম্মান করতে এবং সম্পর্ক গড়তে শেখায়।
সব ক্ষেত্রে অভিভাবকীয় সচেতনতা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শিশুর ডিজিটাল আসক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, আচরণগত পরিবর্তন বা সমস্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ, শিশু মনোরোগবিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক ও সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো, যুক্তরাজ্য