ঘরে ঘরে এখন যেন থাইরয়েডের সমস্যা। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ২০ শতাংশ মানুষ থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত, ক্ষেত্রবিশেষে এটি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ধরা হয়। তার মধ্যে আবার অনেক রোগী এখনো জানেনই না যে তাঁদের থাইরয়েডের সমস্যা আছে।
থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত বেশির ভাগই ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়স্ক নারী। ধরা হয় যে প্রজননক্ষম নারীদের সবচেয়ে পরিচিত হরমোনজনিত সমস্যা হচ্ছে থাইরয়েডজনিত সমস্যা। কিন্তু কেন সবার মনে হচ্ছে যে থাইরয়েডের রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে?
গবেষকেরা বলছেন, থাইরয়েডের সমস্যা বাড়ছে বলার চেয়ে বলা ভালো, বর্তমানে থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত হচ্ছে বেশি এবং চিকিৎসার আওতায় আসছে। কিছুদিন আগপর্যন্তও বাংলাদেশে সব এলাকায় থাইরয়েডের পরীক্ষা খবু সহজলভ্য ছিল না।
থাইরয়েডের চিকিৎসকও ছিলেন অপ্রতুল। আবার থাইরয়েডের সমস্যা, বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডের উপসর্গগুলো এমন মৃদু আর সাধারণ যে এর জন্য পরীক্ষা করার কথাও কেউ ভাবতেন না। বিভিন্ন কারণে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে এবং অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ টেস্টের আওতায় আসছেন।
এ ছাড়া বর্তমানে গর্ভকালে বা সন্তান ধারণের পরিকল্পনা থাকলে থাইরয়েডের রুটিন পরীক্ষার প্রবণতা বেড়েছে, যার কারণে অনেক সাবক্লিনিক্যাল বা মৃদু থাইরয়েড সমস্যাও শনাক্ত হচ্ছে।
উন্নত মানের আলট্রাসাউন্ড অনেক ক্ষুদ্র নডিউল বা গলগণ্ডকে শনাক্ত করতে পারছে। সব মিলিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ থাইরয়েড পরীক্ষা ও চিকিৎসার শরণাপন্ন হচ্ছেন বলে মনে হতে পারে, রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
বেশির ভাগ থাইরয়েড সমস্যা অটোইমিউন রোগ, মানে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বা ইমিউনিটির অব্যবস্থার কারণে হয়ে থাকে। আর এটা ঠিক যে বিশ্বজুড়ে অটোইমিউন রোগের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণকে দায়ী করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস, পুষ্টিজনিত সমস্যা, অন্ত্রে উপকারী জীবাণু কমে যাওয়া বা ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা অটোইমিউন রোগ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশে কিছু ক্ষতিকর উপাদান এন্ডোক্রাইন ডিসরাপটর নামে পরিচিত। এগুলো আমাদের হরমোনজনিত ভারসাম্য নষ্ট করে। যেমন অতিরিক্ত প্লাস্টিক পণ্য, কীটনাশক বা ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসা গ্রন্থির নিঃসরণ ও হরমোনের কার্যকলাপে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কোথাও কোথাও খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়োডিনের অভাব থাইরয়েড সমস্যার কারণ। খাওয়ার লবণে আয়োডিনযুক্ত করে এ সমস্যার নিরসন অনেকটাই করা হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে সরকারি নজরদারি দরকার।
আবার কখনো কখনো অতিরিক্ত ভিটামিন খনিজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণও থাইরয়েডের ক্ষতি করতে পারে। কিছু ওষুধ থাইরয়েডের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে।
সব মিলিয়ে থাইরয়েডজনিত রোগ এখন একটি সুপরিচিত সমস্যা। তাই একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। হাইপোথাইরয়েডের উপসর্গ হচ্ছে ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি, অবসাদ, চুল পড়া, শুষ্ক ত্বক, অনিয়মিত বা অতিরিক্ত মাসিক, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি।
আর হাইপারথাইরয়েডের উপসর্গ হচ্ছে ওজন কমা, অতিরিক্ত গরম লাগা, ঘাম হওয়া, বুক ধড়ফড়, মাসিক বন্ধ থাকা, বারবার মলত্যাগ ইত্যাদি।
এ ছাড়া থাইরয়েড ফুলে যাওয়া বা গলগণ্ড এবং থাইরয়েডে ক্ষুদ্র নডিউল বা গোটা দেখা দিতে পারে। যা–ই হোক না কেন, উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই থাইরয়েড পরীক্ষা করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।
লেখক: লেখক, বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা