
আজ (৪ মার্চ) বিশ্ব স্থূলতা বা ওবেসিটি দিবস। এই মুহূর্তে বিশ্বে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের অর্ধেক মানুষই হবেন ওবেস বা স্থূল। কমপক্ষে চার শটি রোগবালাইয়ের সঙ্গে জড়িত এই স্থূলতা। দুনিয়ায় স্থূলতা যত বাড়ছে, তত বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, আর্থ্রাইটিস, ক্যানসারের মতো রোগ। তাই দুনিয়াজুড়ে দুই আলোচিত শব্দ—ওজন কমানো।
ওজন কমানোর প্রচেষ্টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ধরনের ভিডিও, বিজ্ঞাপনের বাজার রমরমা। সবাই ওজন কমানোর নানা তরিকার উপদেশ দিচ্ছেন। এসব আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে আমরা প্রতারিত হচ্ছি না তো? বিজ্ঞান কী বলে? আসুন জেনে নিই ওজন কমানোর উপায় নিয়ে আমাদের নানা অবৈজ্ঞানিক ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে।
এটা ঠিক যে জিনগত কারণ আমাদের ওজনের ওপর বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলে, কিন্তু ওজন বৃদ্ধির জন্য আসলে পরিবেশগত কারণ ও আমাদের জীবনযাপন প্রণালি বেশি দায়ী। পারিবারিকভাবে আপনি মোটা হলেও নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সঠিক জীবনচর্চার মাধ্যমে ওজন কমানো সম্ভব।
তবে কিছু জিনগত রোগ আছে, যেমন প্রেডার উইল সিনড্রোম, যাতে গুরুতর
স্থূলতা দেখা দেয়। তবে এই রোগগুলো খুবই বিরল।
ওজন কমানোর জন্য ‘না খেয়ে’ থাকা কোনো কার্যকর পদ্ধতি নয়। অনেকেই সারা দিন কিছু খান না কিন্তু যখন খান, তখন আর বাছবিচার থাকে না। বরং ওজন কমাতে হলে সারা দিনে বেশ কয়েকবার খেতে হবে। দরকার হবে কমপক্ষে ৬টি মিল, যা ছোট ছোট এবং কম ক্যালরিযুক্ত, সুষম খাবারসমৃদ্ধ। কোনো বেলাই খাবার এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, বিশেষ করে সকালের নাশতা। এক বেলা খাবার বাদ দিলে পরের বেলা বরং বেশি খেয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা দেয়। তাই নিজের বয়স, ওজন ও কাজ সাপেক্ষে নির্দিষ্ট ক্যালরির একটি খাবারের তালিকা করে নিন। যাতে খাদ্যের সব কটি উপাদান উপস্থিত, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর খাওয়ার নামই ডায়েট চর্চা করা।
মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া একটি চলমান বিষয়। বিপাকক্রিয়া নির্ভর করে আপনার ক্যালরি গ্রহণ আর ক্যালরি ক্ষয়ের ভারসাম্যের ওপর। মেটাবলিজম বাড়াতে বা বুস্ট করতে নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই।
ক্যালরি গ্রহণ হতে হবে স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত, অপর দিকে ক্যালরি ক্ষয় বাড়াতে হবে। কোন কোন রোগে, যেমন থাইরয়েড হরমোন ঘাটতিতে মেটাবলিজম আক্রান্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের রোগের চিকিৎসা করতে হবে। যাঁদের হরমোনজনিত সমস্যা আছে, তাঁরাও ওজন কমাতে পারবেন সঠিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রেখে।
আসলে এটা ঠিক উল্টো। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারের উপকারিতা ও অপকারিতা বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, যা টোটকা ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। টোটকা বা প্রাকৃতিক ওষুধের প্রতিক্রিয়া ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। বিভিন্ন গবেষণা প্রমাণ করেছে গ্রিন টি, হার্বাল টি, ইসবগুলের ভুষি, চিয়া সিড, অ্যালোভেরা বা নানা ধরনের অর্গানিক ওষুধ ওজন কমাতে যথেষ্ট কার্যকর নয়। এগুলো মূলত পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে পেট ভরা অনুভূতি বাড়ায়, কোনোটা ডিটক্স হিসেবে কিছুটা কাজ করে কিন্তু সরাসরি ওজন কমায় এমন কোনো প্রমাণ নেই।
অনেকেই বলেন, ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গেলে তাঁদের চেহারা এবং চুল–ত্বকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটা আসলে হয় যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ ও ভিটামিন মিনারেল না খেলে। ওজন কমানের সময় লক্ষ রাখতে হবে যে শরীরের চর্বি বা ফ্যাট ভাঙতে হবে, পেশি ক্ষয় যেন না হয়। সে জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ, যেমন দুধ, ডিম, দই, বাদাম, মাছ ও চর্বিহীন মাংস খেতে হবে। একইভাবে চুল পড়া রোধে ও ত্বক ভালো রাখতে যথেষ্ট ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাবার যেমন ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। একটি ব্যালান্সড ডায়েট বা সুষম খাদ্যাভ্যাস ওজন কমানোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে পেশি ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করবে।