
চৈত্রের খরতাপের মধ্যে পড়বে এবারের ঈদ। তাই স্বস্তি ও আরামের দিকটা বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মেডিসিন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন ও টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শম্পা শারমিন খান-এর সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন রাফিয়া আলম
ঈদের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে সুস্বাদু খাবারদাবার। তবে অতিরিক্ত তেল বা মসলায় তৈরি খাবার সাময়িক তৃপ্তি দিলেও পরে অস্বস্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই খাবারদাবারের আয়োজনে সতর্ক থাকুন।
হালকা তেল ও মসলায় খাবার রান্না করুন। আয়োজন স্বস্তিদায়ক করতে একটু সাদামাটা হলেও ক্ষতি নেই। যেমন কোনো বেলায় সুগন্ধি চালের ভাত করতে পারেন।
সালাদ–জাতীয় পদ রাখুন। নানা রকম ফলমূল ও কাঁচা সবজি দিয়ে সুস্বাদু সালাদ করা যেতে পারে। বৈচিত্র্যও আসবে।
ক্যালরির দিকেও খেয়াল রাখুন। একটানা কয়েক দিন বাড়তি ক্যালরি গ্রহণ করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারী খাবার খেতে হলে পরিমাণ কম রাখবেন। এ ধরনের খাবার খাওয়ার পর হজম–সহায়ক পানীয় গ্রহণ করা ভালো। বোরহানি, টক দই দিয়ে তৈরি অন্যান্য পানীয়, জিরাপানি, তেঁতুলপানি, লেবুপানি খেতে চেষ্টা করুন। জিরাপানি তৈরি করতে চাইলে বাড়িতে জিরা টেলে নিন।
খাবার খাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে–পরে পানি বা পানীয় গ্রহণ করুন। সারা দিনে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাবার খাবেন। পানি পর্যাপ্ত খাওয়া হচ্ছে কি না, প্রস্রাবের রং দেখেই বুঝতে পারবেন। প্রস্রাব করার সময় দেখুন, রংটা খড়ের মতো হালকা কি না। এটিই প্রস্রাবের স্বাভাবিক রং।
প্রস্রাব গাঢ় রঙের হলে এবং পরিমাণে কম হলে ধরে নিতে হবে, তরল খাওয়া কম হচ্ছে। সাদাটে ধরনের হলে বুঝতে হবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি গ্রহণ করছেন। রং দেখেই সারা দিনের প্রয়োজনীয় তরলের পরিমাণ ঠিক করে নিতে পারবেন। অতিরিক্ত ঘাম হলে পানি বা পানীয়তে সামান্য লবণ মিশিয়ে নিন।
সাধারণভাবে আপনি পানীয় হিসেবে ডাবের পানি বা অন্যান্য ফলের রস বেছে নিতে পারেন। চিনি মেশানো পানীয় এড়িয়ে চলুন। মধু, গুড় বা কৃত্রিম চিনিও স্বাস্থ্যকর বিকল্প নয়। কোমল পানীয় ও অ্যালকোহল বর্জনীয়।
গরমের সময় জীবাণু নিয়ে কিছুটা বাড়তি ভাবনা থাকে। এ সময়ে খাবার সহজে নষ্ট হয়ে যায়। ঘামে ভেজা ত্বকেও জীবাণুর সংক্রমণের ভয় থাকে। তাই খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন ও সংরক্ষণের বিষয়ে যত্নশীল হতে হবে। খাবার নিয়ে যিনিই কাজ করবেন, তাঁর হাত যেন অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। পথেঘাটে খোলা খাবার কিংবা পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
খাবার সংরক্ষণ করতে হবে সঠিক নিয়মে। ফ্রিজে সংরক্ষণের সময় এমনভাবে বাটিতে খাবার রাখতে হবে, যাতে তা বের করে একবারেই খেয়ে নেওয়া যায়, অর্থাৎ একই বাটির খাবার বারবার গরম করতে না হয়। বাসি খাবার খাবেন না।
গরম খাবার একটু ঠান্ডা না করে ফ্রিজে রাখতে নেই। খাবার সংরক্ষণের জন্য অ্যালুমিনিয়াম বা কাচের কনটেইনার কাজে লাগাতে পারেন। খাবারের জন্য প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করলেও খাবার গরম থাকা অবস্থায় তাতে রাখবেন না।
এমন পোশাক বেছে নিতে হবে, যার মধ্য দিয়ে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। নরম সুতি কাপড়ের আরামদায়ক নকশার পোশাক বেছে নেওয়া ভালো।
যেকোনো সময় ঘেমে গেলে দ্রুততম সময়ে মুছে ফেলা প্রয়োজন। বিশেষ করে শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যে ঘাম জমা হয়, তা মুছে ফেলার ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। গোসল ও অজুর পর ত্বক ভেজা না রাখাই ভালো। যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে এ ভেজা ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
কড়া রোদে বাইরে না যাওয়াই ভালো। তাপপ্রবাহ থাকলে ঘরের বাইরে লম্বা সময় নাই–বা কাটালেন; বরং বন্ধু-স্বজনের সঙ্গে নিয়ে আরামদায়ক কোনো জায়গায় বসতে পারেন।
বাইরে যাওয়ার আগে নিয়মমাফিক সানস্ক্রিনসামগ্রী ব্যবহার করুন। তবে ভিটামিন ডি পেতে দিনের অন্তত মিনিট কুড়ি ত্বকে রোদ লাগাতেও ভুলবেন না। এ সময় ত্বকে সানস্ক্রিনসামগ্রী ব্যবহার করলে কিন্তু ভিটামিন ডি তৈরি হবে না। বাদবাকি সময় সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা পেতে নির্দিষ্ট বিরতিতে সানস্ক্রিনসামগ্রী লাগিয়ে নিন। এ জন্য বাইরে যাওয়ার সময় সঙ্গে সানস্ক্রিনসামগ্রী রাখা ভালো।
বাইরে গেলে অন্য কিছু জিনিসও সঙ্গে রাখুন। পানির বোতল, ছাতা, সানগ্লাস, টিস্যু পেপার প্রভৃতি রাখার জন্য একটা ব্যাগ সঙ্গে নেওয়া ভালো। ভেজা টিস্যুও রাখতে পারেন।
প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার না করাই ভালো। একটু খরচ করে থার্মোফ্লাস্ক–জাতীয় বোতল কিনে নিলে বহুদিন ব্যবহার করতে পারবেন। এ ধরনের বোতলে রাখা হলে পানির তাপমাত্রা সহজে খুব বেশি বদলায় না, অর্থাৎ আপনি ঠান্ডা পানি নিয়ে বের হলে তা সহজে গরম হয়ে যাবে না।
একটু লম্বা সময়ের জন্য বাইরে গেলে হালকা স্ন্যাকস সঙ্গে রাখতে পারেন। নানা রকম বাদাম কিংবা ফলমূল হতে পারে সহজ স্ন্যাকস। স্ন্যাকস বহন করতে প্লাস্টিকের পাত্র বা প্যাকেট ব্যবহার না করে ভিন্ন কিছু বেছে নিন।
ঈদের ছুটিতেও শরীরচর্চার কথা ভুলবেন না। লম্বা ছুটিতে রোজকার জীবনধারায় অনেকটা পরিবর্তন আসে। এর মধ্যেও শরীরচর্চার জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখুন। ছুটিতে গ্রামে গেলে প্রকৃতির মধ্যে হাঁটাহাঁটির সুযোগ পাবেন।
ঘুমের ব্যাপারে আপস নয়। সময়মতো ঘুমান ও উঠুন। দেহঘড়ির সময় ঠিক রাখুন। অনেক সময় অতিথি আপ্যায়নের চাপ সামলাতে গিয়ে বাড়ির নারীরা খাওয়াদাওয়া ও ঘুমের ব্যাপারে অনিয়ম করেন। এমনটা করা যাবে না। স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
কারও যদি নিয়মিত কোনো ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন থাকে, সেটিও যেন বাদ না পড়ে। কোনো রোগের কারণে খাবারদাবারে নিষেধাজ্ঞা থাকলে উৎসবে সেই নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ফেলা যাবে না। কোথাও নেমন্তন্ন থাকলে এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তাঁদেরও আগেভাগেই জানিয়ে রাখুন।
উৎসব তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আপনি আনন্দ ছড়িয়ে দেবেন। উৎসবের সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে প্রত্যেকেরই কিছু দায়িত্ব থাকে। এসব পালন করতে পারলে আপনি নিজেও তৃপ্তি পাবেন। মানসিক সুস্থতার জন্য সামাজিক কাজ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। হতাশার যে গোপন বীজ বোনা আছে বহু মানুষের মনে, তাকে বাড়তে না দেওয়ার অসাধারণ উপায় হতে পারে পারিবারিক ও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ।
ঘরের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করুন। নির্দিষ্ট একজনের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেবেন না। সন্তান পালন এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির দেখভালের কাজ ভাগ করে নিন।
সামাজিক পরিসরে নিজের দায়িত্ব পালন করুন। গৃহসহায়তাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী বা রিকশাচালকদের মতো যাঁরা আর্থিকভাবে অনেকটাই অসচ্ছল, তাঁদের পরিবারের জন্য কিছু করুন। সবাইকে সঙ্গে নিলেই বাড়ে ঈদের আনন্দ।