কর্পোরেট অফিসের অন্দরে অতিথি ছাড়াও কর্মীদের জন্য থাকে নানা রকম সোফা
কর্পোরেট অফিসের অন্দরে অতিথি ছাড়াও কর্মীদের জন্য থাকে নানা রকম সোফা

কোথায় কেমন সোফা ব্যবহার করবেন জেনে নিন

চোখ বন্ধ করে একটি বাড়ির মধ্যে থাকা সোফার কথা ভাবুন। কি, ড্রয়িংরুমটাই চোখে ভাসছে? এখন কিন্তু সোফা আর শুধু ড্রয়িংরুমে থাকে না; বরং সেটা ছড়িয়ে পড়েছে শোবার ঘর থেকে ব্যালকনি পর্যন্ত। তাই কোথায় কেমন সোফা ব্যবহার করবেন, সেটাই জানাচ্ছেন সুরাইয়া সরওয়ার

বাড়িতে খাট, আলমারি, ডাইনিং টেবিলসহ মোটামুটি সব ধরনের আসবাব আছে, কিন্তু কোনো সোফা নেই! দিনের শেষে একটু হেলান দিয়ে বসে চা খাওয়ার জায়গা তাহলে কোথায়? হঠাৎ কোনো অতিথি এলে তাঁদেরই–বা কোথায় বসতে দেবেন?

আধুনিক সোফার আবিষ্কার আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে। সপ্তদশ শতাব্দীর আগে কিন্তু সোফা ছিল না বললেই চলে। একাধিক মানুষ একসঙ্গে বসতে চাইলে তখন কাঠের গুঁড়ি, বেঞ্চ বা বিছানা ছাড়া উপায় ছিল না। ১৬৭০ থেকে ১৭৩০ সালের মাঝের সময়ে কারিগরেরা নতুন নতুন নকশার আসবাব আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেখান থেকেই এল নানা ধরনের আরামদায়ক সোফা।

এমন সিঙ্গেল সিটের সোফাগুলো রাখতে পারেন বাসার কোজি কোনো জায়গায়

‘সোফা’ এসেছে আরবি শব্দ ‘সুফাহ’ থেকে; যার অর্থ কুশন বিছানো বসার স্থান। ১৬৮৮ সালে এক ইরানি কারিগর নিজেকে ‘সোফা বিশেষজ্ঞ’ বলে পরিচয় দেন। এরপর ধীরে ধীরে সোফা শব্দটি পরিচিতি পেতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সোফার নকশা, উপকরণ ও ব্যবহারেও আসে বড় পরিবর্তন। আজকের দিনে এই বসার আসবাব হয়ে দাঁড়িয়েছে রুচি ও ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ।

সন্ধ্যার সময় চায়ের কাপ হাতে প্রিয় কোনো বই পড়া কিংবা বোকা বাক্সে পছন্দের কোনো সিরিজ দেখার কথা কল্পনা করুন। কল্পনায় নিজেকে হয়তো আপনি একটি সোফার ওপরই আবিষ্কার করবেন। দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে একটু গা এলিয়ে দেওয়ার জায়গা হিসেবে সোফার জুড়ি মেলা ভার। তাই ঘরের সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গার কথা ভাবলে অজান্তেই সেখানে সোফা চলে আসবে, তা বলা বাহুল্য।

 কোথায় কেমন সোফা

ছোট বাসার ড্রয়িং রুমে এমন সোফা রাখতে পারেন

করপোরেট বিল্ডিং, ফ্যাশন হাউস, অফিসের অভ্যর্থনা কিংবা বাসাবাড়ি—সবখানেই এখন সোফার উপস্থিতি চোখে পড়ে। তবে জায়গাভেদে সোফার ধরন, রং ও নকশায় আসে পার্থক্য। বাসার সোফায় আপনি নিজের পছন্দমতো কুশন ও সফট টয় রাখতে পারেন। আবার অফিসের অভ্যর্থনায় হয়তো সেভাবে সাজাবেন না। তাই জায়গাভেদে সোফার ধরন একটু বদলে যায়।

হাতিলের পরিচালক শফিকুর রহমান মনে করেন, করপোরেট জায়গার জন্য সোফা বেছে নিতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় জায়গাটির ব্যবহার ও উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘অফিসের অভ্যর্থনায় সাধারণত একরঙা সোফাই বেশি দেখা যায়। বেইজ, কালো, মেরুন, সবুজাভ কিংবা ছাই রং করপোরেট পরিবেশে মানানসই।’ এসব রং যেমন সহজে চোখে লাগে না, তেমনি জায়গাটিকে পরিপাটি রাখতেও সাহায্য করে।

অফিসের সোফা বাছাইয়ের সময় জায়গার পরিমাণও বড় বিষয়। কেউ কেউ একটি দুই সিট ও একটি এক সিটের সোফা রাখেন, আবার কেউ দুটি দুই সিট ও একটি এক সিটের সমন্বয় বেছে নেন। এতে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে সাধারণত দুটি দুই সিট ও একটি এক সিটের সোফাই বেশি দেখা যায় বলে জানান শফিকুর রহমান। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও বসার ঘরের আয়তন অনুযায়ী এই বিন্যাস বেশ সুবিধাজনক।

বসার ঘর মাঝারি হলে এমন সোফা সেট নিতে পারেন

বসার ঘরের সোফার বাইরেও অনেকে বেডরুমে সোফা ব্যবহার করেন। সেখানে এক সিটের আরামদায়ক সোফা যেমন রাখা যায়, ডাবল সিটের বেঞ্চ স্টাইলের সোফাও রাখা হচ্ছে। এক সিট হলে সেটা খাট থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বসানো হয়। আবার দুই সিট হলে সেটা অনেকে খাটের শেষ দিকে জুড়ে দিতে পছন্দ করেন।

বাসায় যদি বারান্দা থাকে, তাহলে সেখানেও অনেকে সোফা রাখেন। তবে বারান্দা বা ছাদের খোলামেলা পরিবেশে থাকা সোফাগুলো প্লাস্টিক বা লোহার রডের হলে ভালো হয়। অন্দরসজ্জাবিদ আবিদ আজম বলেন, ‘বাসায় জায়গা থাকলে অনেকে একটা কোজি কর্নার করতে পারেন বা চা–কফি খাওয়ার একটা কর্নার। সেখানে মিনিমাল ধাঁচের সিঙ্গেল চেয়ার স্টাইলের সোফাগুলো রাখা যায়।’

অফিসের অন্দরে আজকাল এমন সোফা রাখা হয় কাজের ফাঁকে কর্মীদের আয়েশ করার জন্য

অনেক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের রিসেপশনেও অতিথির জন্য সোফা রাখা হয়। সেখানকার সোফাগুলো সিঙ্গেল বা ডাবল সিটের হতে পারে। কাঠের বদলে এখানে রট আয়রন, বেত বা প্রসেস উডে তৈরি সোফা বসানো যেতে পারে বলে মনে করেন এই অন্দরসজ্জাবিদ।

‘মিনিমালিজম’ ও ‘ম্যাক্সিমালিজম’–এর দ্বন্দ্বের এই সময়ে সোফার রং কেমন হবে, সেটা অবশ্যই পুরোপুরি ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ পছন্দ করেন একরঙা ছিমছাম সোফা, আবার কেউ ভালোবাসেন নকশাদার অথবা প্রিন্টেড কভার। একরঙা সোফার ওপর উজ্জ্বল রঙের কুশনের ব্যবহারও এখন বেশ জনপ্রিয়। এতে খুব সহজেই ঘরে নতুনত্ব আনা যায়।

রাজধানীর মিরপুরের সেকশন ১৪ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন গৃহিণী মারুফা আলম। তাঁর বসার ঘরের সোফা গাঢ় ছাই রঙের, আর কুশনগুলো মেরুন। তিনি বলেন, ‘পছন্দের পাশাপাশি এই রং বেছে নেওয়ার আরেকটা কারণ ছিল শিশুরা। ওরা খেলাধুলা বা লাফালাফি করে সোফায় দাগ বানিয়ে ফেললে সেটা যেন চোখে কম পড়ে, তাই এমন রং বেছে নিয়েছি।’ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, বাড়িতে শিশু থাকলে গাঢ় রঙের সোফা বেছে নেওয়াই বাস্তবসম্মত। পাশাপাশি সহজে পরিষ্কার করা যায়, এমন কাপড়ের কভার হলে ঝামেলাও কম।

কতশত সোফা!

শোবার ঘরে খাটের শেষদিকে এমন লম্বা সোফা রাখা হয়

এখন বাজারে হরেক রকম সোফা পাওয়া গেলেও এক বা দুই দশক আগেও দেশে ট্রেন্ডি সোফা বলতে বোঝাত কাঠ কিংবা বেতের তৈরি সোফা। বেতের সোফায় থাকত প্যাটার্নভিত্তিক নকশা আর কাঠের সোফায় খোদাই করে করা হতো ভারী কারুকাজ। সেগুন, মেহগনি ও কড়ই কাঠ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়।

এই কাঠ বা বেতের সোফার ওপর রাখা থাকত ফোমে মোড়া কুশন, যার কভারে থাকত ফুলেল প্রিন্ট কিংবা এমব্রয়ডারি। সোফার ফোম দিয়ে তাঁবু বানিয়ে খেলা কিন্তু মিলেনিয়াল বা জেন–জিদের ছোটবেলার এক প্রিয় স্মৃতি!

এখন সময়ের সঙ্গে বদলেছে পছন্দ। আজকাল লেদারে মোড়ানো সোফা বেশ জনপ্রিয়। পিওর লেদারের পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল লেদারের কভারযুক্ত সোফাও অনেকেই কিনছেন। কেউ পছন্দ করেন নরম টেক্সচার, কেউ আবার একটু শক্ত বসার জায়গা।

সোফার হাতলের ক্ষেত্রেও একেকজনের পছন্দ একেক রকম। কারও কাছে কাঠের হাতল বেশি পছন্দ, আবার কেউ চান ফোম দেওয়া নরম হাতল; যাতে আরাম করে হেলান দেওয়া যায়।

একক সিটের সোফার পাশাপাশি এখন বাজারে ‘এল’ আকৃতির সোফাও বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত পাঁচ থেকে ছয়জন একসঙ্গে আরামে বসতে পারেন এসব সোফায়। ছোট ফ্ল্যাটে জায়গার সঠিক ব্যবহার করতে এ ধরনের সোফা কার্যকর।

পাশাপাশি ‘মাল্টিপারপাস আসবাব’ নামের নতুন ধারার সোফাও দেখা যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডেই যেটিকে বিছানায় রূপান্তর করা যায়। অতিথি এলে বা ছোট বাসায় জায়গার সংকটে এ ধরনের সোফা অনেকেরই পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সোফার ধরন বদলালেও আরামদায়ক এই আসবাবের গুরুত্ব কিন্তু একটুও কমেনি।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বসত ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)